Ajker Patrika

সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো কতটুকু কার্যকর?

আবু তাহের খান
আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১০: ৫০
সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো কতটুকু কার্যকর?

নানা বোধগম্য কারণে জাতীয় সংসদের কর্মকাণ্ডের প্রতি মানুষের আগ্রহ বর্তমানে প্রায় নেই বললেই চলে। এদিকে আগামী সাধারণ নির্বাচন ঘিরে নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের আলোচনা সরব হয়ে ওঠায় সেই আগ্রহ এখন প্রায় তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। তারপরও সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদই যেহেতু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি, সেহেতু সংসদীয় কর্মকাণ্ডের মান যা-ই হোক না কেন একে পরিপূর্ণভাবে উপেক্ষা করার কোনোই উপায় নেই। আর সে উপলব্ধি থেকেই জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলোর কর্মকাণ্ডের ওপর সম্প্রতি প্রথম আলোয় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের সূত্রে বিষয়টি নিয়ে খানিকটা আলোকপাত করার চেষ্টা। প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ২০২১ সালে জাতীয় সংসদের ৫০টি স্থায়ী কমিটির মধ্যে একটিমাত্র কমিটি নিয়মিত বৈঠক করেছে এবং ৩১টি কমিটির বৈঠকের সংখ্যা শূন্য থেকে সর্বোচ্চ ৬টি। উল্লিখিত প্রতিবেদনে কমিটিওয়ারি বৈঠকের বিস্তারিত বিবরণ থাকলেও সেসব নিয়ে অনুপুঙ্খ বিচার-বিশ্লেষণে না গিয়ে এখানে সংক্ষেপে শুধু এটুকুই বলা যেতে পারে, এ সময়ে সংসদীয় কমিটিগুলো একেবারেই কার্যকর ছিল না। তবে এর মধ্যেও সর্বোচ্চ ১১টি বৈঠক করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, যা থেকে প্রমাণিত হয় যে ইচ্ছা থাকলে অন্যদের পক্ষেও তা সম্ভব ছিল। উল্লেখ্য, জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী প্রতিটি স্থায়ী কমিটিরই প্রতি মাসে ন্যূনতম একটি বৈঠক আহ্বানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। উল্লেখ্য, এসব বৈঠকে যোগদানের জন্য সাংসদেরা নির্ধারিত হারে সম্মানী ভাতা ও সংসদীয় এলাকা থেকে জাতীয় সংসদ ভবনে আসা-যাওয়া বাবদ যাতায়াত ভাতা পেয়ে থাকেন (অবশ্য যাতায়াতের জন্য তাঁরা শুল্কমুক্ত গাড়ি, চালক, জ্বালানি ইত্যাদি নিয়মিতই পেয়ে থাকেন)।

সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় জাতীয় সংসদ এবং এর কমিটিগুলোই বস্তুত সরকারের প্রাণ, যেখানে বিরোধীদলীয় সাংসদেরাও এই প্রক্রিয়ার অংশ। এ ব্যবস্থায় একটি মন্ত্রিপরিষদ থাকলেও মন্ত্রণালয়গুলোর কার্যক্রম দেখভাল করার জন্য মন্ত্রী একাই শুধু নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রতিনিধি নন; বরং প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেই যুক্ত রয়েছে সরকারি ও বিরোধীদলীয় সাংসদদের সমন্বয়ে গঠিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এবং এ কমিটিগুলোর সভাপতি পদে বিরোধীদলীয় সাংসদদের থাকার রীতিও যথেষ্টই রয়েছে। ফলে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় শুধু সর্বাধিক বা নিরঙ্কুশ সংখ্যক আসনে বিজয়ী দল বা জোটই সরকার পরিচালনার দায়িত্বে আছেন—এমনটি বলা যাবে না। বস্তুত জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব দলের প্রত্যেক সদস্যই এই ব্যবস্থায় সরকারের অংশ।

আনুষ্ঠানিকভাবে এ রকম একটি সংসদীয় সরকারব্যবস্থা দেশে বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও ৫০টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মধ্যে দীর্ঘ ১২ মাসে একটিমাত্র কমিটি ছাড়া বাকি কোনো কমিটিই কেন নিয়মিত বৈঠক করতে পারল না বা আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে ১৯টি কমিটিই কেন প্রায় পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে থাকল, তা একটি গুরুতর প্রশ্ন বৈকি! সংসদীয় কমিটিগুলোই যদি কার্যকর না থাকে, তাহলে জাতীয় সংসদ কার্যকর থাকে কেমন করে? তদুপরি সংসদীয় কমিটিগুলোর এই অকার্যকর অবস্থাই যদি বহাল থাকে, তাহলে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থার সঙ্গে সংসদীয় সরকারব্যবস্থার পার্থক্য করা যাবে কীভাবে?

সংসদীয় কমিটিগুলোর মূল কাজ হচ্ছে নিয়মিত ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ প্রদান করা। তবে সেসব পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ মন্ত্রণালয়ের জন্য বাস্তবায়ন করাটা বাধ্যতামূলক কি না, সে বিষয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। তবে সংসদীয় কমিটিগুলো অকার্যকর থাকার পেছনে এটিই মূল কারণ নয়। মূল কারণ হচ্ছে কমিটি-সদস্যদের মধ্যে উদ্যোগহীনতা ও দায়িত্ববোধের ঘাটতি, যে দায় প্রথমে বর্তায় কমিটি-সভাপতির ওপর। প্রায় একই রকম কার্যপরিধি (টার্মস অব রেফারেন্স—টিওআর) নিয়ে যুক্তরাজ্য পার্লামেন্টের সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো মন্ত্রিপরিষদের মতোই সমান কার্যকর। সেখানকার প্রত্যেক মন্ত্রী সারাক্ষণই এই ভেবে উদ্বিগ্ন থাকেন যে (ইতিবাচক অর্থে), কখন না তাঁদের কোনো দোষত্রুটি সংসদীয় কমিটির কাছে ধরা পড়ে যায়! অন্যদিকে মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটি ছাড়া অন্য যে সংসদীয় কমিটিগুলো রয়েছে, সেগুলোর ব্যাপারে সেখানকার মন্ত্রিপরিষদ তো রীতিমতো তটস্থ থাকে, কখন তাঁদের সংসদে দাঁড়িয়ে কোন বিষয়ে জবাব দিতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়—সেসব ভেবে।। ব্রিটেনের এমন বহু নাগরিক আছেন যাঁরা ওই দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর নাম জানেন না। কিন্তু তাঁরা প্রায় সবাই সংসদের জনহিসাব-সংক্রান্ত কমিটির (পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি) সভাপতি মেগ হিলিয়ারের নাম জানেন ওই কমিটির কাজের সুবাদেই। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষিত নাগরিক সম্প্রদায়ের কতজন ইন্টারনেটের সাহায্য না নিয়ে জাতীয় সংসদের জনহিসাব-সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সভাপতির নাম বলতে পারবেন?

বস্তুত জাতীয় সংসদের জনহিসাব-সংক্রান্ত কমিটির কার্যক্রম যত বেশি সচল, শক্তিশালী, সাহসী ও পক্ষপাতহীন হবে, দেশে দুর্নীতির পরিমাণ কমিয়ে আনতে তা ততই সহায়ক হবে। অন্যদিকে মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো যদি নিয়মিত সচল থাকে, তাহলে মন্ত্রণালয়ের কাজকর্মে জবাবদিহি ও ভারসাম্যও বহুলাংশে নিশ্চিত হয়। কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষ অত্যন্ত হতাশার সঙ্গে লক্ষ করছে যে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো বর্তমানে প্রায় কোনো ভূমিকাই পালন করছে না। কিন্তু স্থায়ী কমিটির সদস্যরা কি উপলব্ধি করেন যে কমিটি-সদস্য হিসেবে এ কাজগুলো সম্পন্ন করার মধ্যে শুধু দায়িত্ব পালন নয়, সম্মানের বিষয়টিও বহুলাংশে জড়িয়ে রয়েছে। কারণ এ কমিটিগুলো আসলে রাষ্ট্র পরিচালনারই অংশ। অন্যদিকে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী কোনো কোনো বিরোধী দল সরকারের বিরুদ্ধে অহর্নিশ দায়িত্বহীনতার অভিযোগ আনলেও সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে তাঁদের যেসব প্রতিনিধি রয়েছেন, তাঁদের কেউই কিন্তু সংশ্লিষ্ট কমিটির কার্যক্রম স্থবির হয়ে থাকার বিষয়ে কোনো অভিযোগই আনছেন না বা নিজেরাও কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করছেন না।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি দপ্তরের বিরুদ্ধে প্রায়ই নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপিত হচ্ছে। হলফ করে বলতে পারি, সংসদীয় কমিটিগুলো কার্যকর থাকলে এই দুর্নীতির মাত্রা বহুলাংশে কমে আসত। ফলে যাঁরা দুর্নীতি হ্রাসের কথা বলেন, তাঁদের উদ্দেশে বলব, এ ব্যাপারে শুধু ধারণাগত দাবি উত্থাপন কোনো কাজের কথা নয়। বিষয়টিতে প্রকৃত অগ্রগতি চাইলে সুনির্দিষ্ট করণীয় চিহ্নিত করে সেই অনুযায়ী প্রস্তাব উত্থাপন করা প্রয়োজন, যার মধ্যে একটি প্রস্তাব হতে পারে সংসদীয় কমিটিগুলোকে কার্যকর করার দাবি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) একসময় সংসদ ও সংসদীয় কমিটির কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে ‘ডেমোক্রেসি ওয়াচ’ নামের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করত, যার মাধ্যমে জাতীয় সংসদের কার্যক্রমের গতিবিধি সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যেত। সেটির সর্বশেষ অবস্থা কী, তা এখন আর জানা যায় না। জানতে পারলে সংসদীয় কমিটির কার্যক্রমের সর্বশেষ প্রবণতা বোঝা সহজ হতো। তবে প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকেও মোটামুটি বোঝা যাচ্ছে যে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর সদস্যরা এর সামগ্রিক কার্যক্রম নিয়েই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন, যা প্রকারান্তরে জাতীয় সংসদের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলারই শামিল।

জাতীয় সংসদের বিষয়ে খোদ এর সদস্যদেরই আগ্রহ হারিয়ে ফেলার এ বিষয়টি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত উদ্বেগের। এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা প্রয়োজন যে বাংলাদেশ রাষ্ট্রে বহুদলীয় সংসদীয় সরকারব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার বিষয়টি কখনোই কণ্টকমুক্ত ছিল না।

আবু তাহের খান: সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয় 

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর ছদ্মবেশে যুক্তরাজ্যে মিথ্যা আশ্রয় প্রার্থনার বাজার উন্মোচন বিবিসির

চীনা স্যাটেলাইট ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা করেছে ইরান

মিরপুরের ১০ নারীকে যাত্রাবাড়ী এনে ধর্ষণ-ব্ল্যাকমেল করেন রাব্বি, বিয়েও করেন একই কায়দায়

আমরাই যেচে সর্বনাশ ডেকে এনেছিলাম: টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে সংসদে স্পিকার

নতুন শর্তে এবার লোহিতসাগর বন্ধ করার হুমকি ইরানের

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত