Ajker Patrika

আন্তর্জাতিক নারী: দেয়ালবন্দী জীবনেও প্রতিরোধের প্রদীপ

ফিচার ডেস্ক
আন্তর্জাতিক নারী: দেয়ালবন্দী জীবনেও প্রতিরোধের প্রদীপ
ছবি: এএফপি

আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতা দখলের পর আরও একটি বছর কাটতে চলেছে। এই সময়ে, বিশ্বের নজর যখন অন্যান্য বৈশ্বিক সংকটের দিকে, তখন আফগান নারীরা নিজেদের অজান্তেই একটি অন্ধকার কুঠুরিতে বন্দী হয়ে পড়ে। আফগানিস্তানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৭৮তম স্থানে নেমে এসেছে। এ বছরও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ প্রকাশ ছাড়া দৃশ্যত কোনো বড় পরিবর্তন আসেনি। আর দিন দিন তাদের জীবনযাপন যেন আরও কঠিন ও দমবন্ধ হয়ে উঠেছে।

যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে অনুষ্ঠিত এক আয়োজনে স্কাই নিউজের বিশেষ সংবাদদাতা অ্যালেক্স ক্রফোর্ডকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘পৃথিবী কীভাবে এটা হতে দিচ্ছে?’ তিনি বলেছেন, গত চার বছরে তালেবান ৯০ শতাংশ সাংবাদিক ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে, বিশেষত যাঁরা নারীদের গল্প তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। মনে হচ্ছে, তারা নারী ও মেয়েদের পদ্ধতিগতভাবে মুছে ফেলার চেষ্টা করছে। শিক্ষা থেকে স্বাস্থ্য—সব ক্ষেত্রে নারীদের অনুপস্থিতি দেশটির অর্থনৈতিক ও মানবিক উন্নয়নের ওপর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ক্রফোর্ড উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, কিছু ব্লগার ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক বলে দেখানোর চেষ্টা করছেন, যা নারীদের এই পদ্ধতিগত বিলুপ্তিকে লঘু করে দিচ্ছে।

টিকে থাকার লড়াই

দেশটিতে এমন অনেক নারী আছে, যারা দমবন্ধ পরিবেশে থেকেও নীরবে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। আফগান নারীদের জীবন দুটি ভিন্ন কিন্তু একই রকম কঠিন চিত্রের মাধ্যমে দেখা যায়। এক, শিক্ষার আলো নিভে গেলেও অনেকে কাজের মাধ্যমে নিজের ও আশপাশের নারীদের জীবনে আলোর প্রদীপ ধরে আছেন। ‘রুখসানা মিডিয়া’তে উঠে এসেছে এমনই এক নারীর গল্প।

তালেবান নারীদের উচ্চশিক্ষা, বিউটি পারলারসহ অসংখ্য পেশা নিষিদ্ধ করার পর সেতারা নামের এক সাবেক বিউটিশিয়ান তাঁর স্বামীর কাছ থেকে শেখা বিদ্যুতের কাজকে জীবিকায় পরিণত করেছেন। হারাত শহরে ৫ বছর আগে মাত্র ৫ হাজার আফগানি দিয়ে শুরু করা তাঁর ছোট ল্যাম্প তৈরির কর্মশালা এখন ৬ লাখ আফগানির বেশি মূল্যের সম্পদে পরিণত হয়েছে। পিতৃতান্ত্রিক শাসনের অধীনে থেকেও সেতারা নারীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। রুখসানা মিডিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেতারা বলেছেন, ‘ঘরে বসে থাকার চেয়ে এটি ভালো।’ তাঁর দেওয়া প্রশিক্ষণ বিনা মূল্যে এবং সম্পূর্ণ ব্যবহারিক। লুলাইমার মতো উচ্চশিক্ষিত নারীরা এখানে সোল্ডারিং ও ফিটিংয়ের কাজ শিখছেন। তাঁদের পরিবার প্রাথমিকভাবে আপত্তি জানালেও কাজের মাধ্যমে মানসিক স্বস্তি পাচ্ছেন তাঁরা।

বেঁচে থাকার জন্য যৌন শোষণ

আফগানিস্তানে মানবিক সংকটের শিকার নারীদের সামনে এখন ভয়াবহ বিষয়ের নাম যৌন শোষণ। ইউএনের তথ্যমতে, আফগানিস্তানে ২২ দশমিক ৯ মিলিয়ন মানুষের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। কিন্তু খাদ্যসহায়তার জন্য স্থানীয় ওয়াকিল গুজার বা ইমামের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। লাইলা নামের এক নারী তাঁর ক্ষুধার্ত বাবাহীন সন্তানদের জন্য ত্রাণ আনতে গিয়ে স্থানীয় ওয়াকিল গুজার এবং মসজিদের ইমাম—উভয়ের কাছে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন। ওয়াকিল গুজার তাঁর কাছে ‘এক রাতের জন্য বাড়িতে আসার’ বিনিময়ে ত্রাণ কার্ড দিতে চান। আর ইমাম তাঁকে ‘অস্থায়ী স্ত্রী’ হওয়ার প্রস্তাব দেন। হয়রানির শিকার এই নারীরা যখন অন্যদের কাছে অভিযোগ করেন, তখন তাঁদেরই উল্টো দোষারোপ করা হয়। নারী অধিকারকর্মী তারান্নুম সাঈদী গণমাধ্যমে জানান, অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং তালেবানের কঠোর বিধিনিষেধই নারীদের এমন ভয়াবহ শোষণের মুখে ফেলে দিয়েছে।

নতুন আলোর সন্ধানে

২০২৫ সালের শেষ সময়ে এসেও আফগানিস্তানের নারীদের জীবন প্রমাণ করে, সরকারের নীতির কারণে একটি প্রজন্ম কীভাবে মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। যেখানে সামান্য রুটির জন্য যৌন হয়রানি সহ্য করতে হচ্ছে, সেখানেই সেতারার মতো নারীরা নিজেদের দক্ষতা দিয়ে স্বনির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত