
১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই মানব ইতিহাসের এক উজ্জ্বলতম দিন। এ দিন মানুষ চন্দ্রজয় করেছিল। পৃথিবীর আকাশ ফুঁড়ে বেরিয়ে গিয়ে চাঁদের বুকে পা রেখেছিল তারা। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার তিন নভোচারী নীল আর্মস্ট্রং, এডউইন (বাজ) অলড্রিন এবং মাইকেল কলিন্স গিয়েছিলেন সেই চন্দ্রজয়ের অভিযানে। তিনজনের এ দলের নেতৃত্বে ছিলেন নীল আর্মস্ট্রং।
যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে ১৯৬৯ সালের ১৬ জুলাই এই তিন নভোচারীকে বহনকারী মহাকাশযান যাত্রা শুরু করে শূন্যের পথে। চার দিনের টানা যাত্রা শেষে প্রথম মানব হিসেবে চাঁদের বুকে পা রাখেন নীল আর্মস্ট্রং। ১৯ মিনিট পর বাজ অলড্রিন তাঁর সঙ্গে যোগ দেন। মাইকেল কলিন্স তখন কমান্ড মডিউল কলাম্বিয়ায় বসে চাঁদকে প্রদক্ষিণ করছেন।
চাঁদে পৌঁছানোর পর তিন নভোচারী নিজেদের মধ্যে এবং হিউস্টনের ক্যাপসুল কমিউনিকেটরের (ক্যাপকম) সঙ্গে অনেক কথা বলেছেন। সেসব কথা শুনেছে পুরো দুনিয়া। মার্কিন সাময়িকী ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকে সেই কথোপকথন ছাপা হয়েছিল ১৯৬৯ সালেই। আজ বুধবার সাময়িকীটির অনলাইনে সেই কথোপকথন আবারও প্রকাশ করা হয়েছে। আজকের পত্রিকার পাঠকদের জন্য তিন নভোচারীর কথোপকথনের কিয়দংশ তুলে ধরা হলো:
আর্মস্ট্রং: হিউস্টন, এখানে ট্র্যাঙ্কুইলিটি বেস। ইগল অবতরণ করেছে।
ক্যাপকম (নভোচারী চার্লস এম. ডিউক): রজার, ট্র্যাঙ্কুইলিটি। আমরা শুনেছি। এখানে অনেকেই প্রায় নিশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছিল, এখন আবার স্বস্তিতে শ্বাস নিতে পারছি। অনেক ধন্যবাদ।
কলিন্স (কমান্ড মডিউল কলাম্বিয়া): অসাধারণ!
আর্মস্ট্রং: হিউস্টন, শেষ ধাপটা হয়তো অনেক দীর্ঘ মনে হয়েছে। অটো-টার্গেটিং আমাদের সরাসরি একটি গহ্বরের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল, যেখানে বড় বড় পাথর আর শিলাখণ্ড ছিল...তাই ভালো জায়গা খুঁজতে আমাকে নিজেই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেই পাথুরে এলাকাটির ওপর দিয়ে উড়িয়ে আনতে হয়েছে।
ক্যাপকম: রজার, আমরা বুঝেছি। এখান থেকে দৃশ্যটা দারুণ লাগছিল, ট্র্যাঙ্কুইলিটি।
অলড্রিন: এখানে চারপাশের বিস্তারিত পরে বলব। তবে মনে হচ্ছে নানা ধরনের আকার, কোণ, দানা এবং বিভিন্ন ধরনের পাথরের সমাহার। রঙের ব্যাপারে বললে, মোটামুটি কোনো একক রং নেই। তবে কিছু পাথর ও শিলাখণ্ডে মজার কিছু রং থাকতে পারে।
ক্যাপকম: রজার, ট্র্যাঙ্কুইলিটি। এখানে এই ঘরে এবং সারা পৃথিবীতে এখন অসংখ্য মানুষের মুখে হাসি ফুটেছে।
আর্মস্ট্রং: এখানে কিন্তু দুটো হাসিমুখ আছে।
কলিন্স: কমান্ড মডিউলে থাকা একজনকে ভুলে যেও না। আর আমাকে রিলে লাইনে রাখার জন্য ধন্যবাদ, হিউস্টন। না হলে সব মজার ঘটনাই মিস করতাম।
ক্যাপকম: রজার, কলাম্বিয়া...কিছু বলুন। তারা আপনাকে শুনতে পাবে।
কলিন্স: রজার। ট্র্যাঙ্কুইলিটি বেস, ওপর থেকে দারুণ শোনাচ্ছিল। তোমরা অসাধারণ কাজ করেছ।
আর্মস্ট্রং: ধন্যবাদ। এখন ওপরে সেই কক্ষপথের ঘাঁটিটা প্রস্তুত রাখ।
ক্যাপকম: ট্র্যাঙ্কুইলিটি বেস...হিউস্টন বলছি। জ্বালানি ও অক্সিজেনের ব্যবহার স্বাভাবিক আছে। সব দিক থেকেই ভালো দেখাচ্ছে...সবকিছু ঠিকঠাক চলছে।

আর্মস্ট্রং: আপনাদের জানাতে পারি, এখানে ১/৬ মহাকর্ষে মানিয়ে নিতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। অন্তত এই পরিবেশে চলাফেরা করা বেশ স্বাভাবিক লাগছে।
ক্যাপকম: রজার, ট্র্যাঙ্কুইলিটি।
আর্মস্ট্রং: জানালার বাইরে একটি বেশ সমতল সমভূমি দেখা যাচ্ছে। পাঁচ থেকে পঞ্চাশ ফুট পর্যন্ত অনেক গহ্বর রয়েছে। কিছু ছোট শিলা আছে, হয়তো ২০-৩০ ফুট উঁচু। চারপাশে হাজার হাজার ছোট ছোট এক-দুই ফুটের গর্ত। সামনে কয়েক শ ফুট দূরে কিছু কোনাকৃতি পাথর দেখা যাচ্ছে- প্রায় দুই ফুট আকারের। সামনে একটি পাহাড়ও দেখা যাচ্ছে- হয়তো আধা মাইল বা এক মাইল দূরে।
কলিন্স: শুনে মনে হচ্ছে এখন দৃশ্যটা গতকালের তুলনায় অনেক ভালো লাগছে। তখন সূর্য খুব নিচু ছিল, জায়গাটা বেশ খসখসে লাগছিল।
অলড্রিন: আমি এই সুযোগে পৃথিবীর যেখানেই থাকুন না কেন, সবাইকে বলব, গত কয়েক ঘণ্টার ঘটনাগুলো নিয়ে একটু ভাবুন এবং নিজের মতো করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন।
এরপর নভোচারীরা লুনার মডিউল থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেন। প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টা পর আর্মস্ট্রং প্রথম বের হন।
আর্মস্ট্রং: হ্যাচ খুলছে।
অলড্রিন: নীল, তুমি ঠিকভাবে অবস্থান নিয়েছ। একটু আমার দিকে। ঠিক আছে, নামো।
আর্মস্ট্রং: আমি কেমন করছি?
অলড্রিন: ভালোই করছ।
আর্মস্ট্রং: ঠিক আছে, হিউস্টন, আমি এখন বাইরে (মডিউলের দরজায়) দাঁড়িয়ে আছি।
ক্যাপকম (এখন ব্রুস ম্যাকক্যান্ডলেস): আমরা টিভিতে ছবি পাচ্ছি।
অলড্রিন: ওহ, ভালো ছবি পাচ্ছেন?
ক্যাপকম: ছবিতে অনেক কনট্রাস্ট আছে, এখন আমাদের মনিটরে একটু উল্টো দেখা যাচ্ছে, কিন্তু অনেক বিস্তারিত বোঝা যাচ্ছে...ঠিক আছে নীল, আমরা এখন তোমাকে মই বেয়ে নামতে দেখছি।
আর্মস্ট্রং: আমি মইয়ের নিচে পৌঁছে গেছি। লুনার মডিউলের পাগুলো মাটিতে মাত্র এক-দুই ইঞ্চি ঢুকেছে। যদিও মাটি খুব সূক্ষ্ম দানাদার, প্রায় গুঁড়োর মতো। এখন আমি লুনার মডিউল থেকে নামছি।
আর্মস্ট্রং: এটা একজন মানুষের জন্য ছোট্ট একটি পদক্ষেপ, কিন্তু মানবজাতির জন্য এক বিশাল লাফ।
আর্মস্ট্রং: মাটিটা খুব সূক্ষ্ম এবং গুঁড়ো গুঁড়ো। আমি পায়ের আঙুল দিয়ে সহজেই তুলে নিতে পারছি। গুঁড়ো কয়লার মতো বুটের তলায় লেগে থাকে। আমি এক ইঞ্চির আট ভাগের এক ভাগের মতো মাটিতে ডুবছি, কিন্তু বুটের ছাপ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।
ক্যাপকম: নীল, আমরা শুনছি।
আর্মস্ট্রং: চলাফেরায় কোনো সমস্যা নেই। মাটিতে যে সিমুলেশন করেছিলাম তার চেয়েও সহজ মনে হচ্ছে। এখানে হাঁটা মোটেও কঠিন নয়।
অলড্রিন: নীল, এখান থেকে দৃশ্যটা দারুণ লাগছে।
আর্মস্ট্রং: এর (চাঁদের) নিজস্ব এক কঠিন সৌন্দর্য আছে। অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের উঁচু মরুভূমির মতো আলাদা, কিন্তু খুব সুন্দর।
অলড্রিন: আমি কি বের হবো?
আর্মস্ট্রং: প্রস্তুত।
অলড্রিন: এখন আমি হ্যাচটা একটু বন্ধ করে রাখছি, তবে লক করব না।
আর্মস্ট্রং: খুব ভালো চিন্তা।
অলড্রিন: পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা এটাই আমাদের বাড়ি, তাই যত্ন নিতে হবে।
অলড্রিন: কী সুন্দর দৃশ্য!
আর্মস্ট্রং: তাই না? অসাধারণ।
অলড্রিন: পাথরগুলো একটু পিচ্ছিল। সাবধানে চলতে হবে...ভারসাম্য ঠিক রাখতে পায়ের ওপর ভর বদলাতে হয়। আর নীল, আমি কি বলিনি—আমরা হয়তো বেগুনি রঙের পাথর দেখতে পারি?
আর্মস্ট্রং: বেগুনি পাথর পেয়েছ?
অলড্রিন: হ্যাঁ, ছোট একটা, ঝিলমিল করছে।
আর্মস্ট্রং: যারা ফলকটি পড়েননি, তাদের জন্য পড়ে শোনাচ্ছি। লুনার মডিউলের সামনের ল্যান্ডিং গিয়ারে এটি লাগানো আছে। এতে লেখা আছে: ‘পৃথিবী গ্রহের মানুষ এখানে প্রথম চাঁদে পা রাখল—জুলাই, ১৯৬৯ সালে। আমরা সমগ্র মানবজাতির শান্তির জন্য এসেছি।’ এতে আমাদের তিনজনের স্বাক্ষর এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর রয়েছে।
কলিন্স (কলাম্বিয়া): এটাই ইতিহাস।
পরে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ফোনে কথা বলেন।
নিক্সন: নীল ও বাজ, আমি হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিস থেকে ফোনে কথা বলছি। এটি সম্ভবত হোয়াইট হাউস থেকে করা সবচেয়ে ঐতিহাসিক ফোন কল। আপনারা যা করেছেন তার জন্য আমরা সবাই ভীষণ গর্বিত। প্রতিটি আমেরিকানের জন্য এটি জীবনের সবচেয়ে গর্বের দিন। পৃথিবীর মানুষও নিশ্চয়ই এই অসাধারণ সাফল্যকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। আপনাদের কারণে এখন মহাকাশও মানুষের জগতের অংশ হয়ে গেছে। মানব ইতিহাসে এক মূল্যবান মুহূর্তে পৃথিবীর সব মানুষ যেন এক হয়ে গেছে- আপনাদের কৃতিত্বে গর্বিত হয়ে এবং আপনাদের নিরাপদে পৃথিবীতে ফেরার জন্য প্রার্থনা করছে সবাই।
আর্মস্ট্রং: ধন্যবাদ, মি. প্রেসিডেন্ট। এখানে আসতে পারা আমাদের জন্য বড় সম্মানের। আমরা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয়, শান্তিপ্রিয় সব দেশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছি।
এরপর নভোচারীরা বৈজ্ঞানিক যন্ত্র বসানো ও চাঁদের পাথর সংগ্রহ করেন। প্রায় দুই ঘণ্টা পর তারা লুনার মডিউলে ফিরে আসেন।
অলড্রিন: আমি মই বেয়ে উপরে উঠছি...আদিওস, আমিগোস!
ঠিক যেমন আর্মস্ট্রং প্রথম চাঁদে পা রেখেছিলেন, তেমনি তিনি শেষ ব্যক্তি হিসেবে চাঁদের মাটি ছাড়েন।
কলিন্স: আজকের দিনটা সত্যিই অসাধারণ ছিল।
ক্যাপকম: আপনারা দারুণ কাজ করেছেন।
অলড্রিন: আজকের দিনটা অনেক দীর্ঘ ছিল।
ক্যাপকম: ঠিকই বলেছেন। এখন কিছুটা বিশ্রাম নিন।
চাঁদ থেকে উড্ডয়নের সময়—
অলড্রিন: দারুণ...খুব মসৃণ আর শান্ত যাত্রা।
ক্যাপকম: ইগল, হিউস্টন বলছি। সবকিছু ঠিকঠাক চলছে।
আর্মস্ট্রং: আমি সরাসরি ইউএস-ওয়ানের মতো পথ ধরে যাচ্ছি।
এরপর বাকি ছিল ইগল-এর সঙ্গে কলাম্বিয়ায় ডকিং, পৃথিবীতে ফিরে আসার ৬০ ঘণ্টার যাত্রা এবং বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ।
দুটি মহাকাশযান একত্র হয়, যদিও সেই মুহূর্তে কিছু অপ্রত্যাশিত নড়াচড়াও হয়েছিল।
কলিন্স: একটু অদ্ভুত লাগল...মনে হচ্ছিল যেন একটু ঝাঁকুনি হচ্ছিল।
আর্মস্ট্রং: হ্যাঁ, যখন আমি ওপরের দিকে থ্রাস্ট দিলাম তখনই মনে হলো।
কলিন্স: কয়েক সেকেন্ড বেশ ব্যস্ত ছিলাম।
ক্যাপকম: সবকিছু দারুণ দেখাচ্ছে। আজ সত্যিই অসাধারণ একটি দিন।
কলিন্স: একদম ঠিক বলেছ।
চন্দ্রজয়ের আট দিনের অভিযান শেষ করে তিন নভোচারী ১৯৬৯ সালের ২৪ জুলাই পৃথিবীতে ফিরে আসেন।

পৃথিবীর বাইরে অন্য কোনো প্রাণের অস্তিত্বের এখনো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত খুঁজে চলেছেন এবং মহাবিশ্বে আমরা সত্যিই একা নই, এমন কোনো ইঙ্গিতের জন্য সংকেতও শুনে চলেছেন। এবার হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্স এবং ইউনিভার্সিটি অব ওরেগনের...
৫ দিন আগে
পৃথিবীর আলো, উষ্ণতা ও প্রাণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস এই সূর্যকে আমাদের কাছে চিরস্থায়ী মনে হয়। কিন্তু মহাবিশ্বের কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। একসময় সূর্যও তার বর্তমান রূপ হারিয়ে ফেলবে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, এই পরিবর্তন ঘটতে এখনো বিপুল সময় বাকি।
৯ দিন আগে
আফ্রিকা মহাদেশ ধারণার চেয়েও দ্রুত দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার পথে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ভূতত্ত্ববিদেরা। মহাদেশটির একটি সক্রিয় রিফট বা ভূত্বক বিচ্ছিন্ন হওয়া অঞ্চল ইতিমধ্যে ‘গুরুত্বপূর্ণ সীমা’ বা ক্রিটিক্যাল থ্রেশহোল্ডে পৌঁছে গেছে। ফলে আগামী কয়েক মিলিয়ন বছরের মধ্যে এই অঞ্চল ভেঙে গিয়ে সেখানে...
৯ দিন আগে
মানব মস্তিষ্ক বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো, মস্তিষ্কের ভেতরেই একজন ‘মানুষের’ টিকে থাকা। কারণ মানুষ জীবিত থাকা অবস্থায় তার মস্তিষ্কের গ্রে ম্যাটার বা ধূসর পদার্থ নিয়ে বিজ্ঞানীরা ইচ্ছেমতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারেন না। ফলে মস্তিষ্ক কীভাবে বিকশিত হয়, কীভাবে এর বিভিন্ন অংশের মধ্যে সংযোগ তৈরি হয়...
১০ দিন আগে