
প্রাণিজগতের রহস্যময় জগৎ আরও একবার বিস্ময়কর হয়ে উঠল। সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রকাশ পেল, স্পেনের আইবেরিয়ান হারভেস্টার পিঁপড়ার রানি একসঙ্গে দুই ভিন্ন প্রজাতির পিঁপড়া জন্ম দিতে সক্ষম। এই অদ্ভুত প্রজননক্ষমতার চাঞ্চল্যকর প্রমাণ পেয়েছেন গবেষকেরা।
গত ৩ সেপ্টেম্বর ‘নেচার’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় এই বিস্ময়কর তথ্য উঠে আসে। গবেষণাটি পরিচালনা করেন ফ্রান্সের মন্টপেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র গবেষক জোনাথন রোমিগিয়ে ও তাঁর দল।
এই গবেষণার সূত্রপাত হয়েছিল একটি রহস্য উন্মোচনের চেষ্টায়—ইতালির সিসিলি দ্বীপে আইবেরিয়ান হারভেস্টার (মেসর আইবেরিকাস বা Messor ibericus) পিঁপড়ার একটি কলোনি থেকে একটি পরিচিত প্রজাতির পিঁপড়া (Messor structor বা মেসর স্ট্রাক্টর) অদৃশ্য ছিল। অথচ ধারণা করা হচ্ছিল, এ দুটি প্রজাতির সংমিশ্রণে হাইব্রিড পিঁপড়া তৈরি হচ্ছে। এসব কর্মী আবার কলোনিতে বসতি বানানো, খাবার সংগ্রহের মতো বিভিন্ন কাজকর্ম করে।
সমস্যা দেখা দেয় যখন সিসিলি দ্বীপ থেকে মেসর স্ট্রাক্টরের পরিচিত আবাস প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার দূরে হয়। গবেষক রোমিগিয়ে বলেন, ‘আমাদের দৃঢ় সন্দেহ ছিল যে এই প্রজাতি অস্বাভাবিক কিছু করছে। তবে কতটা অস্বাভাবিক, তা আমরা কল্পনাও করতে পারিনি।’
গবেষকেরা ইউরোপজুড়ে ১২০ টিরও বেশি পিঁপড়ার কলোনি বিশ্লেষণ করেছেন, শত শত পিঁপড়ার জিনোম সিকোয়েন্স করেছেন এবং পাঁচ বছর ধরে ল্যাবে পরীক্ষা চালিয়েছেন। এর পরেই তাঁরা দেখতে পান—একই রানির দেওয়া ডিম থেকে জন্ম নিচ্ছে একদিকে লোমশ (মেসর আইবেরিকাস), অন্যদিকে প্রায় নির্লোম (মেসর স্ট্রাক্টর) প্রজাতির পিঁপড়া।
এক রানি, দুই বংশধর
গবেষণা অনুযায়ী, মেসর আইবেরিকাস রানির ডিম দুটি ভিন্নভাবে বিকাশ লাভ করে। যদি ভবিষ্যতে রানি জন্মানোর প্রয়োজন হয়, তাহলে ডিম থেকে বিশুদ্ধ মেসর আইবেরিকাস জন্মায়। আর যদি কর্মী পিঁপড়া দরকার হয়, তখন ডিমে মেসর স্ট্রাক্টরের শুক্রাণু যুক্ত হয়ে জন্ম নেয় একটি হাইব্রিড প্রজাতি, যা পুরো কলোনির প্রায় ৯৯ শতাংশ।
এটি বিজ্ঞানীদের পিঁপড়ার প্রজনন নিয়ে প্রচলিত ধারণা বদলে দিচ্ছে। মেসর আইবেরিকাস ও মেসর স্ট্রাক্টর প্রজাতি একসময় একই ছিল, প্রায় ৫০ লাখ বছর আগে তারা আলাদা হয়ে যায়। তবে এর পরও তারা ইউরোপের কিছু অঞ্চলে একসঙ্গে বসবাস করত।
নিজেই ক্লোন করে তৈরি করে কর্মী পিঁপড়া
বছরের পর বছর ধরে মেসর আইবেরিকাস রানিরা নিজস্ব কর্মী তৈরি করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং মেসর স্ট্রাক্টর পুরুষদের সঙ্গে মিলনের মাধ্যমে হাইব্রিড কর্মী তৈরি করতে থাকে। গবেষকেরা ধারণা করছেন, এটি একটি বিবর্তনজনিত সংঘর্ষের ফল, যেখানে ‘স্বার্থপর’ জিন রানির সন্তানদের কুইন বানাতে চায়, যাতে সে পরবর্তী প্রজন্মে স্থান পায়। কর্মী পিঁপড়ারা যেহেতু প্রজনন করতে পারে না, তাই তাদের মধ্যে এই জিন ছড়াতে পারে না।
তবে একসময় মেসর আইবেরিকাস পুরুষদের সঙ্গে মিলিত হওয়া ঝামেলার হয়ে দাঁড়ায়। তখন মেসর আইবেরিকাস রানিরা এক অভিনব পদ্ধতি অবলম্বন করে—পুরুষের শুক্রাণু ব্যবহার করে তাকে ক্লোন করা শুরু করে। গবেষকেরা একে বলছেন সেক্সুয়াল ডমেস্টিকেশন (sexual domestication)। এ ধরনের পদ্ধতি আগে কোনো প্রাণীর মধ্যে দেখা যায়নি।
রোমিগিয়ে বলেন, ‘মানুষ যেমন গৃহপালিত পশু নিয়ন্ত্রণ করে, তেমনি এই রানিরা একসময়ের বন্য পুরুষদের প্রজনন সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছে।’
এভাবে তারা তাদের কলোনিতে মেসর স্ট্রাক্টরের পুরুষ ক্লোন তৈরি করে এবং এখন আর ভৌগোলিকভাবে সেই প্রজাতির কাছে থাকতে হয় না। ফলে সারা ভূমধ্যসাগরে লাখ লাখ হাইব্রিড পিঁপো কলোনি গড়ে তুলেছে।
জন্ম দিল এক নতুন প্রজনন পদ্ধতির
এই কৌশলটিকে গবেষকেরা নাম দিয়েছেন ‘জেনানারা’ (xenoparous) প্রজনন, যার অর্থ ‘অন্যের বা ভিন্নের জন্মদানকারী’। জেনোপারিটি হলো এমন একটি প্রজনন কৌশল, যেখানে এক প্রজাতি নিজের ডিম ব্যবহার করে আরেক প্রজাতির জিন ছড়িয়ে দেয়।
গবেষকেরা দেখেছেন, কেবল রানি ও পুরুষ মেসর আইবেরিকাস পিঁপড়ারাই বিশুদ্ধ। অন্য সব কর্মী পিঁপড়া হাইব্রিড, যারা মেসর স্ট্রাক্টর শুক্রাণুর মাধ্যমে জন্ম নেয়।
মাতৃ জিন মুছে দিয়ে পিতার ক্লোন
সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, রানি তার নিজের নিউক্লিয়ার ডিএনএ সম্পূর্ণ মুছে ফেলে এবং শুধু পুরুষের শুক্রাণুর জিন দিয়ে ডিম থেকে সন্তান তৈরি করে। এর ফলে জন্ম নেয় প্রায় নিখুঁতভাবে পিতার মতো দেখতে ক্লোন সন্তান।
যদিও এই ক্লোন পুরুষেরা দেখতে ভিন্ন, তাদের মাইটোকন্ড্রিয়ায় রানির ডিএনএর নামমাত্র (দশমিক ০১ শতাংশ) অংশ থাকে। তবু, নিউক্লিয়ার জিনোম অনুযায়ী এগুলো প্রকৃত ক্লোন হিসেবেই বিবেচিত।
পরীক্ষাগারের কৃত্রিম কলোনিতে দুই বছর পর্যবেক্ষণের পর গবেষকেরা দেখতে পান, একই রানির ডিম থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনোমযুক্ত দুই প্রজাতির পুরুষ জন্ম নিচ্ছে—মেসর স্ট্রাক্টর পুরুষ নির্লোম, আর মেসর আইবেরিকাস পুরুষ লোমশ।
ভবিষ্যতের গবেষণা ও ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের ক্লোনিং ভবিষ্যতে অন্যান্য প্রজাতির কৃত্রিম ক্লোনিংয়ে সহায়ক হতে পারে। তবে এটিও মনে রাখা দরকার, প্রায় সব নিষ্কাম (asexual) প্রজাতির মতো, দীর্ঘ মেয়াদে এই প্রজাতির টিকে থাকা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
ডেনমার্কের কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক জ্যাকোবাস বুমস্মা বলেন, ‘একই জিন বারবার ক্লোন করা হলে বিবর্তনীয় বৈচিত্র্য হারিয়ে যায়, যা বিলুপ্তির সম্ভাবনা বাড়ায়।’
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জেসিকা পার্সেল বলেন, ‘পিঁপড়াদের মধ্যে এমন অদ্ভুত প্রজনন কৌশল আগে দেখা যায়নি। এটি শুধু বিজ্ঞান নয়, প্রকৃতির জটিলতারও এক অপূর্ব নিদর্শন।’

জীবন ধারণের জন্য এখন পর্যন্ত আমাদের জানা একমাত্র স্থান পৃথিবী। তবে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, মহাবিশ্বে এমন কিছু গ্রহ থাকতে পারে যেখানে প্রাণের বেঁচে থাকা ও বিকাশের জন্য পৃথিবীর চেয়েও অনুকূল পরিবেশ রয়েছে।
১৯ ঘণ্টা আগে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ক্ষতিকর ব্যবহার কিংবা পারমাণবিক সংঘাতের কারণে ২১০০ সালের মধ্যে মানবজাতি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে নতুন এক বৈশ্বিক ঝুঁকি মূল্যায়নে। আগামী ৭৫ বছরে মানবস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ১৭টি হুমকির তালিকায় শীর্ষে রয়েছে এ দুটি ঝুঁকি। তালিকায় আরও রয়েছে ধনী
৪ দিন আগে
মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠে ভোরের সূর্যালোকের এক অসাধারণ দৃশ্য ধারণ করেছে নাসার কিউরিওসিটি রোভার। সম্প্রতি প্রকাশিত ছবিতে দেখা যাচ্ছে, মঙ্গলের কয়েক শ কোটি বছর আগে গঠিত খাঁজকাটা পাথুরে শৃঙ্গগুলোয় ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়েছে।
৭ দিন আগে
অ্যাসিমেট্রিক অর্গানিক সিন্থেসিসে যুগান্তকারী উদ্ভাবনের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন প্রখ্যাত রসায়নবিদ অঁরি বি কাগান ও কেনসো সোয়াই।
৮ দিন আগে