Ajker Patrika

সৌরজগতে নতুন বামন গ্রহের সন্ধান, যা জানা গেল

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
সৌরজগতে নতুন বামন গ্রহের সন্ধান, যা জানা গেল
ভেরা সি. রুবিন অবজারভেটরির মাধ্যমে সদ্য আবিষ্কৃত একটি বামন গ্রহের কক্ষপথ। ছবি: সিএনএন

সৌরজগতের প্রান্তসীমায় সম্ভাব্য নতুন বামন গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। ইডি–১৩৮ নামের বস্তুটির ব্যাস ৬০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার হতে পারে। এর অস্তিত্ব ও আকার নিশ্চিত হলে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান সংঘের (আইএইউ) স্বীকৃত বামন গ্রহের তালিকায় যুক্ত হবে নতুন একটি নাম।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন–এর খবরে বলা হয়েছে, অস্থায়ীভাবে ইডি–১৩৮ নাম দেওয়া এই মহাজাগতিক বস্তুটির সন্ধান মিলেছে চিলিতে অবস্থিত ভেরা সি. রুবিন অবজারভেটরির পর্যবেক্ষণ-তথ্য বিশ্লেষণ করে। তবে এটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বামন গ্রহের স্বীকৃতি দিতে আরও কয়েক মাস পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন হতে পারে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান সংঘের (আইএইউ) স্বীকৃত বামন গ্রহের সংখ্যা পাঁচটি। এগুলো হলো সেরেস, প্লুটো, হাউমেয়া, মাকেমাকে ও এরিস। ইডি–১৩৮-এর অস্তিত্ব ও ভৌত বৈশিষ্ট্য নিশ্চিত হলে এই তালিকায় যুক্ত হবে ষষ্ঠ বামন গ্রহ।

চিলির ২ হাজার ৬৮২ মিটার বা ৮ হাজার ৮০০ ফুট উঁচু একটি পর্বতের চূড়ায় অবস্থিত রুবিন অবজারভেটরিতে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম ডিজিটাল ক্যামেরা। ২০২৫ সালে কার্যক্রম শুরু করা এই টেলিস্কোপ প্রতি তিন দিনে পুরো আকাশের ছবি ধারণ করতে সক্ষম।

স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের জ্যেষ্ঠ জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রভাষক ম্যাথিউ হলম্যান ২০২৬ সালের শুরুর দিকে রুবিন অবজারভেটরির সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করতে একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম ব্যবহার করেন। চলমান মহাজাগতিক বস্তুর কোটি কোটি শনাক্তকরণ-তথ্য বিশ্লেষণের জন্য তাঁর সহ-উন্নয়ন করা ওই প্রোগ্রাম ব্যবহার করা হয়।

এ সময়ই ইডি–১৩৮-এর সন্ধান পান হলম্যান। বস্তুটি শনাক্ত হওয়ার পর তাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল ‘উত্তেজনামিশ্রিত অবিশ্বাস’। সম্ভাব্য ভুল শনাক্তকরণ কিংবা কম্পিউটার প্রোগ্রামের ত্রুটি রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে তিনি দ্রুত তথ্যগুলো যাচাই করেন। পর্যবেক্ষণের সত্যতা নিশ্চিত করতে হলম্যান তাঁর সহকর্মী মারিও জুরিচের সঙ্গে কাজ করেন। জুরিচ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং রুবিন অবজারভেটরির সৌরজগৎবিষয়ক প্রধান বিজ্ঞানী।

রুবিন অবজারভেটরির তথ্যভান্ডারে ইডি–১৩৮-এর আরও পর্যবেক্ষণ খুঁজতে গিয়ে জুরিচ ২০২৬ সালের মার্চ থেকে শুরু করে অতিরিক্ত ২০টি পর্যবেক্ষণের তথ্য পান। পরে অন্যান্য উৎসের তথ্য ব্যবহার করে গবেষকেরা বস্তুটির কক্ষপথের গতিপথ প্রায় ১০ বছর পেছন পর্যন্ত নির্ণয় করতে সক্ষম হন।

হলম্যান বলেন, ইডি–১৩৮ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বামন গ্রহ হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। বস্তুটির প্রকৃত আকার নির্ধারণ করা জরুরি এবং এ জন্য সম্ভবত আরও কয়েক মাস সময় লাগবে।

গবেষকদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ইডি–১৩৮-এর ব্যাস ৬০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার বা ৩৭০ থেকে ৯৩০ মাইল হতে পারে। এই হিসাব সঠিক হলে এটি বর্তমানে স্বীকৃত বামন গ্রহগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ছোট সেরেসের চেয়েও বড় হবে। বস্তুটি বর্তমানে সূর্য থেকে প্রায় ৪৬ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক একক দূরত্বে প্রদক্ষিণ করছে। এক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক একক বলতে পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যকার গড় দূরত্বকে বোঝায়। ফলে ইডি–১৩৮ প্লুটোর চেয়েও দূরে অবস্থিত। বস্তুটি খালি চোখে দেখা যায় না। তবে হলম্যানের মতে, পর্যাপ্ত সক্ষমতাসম্পন্ন অপেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এর অবস্থান সম্পর্কে জানলে এটি পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।

ইডি–১৩৮ এত দিন শনাক্ত না হওয়ার অন্যতম কারণ এটি দক্ষিণ গোলার্ধের আকাশে অবস্থিত। ফলে উত্তর গোলার্ধ থেকে বস্তুটি পর্যবেক্ষণ করা কঠিন। হলম্যানের মতে, এর অবস্থানের কারণে এমন অনেক টেলিস্কোপের মাধ্যমে বস্তুটি শনাক্ত করার সুযোগ সীমিত হয়েছে, যেগুলো অন্যথায় এটি খুঁজে পেতে পারত। এ ছাড়া দক্ষিণ গোলার্ধের আকাশ পর্যবেক্ষণে নিয়োজিত টেলিস্কোপের সংখ্যাও তুলনামূলকভাবে কম।

আরেকটি কারণ হলো, ইডি–১৩৮ আমাদের ছায়াপথ মিল্কিওয়ের সমতলের কাছাকাছি অবস্থান করছে। হলম্যান বলেন, গত ২০ বছর ধরে পৃথিবী থেকে পর্যবেক্ষণের দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী বস্তুটি মিল্কিওয়ের ওপর দিয়ে বক্রপথে চলেছে। মিল্কিওয়েতে অসংখ্য নক্ষত্র থাকায় ওই অঞ্চলে চলমান মহাজাগতিক বস্তু শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। এ কারণে সাধারণত জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সেখানে এ ধরনের বস্তুর অনুসন্ধান করেন না।

ইডি–১৩৮-এর আবিষ্কার রুবিন অবজারভেটরির শনাক্ত করা মহাজাগতিক বস্তুর ক্রমবর্ধমান তালিকায় নতুন সংযোজন। এখন পর্যন্ত এই তালিকায় প্রধানত গ্রহাণু এবং আকারে অনেক ছোট ট্রান্স-নেপচুনীয় বস্তু রয়েছে। হলম্যানের ধারণা, ইডি–১৩৮-এর মতো আকারের আরও হাতে গোনা কয়েকটি বস্তু সৌরজগতে থাকতে পারে। রুবিন অবজারভেটরি ভবিষ্যতে সেগুলোরও সন্ধান পাবে বলে আশা করছেন তিনি।

রুবিন অবজারভেটরির সৌরজগৎ পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম দলের সদস্য এবং কুইন্স ইউনিভার্সিটি বেলফাস্টের জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের রিডার মেগান শোয়াম্ব এক ইমেইলে বলেন, রুবিন অবজারভেটরি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সৌরজগতের আরও গভীর ও বিস্তৃত তালিকা তৈরি করছে। তিনি বলেন, পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমের প্রাথমিক পর্যায়েই এত বড় একটি বস্তু শনাক্ত হওয়ায় তিনি বিস্মিত হয়েছেন। চলতি বছর এমন আবিষ্কার হবে বলে তিনি আশা করেননি। শোয়াম্বের মতে, দ্রুত পর্যবেক্ষণ, মহাকাশের ক্ষীণ বস্তু শনাক্ত করার সক্ষমতা এবং আকাশের বিস্তৃত অঞ্চল পর্যবেক্ষণের সমন্বিত সুবিধা আগামী এক দশকে সৌরজগৎ সম্পর্কে মানুষের ধারণায় বড় পরিবর্তন আনবে। বিশেষ করে আগামী কয়েক বছরে এই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হবে।

২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান সংঘ গ্রহের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনে। নতুন সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো মহাজাগতিক বস্তুকে গ্রহ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হলে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয়। বস্তুটিকে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে হবে, নিজস্ব মহাকর্ষের প্রভাবে প্রায় গোলাকার হতে হবে এবং নিজের কক্ষপথের আশপাশ থেকে সমান আকারের অন্যান্য বস্তু সরিয়ে দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত মহাকর্ষীয় প্রভাব থাকতে হবে।

এই সংজ্ঞার ভিত্তিতে প্লুটোকে গ্রহের মর্যাদা থেকে অবনমিত করা হয়। কারণ, এটি নিজের কক্ষপথের আশপাশ থেকে সমান আকারের অন্যান্য বস্তু সরিয়ে দিতে পারেনি। ফলে সৌরজগতের গ্রহের সংখ্যা নয়টি থেকে কমে আটটিতে দাঁড়ায়।

একই সময়ে প্লুটো ও এর মতো অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তু ‘বামন গ্রহ’ হিসেবে পরিচিতি পায়। বামন গ্রহগুলো প্রায় গোলাকার এবং সূর্যকে প্রদক্ষিণ করলেও নিজেদের কক্ষপথের আশপাশ থেকে অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তু বা ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে দেওয়ার মতো সক্ষমতা রাখে না। ইডি–১৩৮-কে নতুন বামন গ্রহ হিসেবে নিশ্চিত করা হলে প্রথমে বস্তুটিকে একটি স্থায়ী নম্বর দেওয়া হবে। এরপর নির্ধারণ করা হবে এর আনুষ্ঠানিক নাম। তবে পুরো প্রক্রিয়ায় সময় লাগতে পারে। নাম নির্বাচনের দায়িত্ব ঠিক কারা পাবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

হলম্যান বলেন, ইতিমধ্যে অনেকে তাঁকে ইমেইলে বিভিন্ন নামের প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। তবে প্রস্তাবিত নামগুলোর কয়েকটি অন্য মহাজাগতিক বস্তুর ক্ষেত্রে আগেই ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি নিজেও কোনো নাম প্রস্তাব করার সুযোগ পেতে পারেন, যদিও এ বিষয়ে তাঁর প্রত্যাশা কম। তাঁর ভাষায়, এটি একটি বড় প্রকল্প।

‘এটিকে একটি জগৎ হিসেবে ভাবা যায়’

নিউজিল্যান্ডের ক্যান্টারবেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মিশেল ব্যানিস্টার এই আবিষ্কারকে বৈজ্ঞানিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। ইডি–১৩৮ শনাক্তকরণের সঙ্গে তিনি সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। তিনি সৌরজগতের ক্ষুদ্র মহাজাগতিক বস্তু নিয়ে গবেষণা করেন। ব্যানিস্টারের মতে, ইডি–১৩৮ বৈজ্ঞানিকভাবে আকর্ষণীয়, কারণ এটি একই সঙ্গে একটি ট্রান্স-নেপচুনীয় বস্তু এবং আকারের দিক থেকে বেশ বড়। অথচ বস্তুটি খালি চোখে দেখা যায় না এবং খালি চোখে দৃশ্যমান মহাজাগতিক বস্তুর তুলনায় অনেক বেশি অনুজ্জ্বল।

তিনি বলেন, ইডি–১৩৮-এর আকার এমন একটি সীমার মধ্যে রয়েছে, যেখানে একে একটি স্বতন্ত্র জগৎ হিসেবে বিবেচনা করার কথা ভাবা যায়। বস্তুটি সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করতে এখন অন্যান্য টেলিস্কোপও পর্যবেক্ষণে যুক্ত হবে।

ব্যানিস্টার বলেন, ভবিষ্যতে সেখানে কোনো মহাকাশযান পাঠানো সম্ভব হলে দেখা যেতে পারে, প্লুটোর মতো ইডি–১৩৮-তেও নাইট্রোজেনের হিমবাহ রয়েছে। এমন কিছু আবিষ্কার করা হবে দারুণ ব্যাপার। তবে বর্তমানে বিজ্ঞানীরা শুধু জানেন, বস্তুটি আকারে বড়। এর প্রকৃত ভৌত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বাকি সবকিছুই আপাতত অনুমাননির্ভর।

সূত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, ইডি–১৩৮-এর আবিষ্কার সৌরজগতের দূরবর্তী অঞ্চলে আরও বড় মহাজাগতিক বস্তু থাকার সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে। তবে এর আকার, প্রকৃতি ও বামন গ্রহ হিসেবে স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে আরও পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা প্রয়োজন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত