Ajker Patrika

‘শক্তি বিভব দাও’

সম্পাদকীয়
‘শক্তি বিভব দাও’

শারদীয় দুর্গোৎসবের শেষ দিন আজ—বিজয়া দশমী। কীভাবে এল দিনটি? সেই কবেকার কথা, কতশত বছর, কত সময়ের পরত পড়েছে সেই ইতিহাসের ওপর! শাস্ত্র ছেড়ে বাংলায় দুর্গা হয়েছেন কন্যা। হয়ে উঠেছেন মানুষের প্রতিরূপ। আবার থেকে গেছেন দেবীও। ফলে এই অঞ্চলে তাঁর এক মানুষরূপী দেবতার প্রতিরূপ গড়ে উঠেছে। এখানে তিনি প্রতিবছর বাপের বাড়ি আসেন—দুধ, দই, মিষ্টিমণ্ডা খেয়ে আবার চলে যান কৈলাসে, পতিগৃহে। বাংলার সেই চিরাচরিত নাইওর যেন! কন্যা যখন পিতৃগৃহ থেকে পতিগৃহে যায়, পরিবার-প্রতিবেশী কার মন ভালো থাকে? সে জন্যই হয়তো রাজ্জাক দেওয়ান লিখেছেন, [...] ‘ছিড়ে গেছে গাঁথা মালা মায়ার বাঁধন’। কিন্তু এ বাঁধন কি ছেঁড়ে? পিতৃগৃহে কন্যার অপেক্ষার প্রহর কি শেষ হয়?

এই যে কন্যারূপী দেবী দুর্গা, তাঁর শক্তি কোথায়? অসুর তথা অপশক্তি দলনে, সহিষ্ণুতায়, সমন্বয়ে। শত শত বছর ধরে এই অঞ্চলে দুর্গার আরাধনা নানা রূপে বিকশিত হয়েছে। কখনো রাজপরিবার ও জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায়, কখনো পারিবারিক আয়োজনে, আবার কখনো শহরের সর্বজনীন মণ্ডপে। সময়ের সঙ্গে দুর্গাপূজা ধর্মীয় আচার ছাড়িয়ে সামাজিক মিলন, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও পারস্পরিক সহাবস্থানের উপলক্ষ হয়ে উঠেছে। স্বাভাবিকভাবে দুর্গাপূজার দুটি রূপ তৈরি হয়েছে, একটি ধর্মীয় রীতিনীতির; অন্যটি উৎসবের। এই উৎসব সর্বজনীন।

কন্যা বিদায়ে বৈরী প্রতিবেশীও বিরহে ব্যাকুল হয়ে ওঠে। তেমনি এই বাংলায় দেবী রূপে দুর্গা সব সময় একটা সমন্বয়ের ভেলা ভাসিয়ে রেখেছেন। রাজ্জাক দেওয়ান যেমন কষ্ট পান কন্যা চলে যাওয়ার দুঃখে, নজরুল তেমনি সেই কন্যারূপী দেবীর কাছেই প্রার্থনা করেন, [...] ‘দীনতা ভীরুতা লাজ গ্লানি ঘুচাও,/দলন কর মা লোভ দানবে/রূপ দাও, জয় দাও, যশ দাও, মান দাও,/দেবতা কর ভীরু মানবে।’ এরপরই তাঁর প্রার্থনা, ‘শক্তি বিভব দাও,/দাও মা আলোক দুঃখ-দারিদ্র্য অপগত হোক,/জীবে জীবে হিংসা, এই সংশয়/ (মাগো) দূর হোক পোহাক এ দুর্যোগ-রাত্রি।।’

পৃথিবী যখন বিভেদের আগুনে পুড়ছে, এশিয়া থেকে ইউরোপের দেশে দেশে যখন দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের হাহাকারে বাতাস ভারী হয়ে উঠছে, সেই দুর্যোগময় সময়ে কেউ যদি কন্যারূপী দেবীর কাছে প্রার্থনা করে—‘দুর্যোগ রাত্রি’ পোহানোর শক্তি দাও, আমাদের ‘লোভ দানব’কে দলন করো—তাহলে নিশ্চয়ই অন্যায় হবে না? বরং অন্যায়কে ‘অন্যায়’ বলতে আর রুখে দিতে এই শক্তির তো প্রয়োজন আছেই, সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘুর মধ্যে বিভাজন ও বৈষম্য দূর করতেও প্রয়োজন।

বাংলাদেশে সব সময় সব ধর্মের মানুষের মধ্যে যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন রয়েছে, তা তো দুর্গোৎসবের মতো আয়োজনেই বারবার প্রমাণিত হয়ে আসছে। কিছু মন খারাপ করা বিচ্ছিন্ন ঘটনা এই বন্ধন নিশ্চয়ই ছিন্ন করতে পারবে না। এই দেশে রবীন্দ্রনাথ-নজরুল উভয়ই সমাদৃত হয়। কিন্তু যারা রাজনীতিতে ঘৃণা ছড়াতে চায়, তারাই ধর্মের নামে বিভেদ সৃষ্টি করে। তাদের মিথ্যে প্রমাণ করতেই প্রতিবছর আসে সর্বজনীন দুর্গোৎসব।

সবাইকে সেই উৎসবের শুভেচ্ছা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত