Ajker Patrika

ফেদেরিকো ফাজিনের ভাবনায় মানুষের ভবিষ্যৎ

আসিফ, বিজ্ঞান বক্তা ও সম্পাদক, মহাবৃত্ত
ফেদেরিকো ফাজিনের ভাবনায় মানুষের ভবিষ্যৎ
প্রযুক্তি জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি মানুষের অস্তিত্বের নতুন সংকটও হাজির করেছে। ছবি: পেক্সেলস

ফেদেরিকো ফাজিনের নাম আমি আগেও শুনেছি। কিন্তু পোস্ট-বায়োলজিক্যাল সোসাইটির ওপর আজকের পত্রিকায় আমার একটি লেখা এ বছরের মে মাসে প্রকাশিত হয়। ‘যান্ত্রিক উৎকর্ষ ও মানবিকতার ভবিষ্যৎ’ শিরোনামে প্রকাশিত লেখাটি অপু পড়ে। লেখাটি পড়ার পর সে আমাকে মাইক্রোপ্রসেসরের এই পথপ্রদর্শকের একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও শেয়ার করে। ভিডিওটির সঙ্গে দেওয়া ওর মন্তব্য ছিল, ‘আমার মনে হয়েছে, ফেদেরিকো ফাজিনের বক্তব্যের সঙ্গে আপনার লেখার একটি গভীর যোগসূত্র রয়েছে।’

বিষয়টি ঘাঁটতে গিয়ে আমি একটু অবাকই হলাম। ১৯৭১ সালের কথা; সেই সময়ে একজন মানুষ, যতই প্রযুক্তিবিদ হোক না কেন, এমন কিছু কথা বলে গেছে—ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়!

এখানে অপুর কথা একটু বলে নেওয়া প্রয়োজন। নাইমুল ইসলাম অপু—একজন ড্রোন বিশেষজ্ঞ, যে কাজের প্রয়োজনে জাইকার (JICA) সঙ্গে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ব্রিজ ও মেট্রোরেলের মতো মেগা স্ট্রাকচার প্রকল্পে ঘুরে বেড়ায়, অ্যাস্ট্রো ফটোগ্রাফিতে তার দক্ষতা অনেক ভালো। নব্বইয়ের দশকের শেষে, ১৯৯৯ সালে, স্কুলজীবনের শেষ দিকে সে আমাদের ‘ডিসকাশন প্রজেক্ট’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। আমাদের বক্তৃতা অনুষ্ঠানগুলোতে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত কার্যকর। কিন্তু একসময় হঠাৎ করে সে আমার চলাফেরার জগৎ থেকে হারিয়ে যায়।

দীর্ঘ বিরতির পর, ২০২৩-২৪ সালের দিকে—মস্তিষ্কের মেনিনজাইটিস রোগে আক্রান্ত হয়ে যখন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসছি—সেই দুঃসময়ে অপু খবর পেয়ে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে। দীর্ঘ ২০ বছর পর এসেই সে আবেগপ্রবণ হয়ে বলে উঠল, ‘আসিফ ভাই, কাজের সূত্রে পৃথিবীর অনেক দেশে ঘুরেছি। কিন্তু যখনই কোনো মহাসাগরের তীরে দাঁড়িয়েছি, বারবার আপনার কথাই মনে পড়েছে। এত বিশালতার কথা আপনার মতো করে আর কেউ আমাকে বলেনি।’

অপুর এই অনুভূতি-অনুভব আমাকে এক গভীর উপলব্ধির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। আর এই উপলব্ধিকে সঙ্গী করেই ফিরে আসি প্রযুক্তির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ গন্তব্য নিয়ে আমার মূল আলোচনায়। রোবোটিকসের খ্যাতনামা অধ্যাপক হ্যান্স মোরাভেক আজ থেকে কয়েক দশক আগে ‘যান্ত্রিক স্বর্গ’ বা ‘মেকানাইজড প্যারাডাইস’-এর যে ধারণা দিয়েছিলেন, তা কার্যত আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। অথচ এর বিপরীত পিঠেই রয়েছে এক বিপন্ন বাস্তবতা; মানুষের জৈবিক ও নৈতিক অস্তিত্ব আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি, যার চূড়ান্ত পরিণতি হতে পারে ‘টেকনোলজিক্যাল সিঙ্গুলারিটি’ বা প্রযুক্তির সেই অভাবনীয় মোড়, যেখানে নিয়ন্ত্রণের রেখাটি ধোঁয়াশা হয়ে যায়।

এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, প্রযুক্তির লাগাম কি শেষ পর্যন্ত মানুষের হাতেই থাকবে, নাকি আমরা যন্ত্রের সম্পূর্ণ অধীন হয়ে পড়ব? আর যদি যন্ত্রই সবকিছুর নিয়ন্তা হয়ে ওঠে, তবে মানবজীবনের অর্থ বা তাৎপর্য তখন কোথায় অবশিষ্ট থাকবে? ১৯৭১ সালে মাইক্রোপ্রসেসরের পথপ্রদর্শক ফেদেরিকো ফাজিন তাঁর এক বক্তব্যে যেন এই সংকটের উত্তরণ এবং আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার পথই দেখিয়ে গেছেন। তাঁর সেই চিন্তার গভীরে আমি চেতনার এক দারুণ আলো দেখতে পেলাম।

প্রযুক্তির ইতিহাসে ফাজিন নিঃসন্দেহে এক উজ্জ্বল নাম; প্রথম মাইক্রোপ্রসেসর (ইন্টেল ৪০০৪) তৈরির মাধ্যমে তিনি মানবসভ্যতার এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর অবদান শুধু প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রযুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়েও তিনি মানুষ, চেতনা এবং যন্ত্রের আন্তসম্পর্ক নিয়ে যে গভীর দার্শনিক চিন্তা করেছেন, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি আধুনিক বিজ্ঞানবাদী (সায়েন্টিজম) ধারণাকে শুধু প্রশ্নবিদ্ধই করে না, বরং আমাদের সামনে মানবিকতার এক নতুন ও উচ্চতর ব্যাখ্যা হাজির করে।

আধুনিক বিজ্ঞানবাদ বারবার আমাদের বোঝাতে চায়, মানুষ শুধুই একটি জৈবিক যন্ত্র—রক্ত-মাংসের সমষ্টি, যার কার্যকারিতা কেবল রাসায়নিক ও বৈদ্যুতিক সংকেতের ওপর নির্ভরশীল। প্রযুক্তির মোড়কে মানুষকে দেখার এই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তাকে শুধু একটি বস্তুতে পরিণত করে। কিন্তু ফাজিনের মতে, মানুষকে এভাবে দেখা এক বড় ভুল। তাঁর দর্শনে, মানুষ কোনো যান্ত্রিক সমষ্টি নয়; বরং আমরা প্রত্যেকে আসলে একেকটি ‘চেতনার ক্ষেত্র’ (ফিল্ড অব কনশাসনেস)। এই চেতনার ভেতরে আমরা একই সঙ্গে পর্যবেক্ষক, পর্যবেক্ষণীয় এবং কর্মী। অর্থাৎ, আমরা শুধু বাইরের জগৎকে দেখছি না, একই সঙ্গে আমাদেরও দেখা হচ্ছে এবং আমরা আমাদের কর্মের মাধ্যমে জগৎকে রূপ দিচ্ছি। অস্তিত্বের এই বহুমাত্রিক অবস্থানই আমাদের প্রকৃত স্বরূপকে প্রকাশ করে।

এই স্বরূপের গভীরে গেলে দেখা যায়, ফাজিনের ধারণা অনুযায়ী চেতনার ক্ষেত্রের কোনো নির্দিষ্ট স্থান বা সময় নেই; বরং সময় ও স্থানই এই ক্ষেত্রের ভেতরে অবস্থান করে। অর্থাৎ, আমরা শুধু স্থানের ভেতর বিচরণকারী কোনো বস্তু নই, বরং আমরাই সেই ক্ষেত্র, যার ভেতরে সময় ও স্থান বিদ্যমান। এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের প্রচলিত চিন্তার ভিত্তিকেই আমূল বদলে দেয়। কারণ, আমরা যখন নিজেদের শুধু যন্ত্র হিসেবে ভাবতে শুরু করি, তখনই আমাদের প্রকৃত সত্তাকে ছোট করে ফেলি। এই আত্মবিস্মৃতির সুযোগেই প্রযুক্তির যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও রোবট আমাদের ওপর আধিপত্য বিস্তারের অবকাশ পায়। ক্ষমতাশালীরা তখন উন্নত প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে সাধারণ মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে সচেষ্ট হয়। আর এই বিপদ তখনই বাস্তব হয়ে ওঠে, যখন আমরা নিজেদের সেই সীমাহীন শক্তির উৎস ও চেতনার সত্যকে অস্বীকার করতে শুরু করি।

এই বিপদ শুধু তাত্ত্বিক নয়, বরং বাস্তব। প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে অকল্পনীয়ভাবে সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের অস্তিত্বের সামনে নতুন এক সংকটও হাজির করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আজ আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি স্তরে বিস্তৃত। এটি আমাদের কাজের গতি ও সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিলেও একই সঙ্গে আমাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা ও চিন্তার জগৎকে এক গভীর হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আমরা যদি সচেতনভাবে নিজেদের শুধু যন্ত্রের সমতুল্য জৈবিক সত্তা হিসেবে মেনে নিই, তবে প্রযুক্তি অনিবার্যভাবেই আমাদের ওপর চূড়ান্ত আধিপত্য বিস্তার করবে।

আর ঠিক এই জায়গায় ফেদেরিকো ফাজিনের সতর্কবার্তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তাঁর মতে, প্রযুক্তি তখনই মানুষের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠবে, যখন আমরা নিজেদের প্রকৃত স্বরূপকে ভুলে যাব। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, মানুষ

কোনো সাধারণ যন্ত্র নয়; বরং মানুষ এক গভীর চেতনার অধিকারী। আর এই অনন্য চেতনাই আমাদের প্রযুক্তির অন্ধ অনুসারী বা দাসে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে। আমাদের করে তুলতে পারে প্রযুক্তির প্রকৃত নিয়ন্ত্রক। আর এই নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে আজকের যুগে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো আত্মচেতনা অর্জন করা।

আমাদের বুঝতে হবে যে আমরা শুধু রক্ত-মাংসের কোনো যান্ত্রিক কাঠামো নই; আমাদের অস্তিত্ব অনেক গভীর ও আধ্যাত্মিক। এই সত্যকে হৃদয়ে ধারণ করে নিজের ভেতরের সুপ্ত শক্তিকে চিনতে পারলেই আমরা প্রযুক্তির অমোঘ স্রোতকে সঠিক খাতে প্রবাহিত করতে পারব। আরও মনে রাখতে হবে, আত্মচেতনার অভাব ঘটলে প্রযুক্তি আমাদের শত্রুতে পরিণত হতে পারে, কিন্তু সেই চেতনা যখন জাগ্রত থাকে, তখন প্রযুক্তি আমাদের অস্তিত্বের পরিপূরক এবং এক পরম সহযোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়।

ফেদেরিকো ফাজিনের ভাবনা আমাদের সামনে একটি অমোঘ প্রশ্ন তুলে ধরে: প্রযুক্তি কি শেষ পর্যন্ত মানুষের সহযোগী হয়ে থাকবে, নাকি মানুষই প্রযুক্তির দাসে পরিণত হবে? এই জটিল সমীকরণের উত্তর সম্পূর্ণভাবে আমাদের আত্মচেতনার ওপর নির্ভর করছে। আমরা যদি নিজেদের শুধু যন্ত্র ভেবে ভুল করি, তবে যন্ত্রই একদিন আমাদের শাসন করবে।

এই চিন্তার অতলে ডুবে থাকতেই হঠাৎ মনে পড়ে যায় অপুর সেই কথাগুলো। ‘মহাসাগরের বিশালতায় দাঁড়ালে আপনার কথাই মনে পড়ে’—আর তখন মনের ভেতর প্রবল ভালো লাগার অনুভূতি কাজ করতে লাগল। ২০২৪ সালে যমুনা রেলসেতুর নিচে স্পিডবোটে ঘোরার সময় সেই অনুভূতি যেন আরও তীব্র হয়ে উঠেছিল। যমুনার উত্তাল জলরাশির উচ্ছ্বাস আমাকে নিয়ে গিয়েছিল প্লাংক স্কেলের সেই বিক্ষুব্ধ কোয়ান্টাম জগতে, যেখানে পদার্থ আর চেতনার সীমারেখা ঝাপসা হয়ে আসে। সেই মুহূর্তের গভীরতায় অপুর কফির কাপে চুমুক দিয়ে করা প্রশ্নটি আজও আমাকে তাড়িত করে—‘কোয়ান্টাম বাস্তবতার ওই অতিপারমাণবিক স্তরে আসলে কী ঘটে? চেতনার জন্মই-বা হয় কোথায়?’

আসিফ, বিজ্ঞান বক্তা ও সম্পাদক, মহাবৃত্ত

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত