Ajker Patrika

সম্প্রীতি ও আত্মপরিচয়ের মেলবন্ধন

দুর্গাপূজা ও দাসাই নৃত্য

ষ্টেফান সরেন, উন্নয়নকর্মী
সম্প্রীতি ও আত্মপরিচয়ের মেলবন্ধন
দুর্গাপূজায় সাঁওতাল জনগোষ্ঠীরা আয়োজন করে দাসাই নাচের। ছবি: সংগৃহীত

ছোটবেলা থেকে শারদীয় দুর্গাপূজার সময় সাঁওতালদের ঐতিহ্যবাহী ‘দাসাই নৃত্য’ দেখে আসছি। বাংলাদেশে যখন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা দুর্গাপূজার আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠেন, ঠিক সেই সময় উত্তরবঙ্গের সাঁওতালপল্লিতে একেবারে ভিন্ন আঙ্গিকের আনন্দ-উৎসব অনুষ্ঠিত হয়, যা দেশবাসী সেভাবে অবগত নয়।

দাসাই কোনো সাধারণ নাচ নয়, এটি একটি ঐতিহাসিক ‘যুদ্ধনৃত্য’। এই নাচের একটি চমৎকার নিয়ম রয়েছে। দাসাই দল প্রতিটি আদিবাসী পরিবারের দ্বারে দ্বারে গিয়ে সম্মান প্রদর্শন করে জিজ্ঞেস করে—‘বাসায় আপনারা আছেন?’ ভেতর থেকে উত্তর যদি হ্যাঁবাচক আসে, তখনই সেখানে শুরু করা হয় ‘দাসাই নাচ’। আর যদি ‘হ্যাঁ’ উত্তর না পাওয়া যায়, তবে দলটি নীরবে অন্য বাড়ির উদ্দেশে কামরু গুরুর গান করতে করতে চলে যায়। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সাম্প্রতিক সময়ে গ্রামগুলোতে দাসাই নাচের দল আসার সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। কালের বিবর্তনে কোনো একদিন হয়তো আমাদের এই লোকসংস্কৃতি থেকে হারিয়ে যাবে ঐতিহ্যবাহী দাসাই নৃত্য।

সাধারণত কানে কানপাশা, পায়ে আলতা-নূপুর এবং মাথায় ফেট্রি (এক ধরনের বিশেষ পাগড়ি) পরে সাঁওতাল পুরুষেরা এই ঐতিহ্যবাহী নাচে অংশ নেন। তাঁদের মাথায় ফেট্রিতে গোঁজা থাকে ময়ূরের চোখধাঁধানো পালক। দাসাই উৎসবের দিনগুলোতে গ্রামের বিভিন্ন রাস্তা ও বাজারে ঢোল, মাদল ও করতালের অদ্ভুত ছন্দে বিশেষ এই নৃত্য চলে। সাঁওতাল সম্প্রদায়ের বিশ্বাস, ছদ্মবেশে লুকিয়ে থাকা তাঁদের আরাধ্য ‘হুদুড় দুর্গা’কে খুঁজে বের করতেই যুগ যুগ ধরে এই নাচের আয়োজন হয়ে আসছে। এ বিষয়ে শতবর্ষী প্রবীণ সাঁওতাল ব্যক্তিত্ব লুৎথরু মাঝির কাছে জানেতে পারি, এই দাসাই নৃত্য সাঁওতাল জাতির বহু শতাব্দীর প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।

আমরা অবগত আছি যে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বড় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার ঢাকের কাঠি যখন বেজে ওঠে, ঠিক তখনই উত্তরবঙ্গের সাঁওতাল গ্রামগুলোতে বেজে ওঠে এক ভিন্ন সুর—বুয়াং আর মাদলের আদিম ও গম্ভীর ধ্বনি। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে যা দুর্গাপূজা, সাঁওতাল সম্প্রদায়ের কাছে তা-ই দেবী দুর্গার আবহে নিজস্ব ইতিহাস ও ঐতিহ্যমণ্ডিত দাসাই নৃত্য। এ দুটি উৎসবের বাহ্যিক রূপ ও আচার ভিন্ন হলেও এর অন্তর্নিহিত মূল সুর কিন্তু এক অশুভশক্তির বিনাশ আর মানবতার জয়গান। যুগে যুগে এ দুটি উৎসব আমাদের এই ভূখণ্ডে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক অনুপম অনবদ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে আসছে।

সাঁওতালদের দাসাই নৃত্যের পেছনে একটি গভীর ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। প্রচলিত সাঁওতাল লোকগাথা অনুযায়ী, মহিষাসুরের সঙ্গে যুদ্ধের সময় সাঁওতালদের দুই বীর যোদ্ধা ও পরম গুরু ‘আয়নম’ এবং ‘কাজল’কে আর্যরা বন্দী করে নিয়ে যায়। তাঁদের উদ্ধার করার জন্য সাঁওতাল পুরুষেরা নারীর ছদ্মবেশ ধারণ করেন। তাঁরা মাথায় ময়ূরের পালক গুঁজে এবং হাতে ‘বুয়াং’ (বাঁশের তির-ধনুক নিয়ে, ছেঁড়া বস্তার পোশাক পরিধান করে, মুখে চুন ও কালি মাখিয়ে এক বিদ্রূপাত্মক চেহারে তৈরি করে বাইরে বেরিয়ে পড়েন) নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে নাচ, লাফানি-ঝাঁপানি আর গুনগুন করে গান গাওয়া শুরু করেন। এটাই ছিল তাঁদের কৌশল। ছদ্মবেশে শত্রুশিবিরে প্রবেশ করে নিজেদের হারিয়ে যাওয়া বীরদের খোঁজ করাই ছিল এই নৃত্যের মূল ও ঐতিহাসিক উদ্দেশ্য।

ওই সময় থেকে প্রতিবছর আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী থেকে দশমী তিথি পর্যন্ত, অর্থাৎ দুর্গাপূজার সমান্তরালে সাঁওতালরা এই দাসাই নাচ পালন করে আসছেন। দাসাই কেবল একটি বিনোদনমূলক নাচ নয়; এটি সাঁওতালদের আত্মপরিচয়। পুরুষেরা যখন ধুতি-শাড়ি পরে, ঘুঙুর পায়ে দলবদ্ধভাবে হুর-হুররে, ডুর-ডুরহেলকেল বা বিলাপের গান গেয়ে নাচেন, তখন তা দর্শকদের এক অপার্থিব অনুভূতিতে আচ্ছন্ন করে। এই উৎসবের মাধ্যমে তাঁরা স্মরণ করেন তাঁদের পূর্বপুরুষদের বীরত্ব, টিকে থাকার ঐতিহাসিক লড়াই এবং জাতিগত আত্মত্যাগকে।

বর্তমান আধুনিকতার তীব্র আগ্রাসনে এবং সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সাঁওতালদের এই অনন্য সংস্কৃতি ঐতিহ্যবাহী দাসাই নৃত্য আজ চরম সংকটের মুখোমুখি হয়ে পড়েছে। নতুন প্রজন্মের অনেকে এই বুয়াং তৈরি করতে চান না এবং দাসাইয়ের বিশেষ সুরগুলোও ভুলে যাচ্ছেন। রাষ্ট্র ও সমাজ যদি এই লোকসংস্কৃতি রক্ষায় অবিলম্বে এগিয়ে না আসে, তবে সাঁওতালদের হাজার বছরের পুরোনো বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের একটি বড় ও গৌরবোজ্জ্বল অংশ চিরতরে হারিয়ে যাবে।

শারদীয় দুর্গাপূজা এবং দাসাই নৃত্য আমাদের এই শিক্ষা দেয়, কীভাবে ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাস ও সংস্কৃতির মানুষ একই সময়ে আনন্দের রঙে মেতে উঠতে পারে। বিজয়া দশমীর মণ্ডপে যখন সিঁদুর খেলা আর আরতি চলে, ঠিক তখন সাঁওতালপল্লিতে বুয়াং ও দাসাই নৃত্য মাদল আর করতালের তালে সাঁওতাল যুবকদের পদচারণ আমাদের এই বহুত্ববাদী সমাজকে আরও বেশি সমৃদ্ধ ও সুসংহত করে তোলে। এই উৎসবের আলোয় দূর হোক সব সামাজিক বৈষম্য ও দূরত্বের দেয়াল। আর রাষ্ট্রীয় সুরক্ষায় টিকে থাকুক প্রতিটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব অধিকার ও অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত