রায়হান ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলেন। ব্যবসা বড় করার পরিকল্পনা আছে, ক্রেতাও আছে। কিন্তু ঋণের সুদ বেশি, ঋণপত্র খুলতে অনিশ্চয়তা, গ্যাসের চাপ কম, বিদ্যুতের সরবরাহ ঠিক নেই। কয়েক মাস অপেক্ষার পর তিনি নতুন কারখানা না করার সিদ্ধান্ত নিলেন। এই একটি সিদ্ধান্ত হয়তো জাতীয় পরিসংখ্যানে বড় কোনো ঘটনা হিসেবে ধরা পড়বে না। কিন্তু এমন হাজারো রায়হানের সিদ্ধান্তের যোগফলই শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগ কমায়, কর্মসংস্থান হয় না এবং প্রবৃদ্ধির হার কমিয়ে দেয়।
৬ অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট দেশের অর্থনীতির বর্তমান সংকটকে এই বাস্তবতার আলোকে দেখতে বাধ্য করে। প্রতিবেদনে ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। বিনিয়োগের গতি দুর্বল, রপ্তানির প্রবৃদ্ধি শ্লথ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা আরও গভীর হয়েছে। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ এত কম যে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।
এটি কেবল একটি অর্থবছরের ফল নয়। বরং অর্থনীতির ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সমস্যার সতর্কসংকেত। প্রশ্ন হলো, সরকার কি এই সংকেতকে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি সূচকের অবনতি হিসেবে দেখবে, নাকি নীতির মৌলিক দুর্বলতা স্বীকার করে সংস্কারের পথে হাঁটবে?
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্যগুলোর একটি হলো, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের জুনে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই হার শুধু ব্যাংকের ব্যালান্সশিটের সমস্যা নয়; এটি অর্থনীতির উৎপাদনক্ষমতা, আমানতকারীর আস্থা এবং নতুন উদ্যোক্তার ঋণপ্রাপ্তির ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করছে। কিছু ব্যাংক থেকে মানুষ জমানো অর্থই তুলতে পারছে না।
যখন ব্যাংকের বড় অংশের ঋণ অনাদায়ি থাকে, তখন ভালো উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ আরও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। ব্যাংক নতুন বিনিয়োগে সতর্ক হয়, ঋণ দেওয়ার শর্ত কঠিন করে এবং অনেক সময় ঝুঁকি সামলানোর ব্যয় গ্রাহকের ওপর চাপায়। ফলে যাঁরা উৎপাদন বাড়াতে চান, নতুন প্রযুক্তি আনতে চান বা কর্মী নিয়োগ করতে চান, তাঁরাই সংকটে পড়েন। অন্যদিকে প্রভাবশালী ঋণখেলাপি যদি বারবার সুবিধা পান, তাহলে বাজারে একটি বিপজ্জনক বার্তা যায়, ঋণ ফেরত না দেওয়ারও রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক মূল্য কম।
সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত সমস্যাটির প্রকৃত মাত্রা স্বীকার করা। ব্যাংকভেদে খেলাপি ঋণ, পুনঃ তফসিল, অবলোপন, মূলধন ঘাটতি এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের ঋণের তথ্য নিয়মিত ও স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে হবে। কোন ব্যাংক কতটা ঝুঁকিতে, কত মূলধন প্রয়োজন, কে দায়ী এবং পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা কী—এসব তথ্য গোপন রেখে আস্থা ফিরবে না।
তবে শুধু খেলাপি ঋণের তালিকা প্রকাশ করলেই হবে না। কার্যকর তদারকি, ঋণ অনুমোদনে পেশাগত মানদণ্ড এবং পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি, জালিয়াতি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষকে বেআইনি সুবিধা দেওয়ার ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে; একই সঙ্গে ব্যবসায়িক ব্যর্থতা ও অপরাধমূলক আচরণের মধ্যে পার্থক্য করতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণ জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। এর অর্থ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো ও জলবায়ু অভিযোজনের মতো প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় বাড়ানোর জন্য সরকারের হাতে পর্যাপ্ত নিজস্ব সম্পদ নেই। একই সঙ্গে রাজস্ব ঘাটতি বাড়লে সরকারকে ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়, যা ভবিষ্যতের বাজেটের ওপর চাপ তৈরি করে।
এখানে সরকারের নীতিগত ব্যর্থতা শুধু কম কর আদায়ে নয়; করব্যবস্থার কাঠামোতেও। করের আওতা বাড়ানোর পরিবর্তে বারবার পরিচিত ও সহজে কর আদায়যোগ্য গোষ্ঠীর ওপর চাপ দিলে ন্যায্যতা নষ্ট হয়। বড় করদাতা, উচ্চ আয়ের ব্যক্তি, সম্পদশালী গোষ্ঠী এবং কর ফাঁকির ঝুঁকিপূর্ণ খাতে কার্যকর নজরদারি না থাকলে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির ওপর করের চাপ বাড়ে, অথচ সম্ভাব্য রাজস্ব অধরাই থেকে যায়।
এ অবস্থায় করহার বাড়ানোই সমাধান নয়। প্রথমে কর প্রশাসন আধুনিক করতে হবে। আয়কর, মূল্য সংযোজন কর, কাস্টমস ও কোম্পানির তথ্যের মধ্যে আইনসম্মত সমন্বয় বাড়ানো, ই-রিটার্ন ও ডিজিটাল অডিট সম্প্রসারণ, কর অব্যাহতির হিসাব প্রকাশ এবং অযৌক্তিক ছাড়ের নিয়মিত পর্যালোচনা জরুরি। কর কর্মকর্তার বিবেচনাধীন ক্ষমতা কমিয়ে নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা গড়তে হবে, যাতে ব্যবসায়ীকে কর দিতে গিয়ে অনিশ্চয়তা ও হয়রানির মুখে পড়তে না হয়।
বিশ্বব্যাংক জ্বালানি খাতের দুর্বলতাকেও বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর চাপের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা শিল্প উৎপাদন ব্যাহত করে, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি করে এবং নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেয়।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য গ্যাস ও বিদ্যুৎ শুধু একটি পরিষেবা নয়; এটি উৎপাদন পরিকল্পনার মৌলিক শর্ত। কারখানা যদি নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন করতে না পারে, তাহলে ক্রেতার কাছে পণ্য সরবরাহে দেরি হয়, রপ্তানি আদেশ হারানোর ঝুঁকি বাড়ে এবং কর্মীর কাজের সময় কমে যায়। ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তার পক্ষে বিকল্প জ্বালানি বা ব্যয়বহুল জেনারেটরের খরচ বহন করা আরও কঠিন।
সরকারকে তাই জ্বালানি খাতে তিনটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রথমত, উৎপাদন, আমদানি, সঞ্চালন ও বিতরণের প্রকৃত ব্যয় এবং সরবরাহের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনায় নবায়নযোগ্য শক্তি, গ্রিডের সক্ষমতা, জ্বালানি দক্ষতা এবং আমদানির ঝুঁকি একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তৃতীয়ত, ভর্তুকি ও মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে এমন নীতি নিতে হবে, যাতে একদিকে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক স্থিতি বজায় থাকে, অন্যদিকে দরিদ্র পরিবার ও উৎপাদনশীল শিল্প অযৌক্তিক ব্যয়ের মুখে না পড়ে।
ব্যয়বহুল বা অকার্যকর প্রকল্পের দায় শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিল, সরকারি ভর্তুকি কিংবা করদাতার অর্থের ওপর পড়ে। তাই প্রতিটি বড় চুক্তির আর্থিক ঝুঁকি, সম্ভাব্য দায় এবং বিকল্পের তুলনামূলক মূল্যায়ন প্রকাশ করা উচিত।
সরকারের জন্য আরেকটি কঠিন প্রশ্ন হলো, প্রবৃদ্ধি কোথা থেকে আসবে? বিশ্বব্যাংক বলছে, বেসরকারি বিনিয়োগের অবস্থা তথৈবচ এবং রপ্তানি গতি হারিয়েছে। প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের জন্য শুধু সরকারি ব্যয় বাড়ানো বা বড় প্রকল্প ঘোষণা যথেষ্ট নয়। এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে উদ্যোক্তা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে পারেন।
এর জন্য নীতির ধারাবাহিকতা, চুক্তির নিশ্চয়তা, দ্রুত অনুমোদন, প্রতিযোগিতামূলক বাজার, দক্ষ কর্মী এবং নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো প্রয়োজন। ব্যবসার অনুমোদন ও নবায়নপ্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতা কমিশন ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করতে হবে, যাতে বাজারে প্রভাবশালী গোষ্ঠী নতুন উদ্যোক্তার প্রবেশ আটকে দিতে না পারে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জন্যও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো স্বচ্ছ ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার নিয়ম থাকা দরকার।
বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে সংস্কার কর্মসূচি প্রকাশ করতে হবে, যা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ হবে। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতি কমানোর মাইলফলক, রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর লক্ষ্য, জ্বালানি সরবরাহ উন্নয়নের সূচক এবং বেসরকারি বিনিয়োগের বাধা দূর করার পরিকল্পনা—সবকিছুর জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ও নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকতে হবে। প্রতি তিন মাসে অগ্রগতি প্রকাশ করে সংসদ, গণমাধ্যম, ব্যবসায়ী সমাজ ও নাগরিকদের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করা উচিত।
একই সঙ্গে সংস্কারের ব্যয় কারা বহন করবে, তা আগেই বিবেচনায় নিতে হবে। ব্যাংক পুনর্গঠন, জ্বালানির মূল্য সমন্বয় বা কর প্রশাসনের পরিবর্তন—কোনোটিই সামাজিক প্রভাবের হিসাব ছাড়া করা উচিত নয়। দরিদ্র পরিবার, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও নিম্ন আয়ের শ্রমিককে সুরক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন কোনো সরকারের জন্য চূড়ান্ত রায় নয়; এটি অর্থনীতির ঝুঁকি ও সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন। সরকার যদি এসবকে কেবল সাময়িক চাপ বলে পাশ কাটায়, তবে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের দুর্বলতা আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।










