সাগরের শীর্ষে বসে ঘুরপথে বাণিজ্য

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯২ শতাংশ এবং কনটেইনারজাত পণ্যের ৯৮ শতাংশ যায়। ২০২৫ সালে বন্দরটি প্রথমবারের মতো ৩৪ লাখ টিইইউজ কনটেইনারের সীমা ছাড়িয়েছে, যা ১৯৭৭ সালে কনটেইনার পরিচালনা শুরুর পর সর্বোচ্চ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই সংখ্যা আরও বেড়ে প্রায় ৩৫ লাখ ২০ হাজারে পৌঁছেছে, আর এ সময়ে জাহাজের গড় অবস্থানকালও কমেছে। সংখ্যাগুলো আশাজাগানিয়া। তবু একই বন্দর লয়েডস লিস্টের বিশ্বের শীর্ষ ১০০ কনটেইনার বন্দরের তালিকায় ৬৮তম। অর্থাৎ যে দেশকে ‘ভূরাজনীতির কেন্দ্র’ বলা হচ্ছে, তার প্রধান প্রবেশদ্বার বিশ্ব বাণিজ্যের মানদণ্ডে মধ্য সারির।
বন্দরের সক্ষমতা কেবল ক্রেন আর ইয়ার্ডের ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে একটি রাষ্ট্র প্রতিদিন কতটা নিয়মিত ও অনুমানযোগ্য থাকতে পারে, তার ওপর। একজন জাহাজমালিক ‘কৌশলগত গুরুত্ব’ দেখে বিনিয়োগ করেন না। তিনি দেখেন, তাঁর জাহাজ তিন দিন আটকে থাকবে কি না। চট্টগ্রাম বন্দরে সর্বোচ্চ ৯.৫ মিটার এবং মোংলায় ৮.৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারে। অথচ বিশ্ব বাণিজ্যের ভরকেন্দ্র সরে গেছে বিশাল মাদার ভেসেলের দিকে, যেগুলোর জন্য প্রয়োজন এর চেয়ে ঢের বেশি গভীর পানি।
ফল কী দাঁড়ায়? আমাদের রপ্তানি পণ্য প্রায়ই ছোট ফিডার জাহাজে চড়ে প্রথমে অন্য দেশের বন্দরে যায়, তারপর সেখান থেকে বড় জাহাজে ইউরোপ বা আমেরিকার পথ ধরে। এতে সময় বাড়ে, খরচ বাড়ে আর আমাদের বাণিজ্যের একটা অংশের লাভ চলে যায় অন্যের বন্দরে। যে দেশ নিজেকে ‘সংযোগস্থল’ বলে দাবি করে, তার নিজের পণ্যই ঘুরপথে সংযুক্ত হচ্ছে। এটা শুধু পরিহাস নয়, একটা নীতিগত ব্যর্থতার চিহ্ন।
সমাধানের প্রতিশ্রুতি নতুন নয়। কিন্তু প্রতিশ্রুতির ইতিহাসটা দীর্ঘ এবং ক্লান্তিকর। সোনাদিয়ার গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প ২০১৫ সালে বাতিল হয়েছে। পায়রায় গভীর সমুদ্রবন্দরের পরিকল্পনা ২০২১ সালে শেষ পর্যন্ত থিতিয়ে যায়, আর বন্দরটির চ্যানেল এখন ১০.৫ মিটার পর্যন্ত ড্রাফটের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য খোলা। থাকল মাতারবাড়ী। এই বন্দরে ১৬ মিটার ড্রাফটের এবং ৮ হাজার ২০০ টিইইউ পর্যন্ত বহনক্ষম জাহাজ ভিড়তে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে, আর এটি দেশের কনটেইনার সক্ষমতায় প্রায় ১০ লাখ টিইইউ যোগ করবে। বর্তমান ৩৫ লাখ টিইইউর তুলনায় এটি সক্ষমতার প্রায় এক-চতুর্থাংশের বেশি বৃদ্ধি। ১৬ মিটার মানে চট্টগ্রামের চেয়ে প্রায় দেড় গুণের বেশি গভীরতা। কিন্তু আগে প্রত্যাশা ছিল বন্দরটি ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে কার্যক্রম শুরু করবে। অথচ সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি প্রায় ১৫ শতাংশে দাঁড়িয়ে আছে। সময়সূচি আর বাস্তবতার এই ফারাকই আমাদের ভূরাজনৈতিক আখ্যানের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা। কূটনীতির ভাষায় আমরা ‘কেন্দ্র’, নির্মাণের ভাষায় আমরা এখনো প্রথম ধাপে। এর পাশে রাখুন প্রতিবেশীর হিসাব। কলকাতার হলদিয়া ডক কমপ্লেক্সে সর্বোচ্চ ড্রাফট মাত্র ৯.১ মিটার। অন্যদিকে ওডিশার গোপালপুর বন্দরের সর্বোচ্চ ড্রাফট ১৪.৫ মিটার। মানে, বঙ্গোপসাগরের উপকূলজুড়ে গভীর পানির একটা নীরব প্রতিযোগিতা চলছে। এই দৌড়ে আমরা এগিয়ে যেতে পারি, যদি সময়মতো শেষ করতে পারি। পিছিয়েও পড়তে পারি। সুযোগের জানালা চিরকাল খোলা থাকে না। যে বন্দর আগে গভীর হবে, জাহাজ কোম্পানির রুট-পরিকল্পনায় আগে ঢুকবে সেই বন্দরই।
বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে বিশ্লেষকদের উচ্ছ্বাস আমরা প্রায়ই শুনি। এর উপকূলজুড়ে প্রায় ১৪০ কোটি মানুষের বাস, যা বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ, আর বিশ্বে পরিবাহিত পণ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এই সাগর পাড়ি দেয়। এটি বিশ্বের বৃহত্তম উপসাগর, আয়তন প্রায় ২১ লাখ ৭০ হাজার বর্গকিলোমিটার। কিন্তু এই উচ্ছ্বাসের পাশেই একটি লজ্জাজনক পরিসংখ্যান আছে। ২০১৮ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, উপসাগরীয় দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য ৫ শতাংশের কম, যেখানে আসিয়ানের ক্ষেত্রে এটি ২৯ শতাংশ। একই লেখায় আরও বিস্ময়কর তুলনা আছে: ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে স্থলপথের বাণিজ্য এতই সামান্য যে তা ভারতের সুদূর নিকারাগুয়ার সঙ্গে মোট বাণিজ্যের চেয়ে কম।
এই শূন্যতা আমাদের জন্য দুটি জিনিস বলে। প্রথমত, ‘সংযোগ রাষ্ট্র’ হওয়ার ধারণা যতই আকর্ষণীয় হোক, সংযোগের চাহিদা এখনো তৈরি হয়নি। রাস্তা, রেল আর বন্দর বানালেই ট্রানজিট পণ্য আসে না। সে জন্য চাই আঞ্চলিক শুল্ক-সমন্বয়, অভিন্ন ডিজিটাল কাস্টমস, পারস্পরিক স্বীকৃত মান আর ভরসাযোগ্য সময়সূচি। এগুলো সরকারি চুক্তির চেয়ে অনেক বেশি কষ্টসাধ্য প্রশাসনিক কাজ। দ্বিতীয়ত, এই শূন্যতাই আমাদের সুযোগ। যে প্রথম নির্ভরযোগ্য সেতু গড়বে, সে-ই পুরো অঞ্চলের বাণিজ্যের নিয়ম লিখবে।
বড় শক্তিগুলোর আগ্রহ বাংলাদেশের জন্য একটি সুযোগ, একই সঙ্গে ফাঁদ। ফাঁদটা হলো, দুর্বল দর-কষাকষির অবস্থানে গিয়ে আমরা ‘ভাড়াটে ভূগোল’ হয়ে যেতে পারি, যেখানে বন্দর, রাস্তা কিংবা জমি বিভিন্ন শক্তিকে দেওয়া হয় একটা তাৎক্ষণিক ঋণ বা প্রকল্পের বিনিময়ে। সুবিধা মেলে এক দিনে, দায় থেকে যায় দশকের পর দশক।
এর বিপরীত পথটা হলো ভূগোলকে ‘বাজারে’ রূপ দেওয়া। বাজার মানে যেকোনো শক্তির বিনিয়োগ আমাদের নিজস্ব শর্তে, প্রকাশ্য প্রতিযোগিতায় এবং স্পষ্ট চুক্তিতে আসবে। যেমন বে টার্মিনাল ও লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের মতো প্রকল্পে পাবলিক-প্রাইভেট মডেলে দুটি কনটেইনার টার্মিনাল ও একটি বহুমুখী টার্মিনাল হবে, যেগুলো আনুমানিক ১২ মিটার ড্রাফট ও ৫ থেকে ৬ হাজার টিইইউ ধারণক্ষমতার জাহাজ সামলাতে পারবে। এখানে আসল প্রশ্ন প্রযুক্তি নয়, চুক্তির স্বচ্ছতা: কে অপারেটর হবে, কত বছরের জন্য, কী কার্যকারিতা-শর্তে, কেউ ব্যর্থ হলে কী হবে। একাধিক অপারেটর, একাধিক দেশ, একাধিক টার্মিনাল থাকলে কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরতা তৈরি হয় না। আর সবচেয়ে বড় কথা, দাবার বোর্ডে ঘুঁটি নয়, খেলোয়াড় থাকতে হলে আগে নিজের ঘর গোছাতে হবে।
সমুদ্র-অর্থনীতির জন্য মানুষ গড়তে হবে। ব্লু ইকোনমি নিয়ে আমাদের বিশ্লেষণ বহু বছর ধরেই ফিরে ফিরে একটি ঘাটতির কথা বলছে—সমুদ্রসম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণের জন্য দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তির অভাব। সমুদ্রবিজ্ঞান, জাহাজ প্রকৌশল, বন্দর ব্যবস্থাপনা ও লজিস্টিকসে বিশেষায়িত শিক্ষা না থাকলে গভীর সমুদ্রের সম্পদও অন্যের হাতে যাবে।
ইতিহাস আমাদের শেখায়, ভূগোল কোনো রাষ্ট্রকে ধনী করে না, রাষ্ট্রই ভূগোলকে কাজে লাগানোর সক্ষমতা অর্জন করে। সিঙ্গাপুরের কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল না, ছিল একটি ভালো প্রশাসন আর একটি সময়ানুবর্তী বন্দর। আমাদের ভূগোল তার চেয়ে ঢের বেশি উপহার দিয়েছে: একটি বিশাল উপসাগরের শীর্ষবিন্দু, বিশাল যুবশক্তি, বিস্তৃত নদীজাল আর প্রতিবেশী বাজার। কিন্তু উপহার পাওয়া আর সেটি ব্যবহার করা এক জিনিস নয়।









