Ajker Patrika

ন্যাটো কি ভাঙনের মুখে

রাজিউল হাসান
ন্যাটো কি ভাঙনের মুখে
গ্রিনল্যান্ড সংকটের কারণে মৃত্যু ঘটতে পারে ন্যাটোর। ছবি: এএফপি

বিশ্বের শেষ প্রান্তের একটি অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড। ২১ লাখ ৬০ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই অঞ্চল বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বীপ। আয়তনের হিসাবে দ্বীপটি বাংলাদেশের চেয়ে সাড়ে ১৪ গুণ বড়। তবে জনসংখ্যা ৫৬ হাজারের কিছু বেশি। তাদের সিংহভাগই মৎস্যজীবী। অঞ্চলটির ৮০ শতাংশ এলাকাই মানববসতিশূন্য। মোটের ওপর মাত্র ২০ শতাংশ এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে মানুষের বসবাস। প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা বরফে ঢাকা থাকায় এই অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থাও নাজুক। এখানে সহজ যোগাযোগ বলতে হয় নৌযান, নতুবা হেলিকপ্টার।

বরফাচ্ছাদিত এই অঞ্চল ঘিরেই বিশ্বের পরাক্রমশালী সামরিক জোট ন্যাটোর অস্তিত্ব সংকট তৈরি হয়েছে। এর বড় কারণ, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে সরাসরি দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে ন্যাটোরই দুই সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক। যুক্তরাজ্যসহ যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্ররাও ডেনমার্কের পক্ষে অবস্থান নিয়ে জড়িয়ে গেছে এ দ্বন্দ্বে। তাদের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়ে এখন আগুনে ঘি ঢালার কাজ সারছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর প্রেক্ষাপটে ১৯৪৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ন্যাটো সামরিক জোট গঠিত হয়। এই জোটের উদ্দেশ্য ছিল সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব রক্ষা। স্নায়ুযুদ্ধের পুরোটা সময় ন্যাটো জোট কাজ করেছে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্প্রসারণবাদ ও প্রভাব মোকাবিলায়। আর সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙনের পর ন্যাটো মূলত মার্কিন নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বৈশ্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে এই জোটের সদস্যসংখ্যা ৩২।

এদিকে গ্রিনল্যান্ড হলো এমন একটি অঞ্চল, যেটি সাদা চোখে আর্কটিকে বরফে ঢাকা একটি বিশাল অঞ্চল বলে মনে হবে। তবে বিভিন্ন দিক থেকে বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এই দ্বীপের গুরুত্ব অনেক। এই দ্বীপ খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। সেসব খনিজের মধ্যে বিরল খনিজও রয়েছে। এই খনিজ স্মার্টফোন থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরিসহ অত্যাধুনিক প্রযুক্তিপণ্যের অপরিহার্য উপাদান। অন্যদিকে গ্রিনল্যান্ডের ভৌগোলিক অবস্থানও এই অঞ্চলকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। এর একদিকে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র, আরেক দিকে আর্কটিক ও রাশিয়া, তৃতীয় দিকে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় অন্য দেশগুলো। ফলে মার্কিন প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্য বিবেচনায় এই অঞ্চল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে যুক্তরাষ্ট্র এই প্রথমবারের মতো প্রথম গ্রিনল্যান্ড কেনার কিংবা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার উদ্যোগ নেয়নি। গত শতকের চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকেও যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার চেষ্টা করেছে; কিন্তু পারেনি।

সম্প্রতি গ্রিনল্যান্ড আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত এই উষ্ণায়নের কারণে গ্রিনল্যান্ডে বরফ গলনের হার দিন দিন বাড়ছে। ফলে তৈরি হচ্ছে বাণিজ্যের নতুন জলপথ। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক দিক বিবেচনায় মিসরের সুয়েজ খালের রুটের চেয়ে গ্রিনল্যান্ডের রুট সবদিক থেকে পণ্য পরিবহনে সাশ্রয়ী। এই দ্বীপকে নিয়ন্ত্রণে নিতে যুক্তরাষ্ট্রের মরিয়া হয়ে ওঠার এটিও কারণ।

এখন আসা যাক, গ্রিনল্যান্ড সংকট কীভাবে ন্যাটোকে হুমকিতে ফেলেছে। এই দ্বীপ ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত একটি অঞ্চল। একসময় এটি ছিল ডেনমার্কের উপনিবেশ। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের নানা প্রান্তে শুরু হয়ে যায় ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের জোয়ার। সেই জোয়ারে গ্রিনল্যান্ডও অনেকটা স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের মতো আত্মপ্রকাশ করে। আর চলতি শতকের প্রথম দশকে এই অঞ্চল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে পরিণত হয়। তবে তাদের পররাষ্ট্র, অর্থনৈতিকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ডেনমার্ক এখনো সিদ্ধান্ত নেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোটের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ডেনমার্ক। এ ছাড়া গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ানো যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসও এই সামরিক জোটের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য। এই পাঁচ দেশ এবং সুইডেন, জার্মানি ও ফিনল্যান্ডের ওপর ট্রাম্প বাড়তি ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আগামী ১ ফেব্রুয়ারির আগে যদি এই দেশগুলো গ্রিনল্যান্ড ইস্যুটি সুরাহা করতে না পারে, তাহলে ওই দিন থেকেই শুল্ক কার্যকর হবে।

শুধু তা-ই নয়, ডেনমার্ক যদি স্বেচ্ছায় গ্রিনল্যান্ড হস্তান্তর না করে, তাহলে জোর ছিনিয়ে নেওয়ারও হুমকি দিয়ে রেখেছেন ট্রাম্প। সে ক্ষেত্রে সামরিক সংঘাত অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে। ন্যাটো জোট গঠিত হয়েছিল সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য। কিন্তু জোটের দুই সদস্য যখন নিজেরা সংঘাতে জড়াবে, তখন যে ন্যাটোর অস্তিত্ব সংকট তৈরি হবে, তা বলে দেওয়া যায়। আর সেই দ্বন্দ্বে যদি ন্যাটোর আরও সদস্যদেশ জড়িয়ে পড়ে, তাহলে সেটি হবে এই সামরিক জোটের জন্য নির্ঘাত মৃত্যু।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্ররা এরই মধ্যে নিজেদের মতো করে সামরিক জোট গড়ার তোড়জোড় শুরু করেছে। ট্রাম্প বেশ আগে থেকে ন্যাটোর জন্য সদস্যরাষ্ট্রগুলোর তহবিল সরবরাহের হার নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করে আসছেন। তাঁর ভাষ্য, ন্যাটোর বাকি সদস্যরাষ্ট্রগুলো এই সামরিক জোটের কাছ থেকে যে সুবিধা পায়, সে অনুপাতে তাদের তহবিল সরবরাহ পর্যাপ্ত নয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বোঝা দিন দিন বাড়ছে। তিনি এই বোঝা ঝেড়ে ফেলতে চান। ট্রাম্পের এমন অবস্থানের কারণে ন্যাটোর অখণ্ডতা এরই মধ্যে নড়বড়ে হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে দুই সদস্যরাষ্ট্রের সরাসরি সংঘাত সেই নড়বড়ে অবস্থানকে যে আরও ভঙ্গুর করে তুলবে, তাতে সন্দেহ নেই।

এদিকে ভৌগোলিকভাবে গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান বলা যেতে পারে একেবারে রাশিয়ার মুখের ওপর। কাজেই মস্কো কিছুতেই তার দোরগোড়ায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতি চাইবে না। তাই গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যদি সংঘাত শুরু হয়, তাহলে রাশিয়াও সেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে ঠেকাতে কোনো না কোনোভাবে সক্রিয় হবে।

ষাটের দশকে ডেনমার্কের সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি অবশ্য এরই মধ্যে রয়েছে। তবে সেই সংখ্যা একেবারেই কম। যুক্তরাষ্ট্র সে সময় ওই সেনা মোতায়েন করেছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্ভাব্য হুমকি প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে। তবে স্নায়ুযুদ্ধ-উত্তর সময়ে সামরিক উপস্থিতি অনেকটা কমিয়ে এনেছে যুক্তরাষ্ট্র। সে হিসাবে রুশ কর্তৃপক্ষও গ্রিনল্যান্ডের দিক থেকে সেভাবে এত দিন হুমকির আশঙ্কা করেনি। কিন্তু এখন প্রেক্ষাপট ভিন্ন। কাজেই রাশিয়াও সক্রিয় হবে। মার্কিন নেতৃত্বে সামরিক জোটের উপস্থিতি ঠেকাতে রাশিয়া কোন পর্যন্ত যেতে পারে, তা আমরা এরই মধ্যে ইউক্রেন সংকটের ক্ষেত্রে দেখেছি। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রুশ হামলার পেছনে যত কারণ ছিল, তার অন্যতম হলো ন্যাটো জোটে কিয়েভের অন্তর্ভুক্তির প্রচেষ্টা। রাশিয়া কখনোই তার সীমান্তে কিংবা দোরগোড়ায় ন্যাটোর ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা সামরিক মোতায়েন মেনে নেয়নি, কখনো নেবেও না। সে কারণে এই প্রেক্ষাপটেও গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা থেকে যায়।

সব মিলিয়ে বলা যেতে পারে, গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান হয়তো বিশ্বের প্রত্যন্ততম এলাকায়, কিন্তু তাকে ঘিরে যে ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে, তা নাড়িয়ে দিতে পারে পুরো বিশ্বকে। এমনকি এই সংকটের কারণে মৃত্যু ঘটতে পারে ন্যাটোরও।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত