Ajker Patrika

সংস্কৃতির সংকট, জাতীয় স্বার্থ ও বন্দর রক্ষা

মামুনুর রশীদ
সংস্কৃতির সংকট, জাতীয় স্বার্থ ও বন্দর রক্ষা
চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়াকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী আন্দোলন চলমান আছে। ছবি: আজকের পত্রিকা

বহুদিন ধরেই চর্চিত বিষয়টি নিয়ে আবারও রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি লেপনের ঘটনাটি সবার ক্ষোভের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুষ্টিমেয় কিছু সাম্প্রদায়িক শক্তি, বিশেষ করে যারা ভ্রান্ত পথে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার করে থাকে, তারা কিছু মিথ্যা স্পাই গাওয়ার চেষ্টা করছে।

অনেক আগে থেকে অভিযোগ আছে, এই মিথ্যা সাফাইয়ের কাজে উসকানিদাতা হলেন একজন স্বঘোষিত বুদ্ধিজীবী, যিনি পেশায় অধ্যাপক। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় অভিযোগ উঠেছে, তিনি এসব ঘটনার ডাল-পালা ছড়ানোর অন্যতম কুশীলব।

পৃথিবীর ইতিহাসে এমনটা ঘটেছে কি না তা জানা নেই। একটি ঔপনিবেশিক শক্তি একটি রক্তাক্ত যুদ্ধে যখন আত্মসমর্পণ করে, তার লেজুড়রাও সহসাই নিষ্ক্রিয় হয়ে বাঁচার পথ খোঁজে ও এদিক-সেদিক পালায় এবং মূল স্রোতের দ্বারা ধিক্কৃত হয়। অবশ্যই আমাদের দেশ সেদিক দিয়ে বড় ব্যতিক্রম। তারা মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে। রাজাকার, আলবদর সেজে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়কে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। সাম্প্রদায়িক শক্তিকে উসকে দিয়েছে। এবং রাষ্ট্রক্ষমতার অংশী হয়েছে।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে তারা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার পাঁয়তারা করছে। এসব জনগণ প্রত্যাখ্যান করলেও তারা থামেনি। বাংলার যেসব ব্যক্তিত্ব বিশ্বের দরবারে আমাদের ভাষা এবং সাহিত্যকে প্রতিষ্ঠা করেছেন, তাঁদেরকেও সুযোগ পেলেই ভারতীয় ট্যাগ দিয়ে নানাভাবে অসম্মানিত করার প্রাণপণ চেষ্ট করেছে। আমাদের পতাকা, জাতীয় সংগীত—এসবকেও প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ তাদের সব সময় প্রত্যাখ্যান করেছে। ভবিষ্যতেও তাদের আস্তাকুঁড়ে অবশ্যই নিক্ষেপ করবে এ দেশের শুভবোধসম্পন্ন জনগণ।

কিছুদিন ধরেই চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়াকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী আন্দোলন চলমান আছে। জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে এভাবে একটা লাভজনক টার্মিনালকে বিদেশি কোম্পানির কাছে দেওয়ার বিরুদ্ধে একমাত্র বামপন্থীরা আন্দোলন সংগঠিত করার চেষ্ট চালিয়ে যাচ্ছে। এসব বিষয় নিয়ে প্রধান বিরোধী দলের কোনো ধরনের প্রতিবাদ ও বিরোধিতা চোখে পড়ছে না। এ জায়গায় সরকার আর বিরোধী দল যেন এক সুতোয় সমান্তরালে দাঁড়িয়ে গেছে। পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থ নিয়ে এই শক্তির লোকজনও টুঁ শব্দ করছে না। ইরানে মার্কিন হামলা বা গাজায় মুসলিম নিধন এ ব্যাপারে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। জুলাই আন্দোলনের পরপরই আমাদের দেশের শত শত কলকারখানা বন্ধ করা হলো, লাখ লাখ শ্রমিক বেকার হয়ে গেলেন। কিন্তু তাঁদের নিয়ে এরা কোনো একটি কথাও বলল না।

কয়েক মাস ধরে সাবেক প্রধান উপদেষ্টার নতুন ব্যবসার কারণে যে হামে শত শত শিশু মারা গেল, সে ব্যাপারেও তাদের কোনো কথা নেই। কিন্তু এ রকম জরুরি সব বিষয়কে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য তারা এবং তাদের শিষ্যরা প্রস্তুত। রবীন্দ্রনাথকে ভারতীয় প্রমাণ করো এবং তাকে হিন্দু প্রমাণ করো। তারা কি জানে না যে রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ছিলেন না, তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম এবং জন্মগতভাবে বাঙালি। তাঁর জীবদ্দশায় পাকিস্তান হয়নি।

আসলে মূল সমস্যাতে মুখ ঘোরানোর জন্য যে এইসব হঠাৎ আবিষ্কার, তার মূলেও রয়েছে সাম্প্রদায়িকতা। সময়টা বেছে নিয়েছে যে সামনে দুর্গাপূজা, এর আগেই একটা উত্তেজনা সৃষ্টি করা যায় কি না। কিন্তু এর মধ্যেই দুর্গাপূজায় যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা না হয়, সে ব্যাপারে তাদের নেতা রীতিমতো জিহাদি মনোভাব নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় বক্তৃতা দিয়ে যাচ্ছেন। এই বক্তৃতার ভাষায় এমন প্রমাণিত হয় যে দুর্গাপূজায় যেন সংকট হয়েই থাকে এবং তিনি তলোয়ার নিয়ে নামবেন যাতে কোথাও কোনো সংকট না থাকে।

এদেশের মানুষ সব সময়ই অসাম্প্রদায়িক। কোনো উসকানি ছাড়া কোনো দুর্বৃত্তও মাঠে নামে না। অতীতের সব ধরনের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পেছনেও উসকানি এবং সম্পদ লুণ্ঠনের ইতিহাস রয়েছে। সরকার যদি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়, তাহলে কোনো ধরনের ছোটখাটো সংকটও হওয়া সম্ভব নয়।

এ কথা সত্য, ভারত আমাদের বড় প্রতিবেশী দেশ এবং ভারতের সরকার কর্তৃক নানা ধরনের অসম চুক্তি আমাদের দেশের জন্য ক্ষতিকর হয়েছে। তার মধ্যে পানি চুক্তি রয়েছে। রয়েছে নানা ধরনের বাণিজ্যিক চুক্তিও। সেসব আজ পর্যন্তও জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। আর যেসব চুক্তির বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে তার বিরুদ্ধে জনতার ক্ষোভও রয়ে গেছে। এই ধরনের কর্মকাণ্ডের ফলে ভারতের যে অসাম্প্রদায়িক জনগণ আছে তাদের জন্যও এসব একধরনের উসকানি। এই উসকানিতে অনেক সাধারণ মানুষও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।

আমেরিকার সঙ্গে যেসব চুক্তি হয়েছে তা সাধারণের কাছে একেবারেই প্রকাশিত নয়। অনুমান করতে পারি, এত শত গার্মেন্টস কারখানা যে বন্ধ হয়ে গেল, তা এই চুক্তিগুলোরই সরাসরি প্রতিফলন। সাবেক প্রধান উপদেষ্টা দেশটাকে নানাভাবে নিজের স্বার্থের কারণে ব্যবহার করেছেন এবং এখনো বিনা আমন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় ফোরামকে ব্যবহার করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে হাজির হয়েছেন। এই লোকটির সার্বক্ষণিক চিন্তাই হচ্ছে বাংলাদেশকে নানাভাবে সর্বনাশের প্রান্তে নিয়ে যাওয়া। তাঁর শাসনামলে অনেক মবের জনক হিসেবে তিনি অবিহিত হয়েছেন। অনেক সংস্কৃতিকর্মী, শিল্পী নির্যাতিত হয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধারা অকারণে জেলজীবন যাপন করছেন। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকেরা মবের কারণে নাজেহাল এবং চাকরি হারিয়েছেন।

বর্তমানে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে কিছু শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। এই শূন্যতাগুলো মূলত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রয়োজন অনুযায়ী শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘরসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তারা সেই সরকারের নানা অভিপ্রায়কে কার্যকরও করেছিল। বিশেষ করে একুশের বইমেলা নিয়ে যেসব সিদ্ধান্তহীনতা এবং ভুল সিদ্ধান্ত হয়েছে তা একটি প্রকাশনাশিল্পকে ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট। অনেক প্রকাশনাপ্রতিষ্ঠান এরপর দেউলিয়া হয়ে গেছে। কেউ কেউ প্রকাশনাপ্রতিষ্ঠান বিক্রি করে অন্য পেশায় যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিকেও একটা সময় জনশূন্য করা হয়েছিল। টেলিভিশন স্টেশনগুলোতে সৃজনশীল অনুষ্ঠান একেবারেই শূন্যের কোঠায় এসে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমিও বলা যায় একপ্রকার কর্মহীন।

এসব প্রতিষ্ঠান গুরুত্ব বিবেচনায় অতিদ্রুতই কর্মক্ষম করা প্রয়োজন। এ বছরকে নজরুল বর্ষ হিসেবে সরকার ঘোষণা করেছিল। কিন্তু নজরুল বর্ষে নজরুল ইনস্টিটিউটে প্রশাসনিক প্রধান না থাকার কারণে বর্ষটিও বাস্তবায়ন ও সৃজনহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে অতি দ্রুত কার্যকর করে অবশ্যই তাদের কর্মপদ্ধতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি প্রয়োজন।

শীতকাল প্রায় সমাগত। শীতকালেই বাংলাদেশের সর্বত্র সাংস্কৃতিক আয়োজনগুলো শুরু হয়। এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোনো অনুষ্ঠানমালার কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যাচ্ছে না। এই অবসরেই সাংস্কৃতিক দুর্বৃত্তরা নিজেদের মতো করে কিছু সংস্কৃতিবিরোধী কাজে লিপ্ত হতে পারে। তাই অতি দ্রুত এইসব জায়গায় যোগ্য লোকদের নিয়োগ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

এ কথা সত্য যে সংস্কৃতির বিষয়টি সব সময়ই উপেক্ষিত হয়েছে। এই উপেক্ষার কারণে নানা ধরনের ছোটখাটো এবং বিশেষ ক্ষেত্রে বড় সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না পাকিস্তানিদের আমাদের ভাষার ওপর আক্রমণ, রবীন্দ্রনাথের ওপর ষাটের দশকে নিষিদ্ধকরণ এবং সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ থেকেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের জন্ম। তাই বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। সেই বিবেচনা থেকেই রবীন্দ্রনাথের ওপর কালি লেপনকারীদের দেশদ্রোহের মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। সরকারের এই দৃঢ় পদক্ষেপকে আমরা সাধুবাদ জানাই এবং চূড়ান্ত বিচার কামনা করি। প্রশাসন ইতিমধ্যেই বার্তা পেয়ে গেছে যে এইসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যাঁরা জড়িত হবেন, তাঁরা দেশদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন। না হলে দেশদ্রোহীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা রয়ে যাবে।

লেখক: নাট্যব্যক্তিত্ব

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত