Ajker Patrika

শিল্পকারখানার বর্জ্যদূষণ বন্ধ করা দরকার

মৃত্যুঞ্জয় রায় 
আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮: ১২
শিল্পকারখানার বর্জ্যদূষণ বন্ধ করা দরকার
জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি এভাবেই অগ্রাহ্য হয়ে পড়ছে। ছবি: লেখক

কয়েক দিন আগে আগারগাঁও মেট্রো স্টেশন থেকে নেমে ফুটপাত দিয়ে হাঁটছিলাম। পাশেই জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডের প্রাচীর। সে প্রাচীরের দেয়ালে জুলাই বিপ্লবের পর একটি চমৎকার অর্থপূর্ণ ব্যঙ্গচিত্রের গ্রাফিতি চোখে পড়তেই দাঁড়িয়ে পড়লাম। গ্রাফিতিটি এঁকেছে সূর্যোদয় ইয়ুথ সোসাইটি। সে চিত্রে একজন কারখানার মালিক চেয়ারে বসে আছেন, তাঁর এক হাতে একটি জলের গ্লাস (জল), অন্য হাতে একটি ফ্যান (বায়ু)। ছবিটি প্রতীকী হলেও তাতে ফুটে উঠেছে এ দেশের জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে প্রবল অসচেতনতা ও অগ্রাহ্য করার প্রবণতা।

এ নিয়ে যতই সচেতন পরিবেশবিদ, বিজ্ঞানী ও জলবায়ুকর্মীরা কপচাকপচি করুক না কেন, একশ্রেণির মানুষ সে কথা কানে তুলো ভরেই শুনবে। আর জলবায়ুর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে হাওয়ায় তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবে, না হয় জলে গুলে ঢকঢক করে গিলে খাবে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টির গুরুত্ব তাদের কাছে একরত্তি নেই। এগুলোকে কখনো কখনো শ্রেফ ভাঁওতাবাজির মতো মনে করেন অনেক কারখানা মালিকেরাই।

সূর্যোদয় ইয়ুথ সোসাইটির কর্মীদেরও মনে হলো সে রকমই ধারণা, তাই তারাও সে আশঙ্কার কথায় প্রশ্ন টেনেছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে রাষ্ট্র সংস্কার হলেও জলবায়ুর কোনো সংস্কার হবে না। তা না হলে কি এ নিয়ে এত আলোচনা, লেখালেখি ও আইনকানুন তৈরির পরও এ দেশের কারখানাগুলো থেকে বাধাহীনভাবে অপরিশোধিত নানা রকমের বর্জ্য মিশছে নদী-নালায়, জমিতে। সাভার ও ধামরাইয়ের বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি এখন শিল্পবর্জ্যে ডুবতে বসেছে, সেসব জমিতে ভালো ফসল হয় না, মাটির ভেতরের কেঁচোগুলো মরে গেছে। নদ-নদীতে সেসব বর্জ্য মিশে এতটাই দূষিত করে ফেলেছে যে সেসব পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে এসেছে। সম্প্রতি বুয়েটে বুড়িগঙ্গার পানি পরীক্ষা করে সে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা পাওয়া গেছে শূন্য। তার মানে যে পানিতে কোনো অক্সিজেন নেই, সেখানে কোনো জলজ জীবেরও বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নেই। জানি না এ প্রতিবেদন কতটা সত্য। তবে বছরের অনেকটা সময় ধরে বুড়িগঙ্গা নদী পার হতে গেলে নাকে রুমাল চেপে পার হতে হয়, ভোরবেলা বরিশাল থেকে লঞ্চগুলো বুড়িগঙ্গায় ঢুকলেই কেবিনে ঘুমন্ত অবস্থাতেই বুঝতে পারি যে ঢাকায় এসে গেছি!

সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদপত্রে ঢাকা ও তার আশপাশের শিল্পাঞ্চলগুলো থেকে নির্গত বর্জ্যের দূষণে নদীর পানি ও জমির কী রূপ ক্ষতি হচ্ছে, মানুষ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর কী প্রভাব পড়ছে, সেসব নিয়ে অনেক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেসব প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ধামরাইয়ে বিসিক শিল্পনগরীসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত শিল্পকলকারখানার পানি পাশের ডাউটিয়া ও জয়পুরার কৃষিজমিতে গিয়ে পড়ছে। শিল্পনগরীর বিভিন্ন নর্দমা ও নালার পানি পরীক্ষা করে সে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কম পাওয়া গেছে। সিরামিক কারখানাগুলো থেকে বের হওয়া পানিতে ফসফেটের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ও অ্যামোনিয়ামের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত থাকায় তা গাছপালাসহ বিভিন্ন জলজ জীবের, মাটিতে বসবাসকারী জীবের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফসফেট বেশি থাকা মানে কৃষিজমিতে বেশি পরিমাণে শ্যাওলা জন্মানো, যা ফসল উৎপাদনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এসব তথ্য জানা গেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের ও ঢাকার একটি বেসরকারি পরীক্ষাগারের পরীক্ষা থেকে। পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ ২ নিযুতাংশের (পিপিএম) কম থাকা মানে সে পানিতে বিভিন্ন জীবের জন্য প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের পরিমাণ কম থাকা। তুরাগ নদ ও বংশী নদীর পানিতে মেশা ভারী ধাতুগুলো ছড়িয়ে পড়ছে কৃষিজমিতে, মাটিতে ও ফসলে। তা থেকে ঢুকছে মানুষের দেহে।

বিশেষজ্ঞ দল সাভারের আশুলিয়ায় ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে পার্শ্ববর্তী তুরাগ ও সাভার-ধামরাইয়ের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বংশী নদীর ২০টি স্থান থেকে পানির নমুনা পরীক্ষা করে দেখেছে যে সেসব পানিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি সিসা, নিকেল ও ক্যাডমিয়াম রয়েছে। এসব ভারী ধাতু জমিতে মিশছে, সেসব মাটি থেকে ফসল তা শুষে নিচ্ছে। সেসব ফসল খেয়ে ভারী ধাতুর কণা আমাদের দেহে প্রবেশ করছে। জলাভূমির বাস্তুতন্ত্রের জন্যও এ বিষয়টি হুমকিস্বরূপ। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ইতিহাসে বৃহত্তম আর্সেনিক দূষণের দেশ। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। শিল্পবর্জ্য দূষণ যে শুধু পানি ও মাটিকে দূষিত করছে তা না, বায়ুদূষণেরও এটি অন্যতম কারণ।

দূষণ করছে বলে সব শিল্পকারখানা বন্ধ করে দেব, সেটাও সম্ভব নয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ও মানুষের ভোগচাহিদার জন্য শিল্পায়ন একটি প্রয়োজনীয় বিষয়। বাংলাদেশে পোশাক, রাসায়নিক, ওষুধ, চামড়া, সার, সিমেন্ট, সিরামিক, খাদ্যসহ বিভিন্ন শিল্প রয়েছে। শিল্পের প্রবৃদ্ধির হার গড়ে ৬ থেকে ১০ শতাংশ। দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই শিল্পকলকারখানা বাড়ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে দূষণ। যেমন ২০১৫ সালে সাভার ও ধামরাই শিল্পাঞ্চলে শিল্পকারখানা ছিল ১ হাজার ৯৪টি, ২০২৫ সালে তা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৩২টিতে। দ্রুত হারে শিল্পকারখানা বৃদ্ধি পাওয়ায় সেগুলো বহু দূষণকারীর উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে ও প্রাকৃতিক সম্পদ অবক্ষয়ের ওপর চাপ দিচ্ছে।

এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের জন্য সারা বিশ্বে এখন দূষণের উৎসে কাজ করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ এমন একটি বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে শিল্পকারখানার বর্জ্যগুলো বাইরে বের হওয়ার আগেই কারখানাগুলোর ভেতরেই শোধিত হয়ে যায়। এ জন্য প্রতিটি শিল্পকারখানাতেই ইটিপি (ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) স্থাপন ও কার্যকর নিশ্চিত করা দরকার। তুরাগ-বংশী জলাভূমিতে গত তিন বছরে টেক্সটাইল শিল্প বেড়েছে আট গুণ। আইন অনুসারে প্রয়োজনীয় কার্যকরী ইটিপি খুব কমই রয়েছে। ধারণা করা হয়, দেশের প্রায় অর্ধেক শিল্পকারখানায় ইটিপি বা বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা নেই। থাকলেও সেগুলো খুব ভালোভাবে কাজ করে না। তা ছাড়া বিভিন্ন দেশে এখন শিল্পবর্জ্য শোধনের জন্য আরও আধুনিক জৈব ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি উদ্ভাবন করা হয়েছে, প্রয়োগও করা হচ্ছে, যা পরিবেশবান্ধব কৌশল। বাংলাদেশেও এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন জৈবিক শোধনব্যবস্থা প্রয়োগ করার সুযোগ রয়েছে, যেমন মাটি, পানি, জলস্রোত, কাদা ইত্যাদি থেকে সাইট দূষণগুলোকে নির্মূল করা বা পরিষ্কার করা। বর্তমানে জৈবিক শোধনব্যবস্থা বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা লাভ করছে। জৈবিক শোধন হলো একটি কার্যকর ও লাভজনক পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা টুল বা কৌশল, যা পরিবেশের কোনো ক্ষতি না করে বা অতিরিক্ত অবনতি না ঘটিয়ে দূষণ সৃষ্টিকর স্থানে বিপজ্জনক বর্জ্যের ঘনত্ব ও কার্যকারিতা কমানোর জন্য অণুজীব ব্যবহার করা হয়। এতে ইটিপি পরিচালন ব্যয়ও সাশ্রয় হতে পারে। এ বিষয়ে অভিজ্ঞজনদের সঙ্গে পরামর্শ করা যেতে পারে।

শিল্পকারখানার এসব দূষণ থেকে পরিবেশ, প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য কেবল আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়। এ পরিস্থিতির উন্নয়নের জন্য জাতীয় ও স্থানীয় উভয় স্তরেই পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন। এ-সংক্রান্ত নিরাপত্তা সতর্কতা বিষয়ক আইনসমূহ কঠোরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিল্পকারখানা থেকে নির্গত দূষিত পানির উৎসে বিষাক্ত রাসায়নিক ও দূষণকারী পদার্থগুলো গোড়াতেই শোধনের ব্যবস্থা নিতে হবে। বেশির ভাগ ডাইং ইন্ডাস্ট্রি সাধারণত তা করে না। তাদের অবহেলায় রংমিশ্রিত রাসায়নিক পানি অহরহ মিশছে কারখানা থেকে ড্রেনে, ড্রেন থেকে নালায়, নালা থেকে খালে ও পার্শ্ববর্তী কৃষিজমিতে। এগুলোর শেষ আধার বা সিংক হলো সাগর। এসব দূষণপ্রবাহ বন্ধ করতে হবে, দূষণকারীকেই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে আগে ব্যবস্থা নিতে হবে। নিয়মিত এসব কাজের তদারকি ও সঠিক তথ্য ব্যবস্থাপনাও জরুরি। এ বিষয়ে প্রযুক্তির সঙ্গে দরকার প্রতিশ্রুতি ও দক্ষতা। পরিবেশ অধিদপ্তর আশা করি এগুলো ভেবে দেখবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত