Ajker Patrika

আসুন, উল্টো করে ভাবতে শিখি

রাজিউল হাসান
আসুন, উল্টো করে ভাবতে শিখি

ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই করে নিয়েছে ২০২৫ সাল। আকাশ আলোকিত করে হাসছে ২০২৬ সালের প্রথম সূর্যটা। প্রতিবছর এমন ক্ষণে আমরা নতুন বছরের প্রত্যাশার কথা নানাভাবে প্রকাশ করি—কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বেছে নিই, আবার কেউ কাছের মানুষকে জানাই।

সব প্রত্যাশা যদি আমরা একসঙ্গে সারিবদ্ধ করে সাজাতে পারতাম, তাহলে আমার মনে হয়, সেগুলোকে দুটি ভাগে ভাগ করা যেত—সংকট থেকে উত্তরণ এবং ব্যক্তিগত অর্জন। এর বাইরে মানুষের আসলে প্রত্যাশার কিছু নেই। কারণ, একটু গভীরভাবে ভাবলে দেখা যায়, আমরা সবাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক। আর এ কারণেই আমাদের আসলে উল্টো করে ভাবতে শেখা দরকার।

লেখার শুরুতে কিছু তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করতে চাই। তাহলে ২০২৫ সালটা মানবজাতি সামগ্রিকভাবে কেমন কাটিয়েছে, তার একটা সম্যক ধারণা পাওয়া যাবে। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস (আইইপি) প্রকাশিত ২০২৫ সালের বৈশ্বিক শান্তিসূচক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে ২০২৫ সালে ৫৯টি রাষ্ট্রভিত্তিক সংঘাত চলেছে, যা এখনো চলমান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সংঘাতের এই সংখ্যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সংঘাতের সংখ্যা তিনটি বেড়েছে। শুধু তা-ই নয়, সংঘাতগুলো ক্রমেই আন্তর্জাতিক হয়ে উঠছে। ফলে এগুলোর সমাধান কঠিন হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালে ৭৫টি দেশ তার সীমান্তের বাইরে সংঘাতে ছিল।

আইইপি সম্ভবত সংঘাত কিছুটা কম করে দেখিয়েছে। কারণ, আন্তর্জাতিক কমিটি অব দ্য রেডক্রসের তথ্য বলছে, বিশ্বজুড়ে এখন ১৩০টির বেশি সশস্ত্র সংঘাত চলছে। এগুলো দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি সমাধানও জটিল হয়ে উঠছে দিনে দিনে। এসব সংঘাতের মধ্যে ২০২৫ সালজুড়ে সবচেয়ে আলোচিত ছিল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজায় ইসরায়েলের ধ্বংসযজ্ঞ। বছরের শেষ দিকে এসে থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়াও সংঘাতে জড়িয়েছে। এগুলো তো গেল বড় বড় সংঘাতের কথা। আমরা যদি এগুলোর সঙ্গে গৃহযুদ্ধ, রাজনৈতিক সংঘাত, সামাজিক বিশৃঙ্খলা, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব যোগ করি, তাহলে সংখ্যাটা সম্ভবত চোখ কপালে তুলে দেওয়ার মতো হবে। কিন্তু মানুষকে যদি আমরা সামগ্রিকভাবে একটা জাতি হিসেবে মনে করি, তাহলে আসুন নিজের কাছেই প্রশ্ন করি—এত এত সংঘাত নিয়ে কি একটা জাতি টিকতে পারে? আসলে আমরা দিনে দিনে নিজেরাই নিজেদের ধ্বংসের কিনারে নিয়ে যাচ্ছি।

মানুষ প্রাণী প্রজাতির অন্য সদস্যদের থেকে নিজেকে আলাদা করতে নিজের নাম রেখেছে হোমো স্যাপিয়েন্স। যার অর্থ ‘জ্ঞানী মানুষ’। এই নামকরণের লাখো-কোটি বছর আগের কথা যদি ভাবি, তাহলে আমরা প্রকৃতিতে আর দশটা প্রাণীর মতোই সাধারণ একটি প্রাণী প্রজাতি ছিলাম। এই মানুষেরও প্রজাতি ছিল কয়েকটি। বিজ্ঞানী ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার কল্যাণে এখন আমরা জানি, নিয়ান্ডারথাল, ডেনিসোভান, ইরেকটাসের মতো মানুষের আরও কিছু ভ্রাতৃ প্রজাতি ছিল। তবে মস্তিষ্কের সক্ষমতায় তারা আমাদের চেয়ে পিছিয়ে ছিল। আর এ কারণেই হোমো স্যাপিয়েন্সের সঙ্গে পেরে উঠতে পারেনি তারা। বিলুপ্ত হয়ে গেছে পৃথিবীর বুক থেকে।

বিজ্ঞানের নানা গবেষণা নিবন্ধের তথ্য বলছে, হোমো স্যাপিয়েন্স, তথা আধুনিক মানুষ শুধু অন্য মানব প্রজাতিগুলোর তুলনায় জ্ঞানীই ছিল না, নিষ্ঠুরও ছিল। আর এ কারণেই আফ্রিকার গণ্ডি পেরিয়ে হোমো স্যাপিয়েন্স যেখানেই গেছে, তার কয়েক হাজার বছরের মধ্যে সেখানকার স্থানীয় মানব প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অতএব, আমরা উপসংহার টানতেই পারি—আমরা যতই উদার মনোভাবের ভান ধরি না কেন, আমাদের ভেতরে, আমাদের রক্তে নিষ্ঠুরতা মিশে আছে। তাহলে এমন মৌলিক বৈশিষ্ট্যকে কীভাবে আমরা পাল্টাতে পারি? তার একমাত্র সমাধান হতে পারে—আজ এখন থেকেই উল্টো করে ভাবার অনুশীলন।

চাইলে মানুষ যেকোনো অসাধ্য সাধন করতে পারে। সে তুলনায় উল্টো করে ভাবার মানসিকতা তৈরি কোনো ব্যাপারই না। প্রকৃতিতে জাদুকরি একটি সংখ্যা আছে—১৫০। প্রাণিজগতের যেসব প্রজাতি দলবদ্ধ কিংবা সমাজবদ্ধ হয়ে জীবনধারণ করে, তাদের কেউই একটি দলে ১৫০ জনের বেশি থাকতে পারে না। কারণ, গণনাজনিত জটিলতার কারণে মস্তিষ্ক এর বেশিসংখ্যক সদস্যকে মনে রাখতে পারে না। পারস্পরিক যোগাযোগও চরম জটিলতায় পৌঁছায়। এ কারণেই দলবদ্ধভাবে থাকা প্রাণী প্রজাতিগুলো যেমন শিম্পাঞ্জি, বানর, এমনকি মানুষের ভ্রাতৃপ্রতিম প্রজাতিগুলোও ছোট ছোট দলে থাকত। কিন্তু আধুনিক মানুষ সে গণ্ডি বহু আগেই পেরিয়ে গেছে শুধু ভাষার দক্ষতার কারণে। ভাষা দিয়ে মানুষ নিজেদের মধ্যে অবস্থানের স্তর সৃষ্টি করেছে, ফলে লাখো সদস্যের সেনাবাহিনী সুশৃঙ্খলভাবে চলছে, হাজারো কর্মীর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দারুণভাবে কাজ করছে, কোটি মানুষের রাষ্ট্র সুন্দরভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এই যে ১৫০ সংখ্যার গণ্ডি ভাঙা, এটা আধুনিক মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন। এর বাইরে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অর্জনগুলোর কথা যদি বলি, তাহলে অসাধ্য সাধনের লাখো উদাহরণ দেওয়া যাবে। একসময় খরস্রোতা নদী পার হতে না পারা মানুষ এখন অবলীলায় মহাশূন্যে পাড়ি জমাচ্ছে। শত বছর আগে এটাও তো অসম্ভব ছিল। কাজেই মানুষের অসাধ্য কিছু নেই।

এবার আসা যাক, উল্টো করে ভাবার বিষয়ে। এই যে আমরা ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনাগুলো করি, সেখানে বিশেষ্যের জায়গায় আমরা নিজেদের রাখি। ঠিক ওই জায়গাটায় রাখতে হবে বিপরীত পক্ষকে। একটি পরিবারের দুই ভাইয়ের উদাহরণ দেওয়া যাক। এক ভাইয়ের নাম ‘ক’। আরেক ভাইয়ের নাম ‘খ’। দুই ভাইয়ের মধ্যে খাবার নিয়ে দ্বন্দ্ব। দুজনেই চায়, নিজের পাতে খাবারটা বেশি পড়ুক। কিন্তু দুজনেই যদি বিপরীত পক্ষের পাতটা নিজেরটার চেয়ে বেশি ভরে দিতে চাইত, তাহলে কিন্তু এই দ্বন্দ্ব থাকত না।

উল্টো করে ভাবার ধারণা ঠিক এটাই। আমরা নিজেকে অন্যের জায়গায় বসাব, তার অসুবিধা অনুধাবনের চেষ্টা করব। তাহলেই দেখব, মনের ভেতর জমা পড়া অনেক ক্ষোভ, হিংসা-বিদ্বেষ, দ্বন্দ্ব অবলীলায় উবে যাবে। প্রশ্ন উঠতে পারে, ব্যক্তিপর্যায়ে উল্টো করে ভাবলেই কি দ্বন্দ্ব-সংঘাতের নিরসন হবে? একটি দাবানলের জন্য একটি স্ফুলিঙ্গই যেমন যথেষ্ট, একইভাবে দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিরসনেও ব্যক্তিপর্যায়ে উল্টো করে ভাবাই যথেষ্ট। দ্বন্দ্বে লিপ্ত দুটি রাষ্ট্রের জনসাধারণ যদি সংঘাতের অবসান চায়, তাহলে কোনো সরকারের পক্ষে সংঘাত চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। একইভাবে কোনো রাষ্ট্রের সব মানুষ যদি গণতন্ত্রের সঠিক চর্চা চায়, তাহলে রাজনৈতিক দলগুলো কিংবা ক্ষমতাসীনদের পক্ষে গণতন্ত্রকে ভূলুণ্ঠিত করা সম্ভব নয়।

কাজেই, নতুন বছরে আমাদের প্রতিশ্রুতি হোক, আমরা উল্টো করে ভাবব। নিজেকে অন্যের জায়গায় বসিয়ে তার সমস্যা অনুধাবনের চেষ্টা করব। সবাইকে খ্রিষ্টীয় নববর্ষের শুভেচ্ছা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত