Ajker Patrika

ক্ষমতার দৌরাত্ম্যের বাস্তবতা

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
ক্ষমতার দৌরাত্ম্যের বাস্তবতা

সমাজ-বাস্তবতার প্রধান দিকগুলোর একটি হচ্ছে লুণ্ঠন। যারা ধনী হয়েছে, তারা প্রায় সবাই লুটপাটের সঙ্গে জড়িত এবং ওই কাজে দক্ষ। বৈধ লুটপাটেরও ব্যবস্থা আছে। সিন্ডিকেট রয়েছে। থাকবেও। সরকার পতনের পর এখানে-সেখানে লুটপাটের নানা মাত্রায় ঘটনা ঘটেছে। গণভবন থেকে যেভাবে জিনিসপত্র লুণ্ঠন করা হয়েছে, তাকে তো মনে হয়েছে, রীতিমতো একটি উৎসব। প্রকৃত বিপ্লবকে বলা হয় শোষিত মানুষের উৎসব।

কিন্তু সেটা তো লুণ্ঠনের নয়, সৃষ্টির। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে অবশ্য একই কাজ করেছেন সরকারের সংশ্লিষ্ট অনেকে। তাঁদের লুণ্ঠনও ছিল অনেক ব্যাপক, সুশৃঙ্খল ও গুপ্ত। কিন্তু লুণ্ঠন যে কোনো অপরাধ নয়, বরং গর্ব ও গৌরবের বিষয়, এই শিক্ষাটা তাঁরাই রেখে গেছেন শাসিত মানুষের জন্য।

ওই শিক্ষায় শিক্ষিত, বলা যায় ওই ধর্মে দীক্ষিত মানুষেরা সুযোগ পেলেই লুটপাট করে। হাত নিশপিশ করতে থাকে। ধরা যাক, নারায়ণগঞ্জের গাজী টায়ার্সে লুণ্ঠনের ঘটনা। গাজী টায়ারের মালিক মন্ত্রী ছিলেন; ভূমি জবরদখলের অভিযোগ নিশ্চয় আছে, কিন্তু তবু কয়েকটি শিল্পকারখানাও গড়েছিলেন, কর্মসংস্থান করেছিলেন কিছু মানুষের। চব্বিশের ৫ আগস্ট সরকারের পতন ঘটেছে শুনে কারখানায় প্রথম দফা লুটপাট ঘটে। পরে কারখানার মালিক গ্রেপ্তার হয়েছেন শুনে মানুষ আর বাধা মানেনি। বন্যার স্রোতের মতো কারখানার ভবনগুলোতে ঢুকে পড়েছে। যে যা পেয়েছে লুণ্ঠন করেছে। ভ্যান গাড়ি, রিকশা—যা পাওয়া যায় ব্যবহার করেছে।

এর মধ্যে একদল আবার মূল ভবনের নিচতলায় আগুন ধরিয়ে দেয়। কারণ, হতে পারে লুটপাটের ব্যাপারে তাদের নিজেদের কাজ ততক্ষণে শেষ হয়েছে, এখন অন্যরা যেন তাদের কাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়, তার ব্যবস্থা করা চাই। কারখানা ছিল দাহ্য পদার্থে ঠাসা। আগুন অতিদ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ছয়তলা ভবনটির সর্বত্র। ভেতরের আটকে পড়া লোকেরা অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়ে গেছে। তবে পুলিশের সাহায্য চেয়েও পাওয়া যায়নি। ফায়ার সার্ভিস এসে পৌঁছেছে পৌনে তিন ঘণ্টা পর। আগুন নিয়ন্ত্রণে সময় লেগেছে ২১ ঘণ্টা। তারপরেও ভেতরে ঢুকতে সাহস করেননি ফায়ার সার্ভিসের লোকেরা। কারণ, দগ্ধ হয়ে ভবনটি তপ্ত ও নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল। এতে মৃত্যু ঘটেছে কমপক্ষে ১৭৫ জনের।

লক্ষ করার বিষয় এটাও যে লুটপাটকারীদের ভেতর ওই কারখানার কোনো শ্রমিক ছিলেন না। শ্রমিক যতই শোষিত হন, তাঁর কর্মস্থল যে কারখানা, সেটাতে লুটপাট চালান না, আগুন দেন না; কারণ, তাতে তাঁর জীবিকার উৎসের বিপদ ঘটবে। গাজী টায়ার্সের লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগের কাজটা বহিরাগতরাই করেছে, যারা অন্যত্র নিজের শ্রম বিক্রয় করে জীবিকা সংগ্রহ করে, কিন্তু লুটপাটের সুযোগ পেলে কোনো দ্বিধা করে না, ঝাঁপিয়ে পড়ে, প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দেয়, যেমনটা গাজী টায়ার্সে ঘটেছে।

সবটা মিলিয়ে অখণ্ড এবং নির্মম এক বাস্তবতা। ওই একই বাস্তবতার ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ আমাদের সহ্য করতে হয়। মানুষ অভাবে আছে, শ্রমে তাদের অনীহা নেই, কিন্তু লুণ্ঠন করে যদি অনুপার্জিত সম্পত্তি পাওয়া যায়, তাহলে সেটা নিতে তারা সদা প্রস্তুত; সে সম্পত্তি যতই সামান্য হোক না কেন। ব্যক্তিগত সম্পত্তি বৃদ্ধির কথা ছাড়া অন্য কিছুর কথা ভাবা প্রায় অসম্ভব, তা মালিক অঢেল পরিমাণে বিত্ত সংগ্রহ করে থাকুক; কি একেবারেই নিঃস্ব হোক।

বিগত সরকারকে জনগণের মিত্র বলে কখনোই মনে হয়নি। একটি অরাজনৈতিক সাম্রাজ্যবাদের মদদপুষ্ট সরকারের পক্ষে সেটা হওয়া সম্ভবও নয়। তবে শাসন দেখে এমন ধারণা তৈরি হয়েছিল যে তারা বদলা নিচ্ছে। এ জন্যই যেন সরকার মব-ভায়োলেন্সকারী, পুলিশ তো বটেই, অন্য বাহিনীগুলোকেও ব্যবহার করেছিল। সরকারের শাসনের বিরুদ্ধে যাঁরা দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের বসিয়ে দিতে, প্রয়োজনে কারাগারে পাঠাতেও কোনো বিলম্ব করেনি।

হিংসা হিংসার জন্ম দেয়। ছাত্র-জন-অভ্যুত্থানের ক্ষেত্রেও সেই ঘটনা দেখা গেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মামলা দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মহোৎসব চলেছে; পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করার বেলাতেও একই ব্যগ্রতা এবং ব্যস্ততা মূর্ত হয়ে উঠেছে।

প্রতিহিংসাপরায়ণতা শিক্ষাঙ্গনেও দেখা দিয়েছে। শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করে পদত্যাগপত্র লিখিয়ে নেওয়ার ঘটনা নেহাত কম ঘটেনি। দলবাজ ও দুর্নীতিবাজ বলে অভিযুক্ত হয়ে শিক্ষকেরা শুধু যে পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন, তা কেবল নয়, লাঞ্ছিতও হয়েছেন। নারী শিক্ষকেরাও অপমানের শিকার হয়েছেন। এসবের পেছনে শুধু যে রাজনীতি আছে তা নয়, কোথাও কোথাও ব্যক্তিগত শত্রুতাও কাজ করছে। কোনো শিক্ষক যদি দলবাজি বা দুর্নীতি করে থাকেন, হতে পারে অভ্যুত্থানের বিরোধিতাও করেছেন কেউ কেউ, তবে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করার বৈধ পথ-পদ্ধতি রয়েছে; শিক্ষার্থীরা যদি সে পথে না গিয়ে সহিংস পথ ধরে, তাহলে তো তারা আর শিক্ষার্থী থাকে না, ভিন্ন কিছুতে পরিণত হয়। বাস্তবে হয়েছিলও তা-ই। অপরদিকে একজন শিক্ষক যদি তাঁর নিজের শিক্ষার্থীদের দ্বারাই লাঞ্ছিত-অপমানিতই হন, তবে তাঁর জ্ঞান-বুদ্ধি যতই থাকুক না কেন, তিনি তো আর শিক্ষক থাকেন না, একেবারেই সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন। শিক্ষকেরা শুধু পদমর্যাদার কারণেই শিক্ষক হন না, এমনকি শুধু নিজেদের জ্ঞানগরিমার জন্যও নয়; শিক্ষককে শিক্ষক হতে হলে প্রয়োজন হয় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সম্মান প্রাপ্তির বিষয়টিও। তাহলে ওই সম্মানের ভেতর শ্রদ্ধাবোধও থাকে।

একজন শিক্ষককে আক্রমণ করাটা শুধু ব্যক্তিকে লাঞ্ছিত করা নয়, গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকেই আক্রমণ করা। শিক্ষার মান প্রধানত নির্ভর করে শিক্ষকতার মানের ওপর, শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক যদি অনিরাপদ থাকেন, তাহলে মেধাবানেরা তো শিক্ষক হতে চাইবেন না। শিক্ষকেরা এমনিতেই অন্য পেশাজীবীদের তুলনায় বঞ্চিত, তদুপরি শ্রদ্ধা জিনিসটা যদি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, তাহলে শিক্ষকতার এখন যে আকর্ষণটুকু আছে, সেটুকুও অবশিষ্ট থাকবে না। আরও একটা ব্যাপার লক্ষ করার মতো। শিক্ষক-লাঞ্ছনা কিন্তু কওমি মাদ্রাসা এবং ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে ঘটেনি। ঘটছে শুধু মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থায়। ওই ধারা আসলে বিভিন্নভাবে বিপদগ্রস্ত। সেখানে ক্যারিকুলাম, সিলেবাস, পাঠ্যপুস্তক ইত্যাদি নিয়ে বহু রকমের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে যেগুলোর অধিকাংশই কোনো সুফল বয়ে আনে না; অনেক ক্ষেত্রে বিপরীত ফলই পাওয়া যায়।

রাষ্ট্র-শাসকেরা এ নিয়ে তেমন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত নন; কারণ, তাঁদের সন্তানেরা মূলধারায় পড়তে আসে না, ইংরেজি মাধ্যমই তাদের স্থির ও নিজস্ব ঠিকানা; আরেকটি ঠিকানাও ভেতরে ভেতরে থাকে, সেটা স্বদেশি নয়, বিদেশি বটে। আমরা অনেককাল ধরে ঔপনিবেশিক শাসনাধীনে ছিলাম, বঞ্চিত ছিলাম ক্ষমতা থেকে; তাই ক্ষমতা পেলেই আত্মহারা হয়ে পড়ি। অপব্যবহার শুরু করি ক্ষমতার। তা ছাড়া ক্ষমতার নিজস্ব একটা স্বভাবও আছে। সেটা হলো প্রযুক্ত হওয়া। ক্ষমতা যদি প্রদর্শিত হতেই ব্যর্থ হলো, তাহলে সে আবার ক্ষমতা কিসের? কোন জোরে? একবার রক্তের স্বাদ পেয়েছে যে বাঘ, সে কি ওই স্বাদ ভুলতে পারে? শিক্ষাঙ্গনে ক্ষমতা প্রদর্শনের সঙ্গে আমাদের ক্ষমতা-বঞ্চনা এবং ক্ষমতার স্বভাব—দুটোই জড়িত রয়েছে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ইমেরিটাস অধ্যাপক,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

জামায়াতের মঞ্চে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি

এবার ইরান ছুড়ছে ১ টনের মিসাইল, বদলে গেল যুদ্ধক্ষেত্র

গাজীপুরের কারখানায় নিয়োগ দেবে এপেক্স, আবেদন শুরু

জুলাই সনদ আদেশ ম্যাসকুলিন না ফেমিনিন জেন্ডার, আমি জানি না: সালাহউদ্দিন

ইরান থেকে ট্রাম্পকে বেরিয়ে আসতে পরামর্শ দিচ্ছেন উপদেষ্টারা

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত