Ajker Patrika

মেগা প্রকল্প পরিত্যাগ নয়, প্রয়োজন দুর্নীতিমুক্তকরণ

আবু তাহের খান 
আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮: ৩৫
মেগা প্রকল্প পরিত্যাগ নয়, প্রয়োজন দুর্নীতিমুক্তকরণ

সম্প্রতি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘বিএনপির অন্যতম লক্ষ্য, দলটি মেগা প্রকল্পে যাবে না।...মেগা প্রকল্প মানেই মেগা দুর্নীতি।’ তারেক রহমানের এ বক্তব্যকে বিএনপির নেতা-কর্মীরা হাততালি দিয়ে স্বাগত জানালেও ধারণাগতভাবে তো বটেই, বাস্তব প্রয়োজনের নিরিখেও চিন্তাটি সঠিক নয়। কারণ, অর্থনীতির বহুমাত্রিক ও উঁচুমাত্রার উন্নয়ন ঘটাতে হলে বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মেগা প্রকল্পের কোনো বিকল্প নেই।

দেড় দশকের বেশি সময় স্থায়ীভাবে বিদেশে কাটানোর পাশাপাশি এ সময়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত থাকার সুবাদে বিএনপিপ্রধানের এটি মোটেও অজানা থাকার কথা নয়। তারপরও যে তিনি এমনটি বললেন, তার কারণ সম্ভবত বিগত সরকারের আমলে বাস্তবায়িত বিভিন্ন মেগা প্রকল্প নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনা চালু থাকা। বস্তুত ওই সব সমালোচনা নিজ দলের পক্ষে কাজে লাগানোর জন্যই হয়তো জনপ্রিয়তা অর্জনের কৌশল হিসেবে তিনি এমনটি বলেছেন। মেগা প্রকল্প কেন দরকার, সেসব নিয়ে খানিকটা আলোকপাত করা হলো।

প্রথম কথা হচ্ছে, বিজ্ঞান ও প্রাযুক্তিক উদ্ভাবনার ব্যাপক উৎকর্ষের এই যুগে বৈশ্বিক উন্নয়নধারার সঙ্গে সংগতি রেখে নিজ দেশকে এগিয়ে নিতে হলে এবং অমর্যাদাকর একচ্ছত্র ভোক্তা পরিচয় গুছিয়ে নিজেদের উৎপাদক রাষ্ট্রের কাতারে যুক্ত করতে চাইলে মেগা প্রকল্প নিতেই হবে। অর্থাৎ মেগা প্রকল্প গ্রহণ কোনো দোষণীয় ধারণা নয়; বরং তা গ্রহণ না করা কিংবা করতে না চাওয়াটাই অধিক দোষণীয়। উন্নয়ন ও অর্থনীতিবিষয়ক পেশাজীবীমাত্রই স্বীকার করবেন, কোনো দেশের কৃষি, শিল্প, জ্বালানি, অবকাঠামো ইত্যাদির মতো মৌলিক অর্থনৈতিক খাতগুলো কখনোই বড় বিনিয়োগ তথা মেগা প্রকল্প ছাড়া বৃহৎ পরিসরে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।

পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের যেসব দেশ ইতিমধ্যে বড় মাপের অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে উঠতে পেরেছে, সবাই বিভিন্ন ধরনের মেগা প্রকল্পের ওপর ভর করেই তা করেছে। অতএব সে ধরনের অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে হলে বাংলাদেশকেও সে পথেই এগোতে হবে, ছোট মাপের খুদে প্রকল্প দিয়ে যা কখনোই সম্ভব নয়। খুদে প্রকল্প অবশ্যই থাকবে। তবে তা থাকবে মেগা প্রকল্পের সম্পূরক হিসেবে। আর মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সেখানে যদি দুর্নীতি ও অনিয়মের সংশ্লেষ ঘটে, তাহলে সেই দোষ মেগা প্রকল্পের নয়, তার জন্য দায়ী এর গ্রহণকারী ও বাস্তবায়নকারীরা। ফলে মাথাব্যথার কারণে মাথা কেটে ফেলা কোনো যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নয়।

উল্লিখিত মেগা প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে প্রকৃত প্রয়োজনের নিরিখে, চুলচেরা বিশ্লেষণের ভিত্তিতে, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় পরিহার করে এবং সর্বোপরি বৃহত্তর জনগণের কল্যাণ ও স্বার্থে। আর সেভাবে এগোতে পারলে মেগা প্রকল্পই বরং হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশে উন্নয়নের সবচেয়ে লাগসই কৌশল এবং সেরূপ পরিস্থিতিতে আরও বেশি সংখ্যায় মেগা প্রকল্প গ্রহণের ঘোষণাই রাজনীতিবিদদের কাছেও অধিক জনপ্রিয় অঙ্গীকার হয়ে দেখা দিতে পারে। তবে প্রসঙ্গত বলে রাখা প্রয়োজন, মেগা প্রকল্পকে দুর্নীতির বাইরে রাখতে চাইলে একদিকে এর গ্রহণের প্রক্রিয়াকে যেমন স্বচ্ছ ও যুক্তিনির্ভর হতে হবে, অন্যদিকে এগুলোর বাস্তবায়ন পর্যায়ে থাকতে হবে কঠোর

ও স্বাধীন পরিধারণব্যবস্থা। আর তা থাকা শুধু তখনই সম্ভব, যখন দেশে একটি পরিপূর্ণ জনপ্রতিনিধিত্বশীল ও জবাবদিহিপূর্ণ সরকার ক্ষমতায় থাকবে। আর তাই হওয়া উচিত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ কী ধরনের মেগা প্রকল্পের

দিকে ঝুঁকবে কিংবা তার ঝোঁকা উচিত? বিন্দুমাত্র দ্বিরুক্তি না করে বলা যায়, এ ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে করণীয় হবে দেশে একটি গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে যা যা করণীয়, সবটুকু একটি স্বল্পতম সময়সীমার মধ্যে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি সমন্বিত মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা। আর প্রস্তাবিত মেগা প্রকল্পের আওতায় যে বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—

এক. প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার সব স্তরে বিজ্ঞানশিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান এবং সেই লক্ষ্যে ওই সব প্রতিষ্ঠানে নতুন বিজ্ঞান গবেষণাগার স্থাপন এবং স্থাপিত গবেষণাগারের জন্য নিয়মিত ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি ও রাসায়নিক সরবরাহ করা। একই ধারাবাহিকতায় শিক্ষার সব স্তরে মেধাবী শিক্ষক নিয়োগদানের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে এবং তাঁদের জন্য বিষয়ভিত্তিক উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে এবং এদের মধ্যকার একটি বড় অংশের জন্য বিদেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের অতি সীমিতসংখ্যক শিক্ষকই শুধু প্রতিবছর বিভিন্ন সেমিনার, কর্মশালা ও প্রশিক্ষণে যোগদানের জন্য বিদেশে যাওয়ার সুযোগ পান। তবে সেগুলোও আবার খুবই এলোমেলো ও বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি, যেসবের মাধ্যমে শিক্ষকদের একধরনের বিদেশ পরিচিতি ঘটলেও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাদানসংক্রান্ত দক্ষতার উন্নতি ঘটে খুবই সামান্য। এমন প্রেক্ষাপটে সরকারের উচিত প্রস্তাবিত মেগা প্রকল্পের আওতাধীন বরাদ্দ দিয়ে তাদের জন্য বিদেশের সুনির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে নিজেদের চাহিদানুগ সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। তদুপরি স্থানীয় শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিগুলোর গুণগত মানেরও ব্যাপক উন্নতি ঘটাতে হবে।

দুই. সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে বৈদেশিক সহায়তাপুষ্ট ভূরি ভূরি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। কিন্তু এসবের আওতাধীন বরাদ্দের একটি বড় অংশই ব্যয় হয়েছে ও হচ্ছে বিলাসী যানবাহন এবং অপ্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি ক্রয়, বিদেশ ভ্রমণ, পরামর্শসেবা গ্রহণ ইত্যাদির পেছনে। কিন্তু সাধারণ জনগণের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন ও সহজলভ্যতা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে এ খাতে প্রায় তেমন কিছুই হচ্ছে না। আর এসব প্রকল্পে দুর্নীতি এত বেশি হচ্ছে যে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) জরিপ অনুযায়ী এ দেশের সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত খাতগুলোর তালিকায় প্রথম সারিতে রয়েছে স্বাস্থ্য খাতের নাম। অতএব প্রস্তাবিত মেগা প্রকল্পকে উল্লিখিত এসব ত্রুটি-বিচ্যুতি, দুর্নীতি এবং অনিয়ম থেকে মুক্ত থাকতে হবে।

তিন. দেশের জ্বালানি খাতের বৃহত্তর স্বার্থে এর স্থলভাগে ও বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের নিজস্ব এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান এবং উত্তোলন করার জন্য অবিলম্বে একাধিক মেগা প্রকল্প নেওয়া আবশ্যক। অতীতে বিভিন্ন সরকারের আমলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে এ ধরনের প্রকল্প নেওয়া থেকে বিরত থেকেছে বলে অভিযোগ। আশা করব, ভবিষ্যতের সরকারগুলো একই অন্যায়মূলক আচরণের পুনরাবৃত্তি থেকে বিরত থাকবে।

চার. সিঙ্গাপুর যেমন জ্বালানি তেলের উৎপাদক না হয়েও অন্যতম জ্বালানি তেল রপ্তানিকারক দেশ, বাংলাদেশের পক্ষেও তা হওয়ার সমূহ সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, ১৯৬৩ সালে স্থাপিত (উৎপাদন শুরু ১৯৬৬ সালে) দেশের একমাত্র তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির বয়স ইতিমধ্যে ৬২ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো দেশে দ্বিতীয় কোনো জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার গড়ে ওঠেনি। ফলে উৎপাদন খাত তথা দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হলে জ্বালানি তেল পরিশোধনের জন্য একাধিক মেগা প্রকল্প গ্রহণ করাটাই হওয়া উচিত এ মুহূর্তের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ ধরনের পরিশোধনাগার বেসরকারি খাতেও হওয়া উচিত বলে মনে করি।

পাঁচ. কৃষি ও মৎস্য উন্নয়ন, বন ও জলাভূমি সংরক্ষণ, গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও পল্লি অবকাঠামো উন্নয়ন—এসব বিষয় একসঙ্গে বিবেচনায় রেখে এ ক্ষেত্রে একটি সমন্বিত মেগা প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে। তবে এ সমন্বিত প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ সুফল পেতে হলে একই সঙ্গে সেখানকার স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকেও (ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ) শক্তিশালী ও স্বনির্ভররূপে গড়ে তুলতে হবে এবং প্রয়োজনে একটি স্বতন্ত্র মেগা প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে।

উক্ত ক্ষেত্রগুলোর বাইরেও উন্নয়ন ও অর্থনীতির বৃহত্তর স্বার্থে দেশে আরও বহুসংখ্যক মেগা প্রকল্পের প্রয়োজন রয়েছে। তবে সেসব প্রকল্প শুধু আঁচ-অনুমানের ভিত্তিতে কিংবা শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত আগ্রহ কিংবা পছন্দ অনুযায়ী বাছাই করলেই হবে না কিংবা তা উন্নয়ন সহযোগীদের ঢালাও পরামর্শের ভিত্তিতেও নয়। বরং সেটি করতে হবে যথাযথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পাদন, উপযুক্ত যাচাই-বাছাই ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা পদ্ধতি অনুসরণ এবং স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও নির্মোহ দৃষ্টিকোণ থেকে। আর কাজগুলো চিহ্নিত করা গেলেও প্রদত্ত পরামর্শ মেনে সেগুলোর বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটুকু উদ্যোগী হবে, সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। অন্তত গত ৫৫ বছরে বাংলাদেশের রাজনীতিক, সামরিক প্রশাসক এবং আমলারা তা করতে পারেননি। এ অবস্থায় সামনের দিনগুলোতে রাষ্ট্র পরিচালনার সম্ভাব্য ব্যক্তিরা তা কতটুকু করতে পারবেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত