Ajker Patrika

কৃষকদের আত্মনির্ভরশীল ও সচ্ছল করতেই কৃষক কার্ড: প্রধানমন্ত্রী

বাসস, ঢাকা  
আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১৯: ৫৪
কৃষকদের আত্মনির্ভরশীল ও সচ্ছল করতেই কৃষক কার্ড: প্রধানমন্ত্রী
টাঙ্গাইলে শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে কৃষক কার্ড কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: বাসস

প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, দেশের কৃষকদের আত্মনির্ভরশীল ও সচ্ছল করতেই সরকার কৃষক কার্ড চালু করেছে। তিনি বলেন, ‘বর্তমান নির্বাচিত সরকারের লক্ষ্যই হচ্ছে কৃষককে আত্মনির্ভরশীল ও সচ্ছল হিসেবে গড়ে তোলা। সে জন্যই এই কৃষক কার্ড আমরা দিয়েছি।’ এ সময় প্রধানমন্ত্রী জানান, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সরকার পর্যায়ক্রমে ২ কোটি ৭৫ লাখ কৃষকের হাতে কৃষক কার্ড পৌঁছে দেবে।

আজ মঙ্গলবার দুপুরে টাঙ্গাইলে শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে কৃষক কার্ড কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। দেশের ১১টি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে ১৫ জন প্রান্তিক কৃষকের হাতে ‘কৃষক কার্ড’ তুলে দেওয়ার মাধ্যমে সারা দেশে প্রিপাইলট প্রকল্পের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।

ঢাকা থেকে সড়কপথে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি টাঙ্গাইলে শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে আসেন। দুপুর ১২টা ২২ মিনিটে তিনি ল্যাপটপের বাটন চাপার সঙ্গে সঙ্গে টাঙ্গাইলসহ দেশের ১১টি উপজেলার ২২ হাজার ৬৭ জন কৃষকের প্রত্যেকের কাছে মোবাইলের মাধ্যমে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আড়াই হাজার টাকার নগদ অর্থ চলে যায়। টাঙ্গাইলে ১ হাজার ৪৫৩ জন কৃষক-কিষানি এই অর্থ পেয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী মঞ্চে ১৫ জন কৃষক-কিষানির হাতে কৃষক কার্ড এবং গাছের চারা তুলে দেন। তিনি কৃষক-কিষানিদের উদ্দেশে বলেন, ‘এই যে গাছের চারা দিচ্ছি, তা বড় হলে ফল কিন্তু আমার জন্য পাঠাবেন।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা নিশ্চয়ই অবগত হয়েছেন যে কৃষক কার্ডের মাধ্যমে আমরা কৃষকের কাছে সরাসরি ১০টি সুবিধা পৌঁছে দিতে চেষ্টা করব ইনশা আল্লাহ। ১০টি সুবিধার মাধ্যমে কৃষক তাঁর অবস্থান অনেক ক্ষেত্রে পরিবর্তন করতে সক্ষম হবেন।’

বিএনপির চেয়ারম্যান দলের নির্বাচনী ইশতেহারের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘এই মঞ্চে যত মানুষ উপস্থিত আছেন, হয়তো সবাই সরাসরি কৃষক বা কৃষির সাথে সম্পৃক্ত নন। কিন্তু আমাদের পরিবারের কেউ না কেউ আছেন, যে মানুষটি কৃষির সাথে সম্পৃক্ত। বাংলাদেশে আমরা যত মানুষ আছি, তার মধ্যে চার কোটি পরিবার আছে, তাদের পরিবারের কেউ না কেউ কৃষির সাথে সম্পৃক্ত; অর্থাৎ এই দেশের প্রধান পেশা হচ্ছে কৃষি।’

তারেক রহমান বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিশ্বাস করে, বর্তমান নির্বাচিত সরকার বিশ্বাস করে যে এই দেশের কৃষক যদি সচ্ছল থাকে, এই দেশের কৃষক যদি বেঁচে থাকে, এই দেশের কৃষক যদি ভালো থাকে; তাহলে সমগ্র বাংলাদেশ ভালো থাকতে পারবে। সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ ভালো থাকতে পারবে।’

এ সময় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার শাসনামলে কৃষক ও কৃষি ক্ষেত্রে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন, যার মাধ্যমে আমরা দেখেছিলাম এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ কৃষিতে মোটামুটিভাবে শস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছিল। আমরা দেখেছি দেশে ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষে অসংখ্য মানুষ না খেয়ে মারা গিয়েছিল। সেই বাংলাদেশে আমরা দেখেছি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় শুধুমাত্র খাল খনন করার ফলে, কৃষক সেচ সুবিধা পাওয়ার ফলে কৃষির উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছিল। সেই সময় এই বাংলাদেশ থেকে অল্প পরিমাণে হলেও বিদেশে খাদ্য রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছিল।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপি যতবার দেশ পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে, বিএনপি সরকার কৃষক ভাইদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। আপনারা বিএনপির ওপরে বিগত নির্বাচনে আস্থা রেখেছেন ইনশা আল্লাহ এই সরকার আপনাদের সেই আস্থার পূর্ণ মর্যাদা দেবে।’ তিনি বলেন, ‘আমি বলতে চাই, এখন আমাদের দেশ গড়ার সময়। কৃষক ভাইদের পাশে আমরা যেমন দাঁড়াব, একই সাথে দেশের কিষানি বোনসহ দেশের যে নারীসমাজ আছেন, তাঁদের পাশে দাঁড়াব।’

দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘নারীসমাজকে যদি আমরা স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে না পারি, তাহলে এই দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব না। সেই কারণেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, আমরা যদি সরকার গঠন করতে সক্ষম হই তাহলে বাংলাদেশের মা-বোনদের জন্য, নারীদের জন্য, পরিবারের নারীপ্রধানের জন্য আমরা ফ্যামিলি কার্ড চালু করব। আল্লাহর রহমতে সেই কাজটি পাইলট প্রজেক্ট আকারে আমরা শুরু করতে সক্ষম হয়েছি। পর্যায়ক্রমিকভাবে আগামী পাঁচ বছরের ভেতরে আমরা পরিবারের সকল নারীপ্রধানের কাছে এই কার্ডের সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার জন্য চেষ্টা করব।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান সরকার জনগণের সরকার। এই সরকার কৃষক বলুন, দেশের মা-বোনদের কথা বলুন, মসজিদের ইমাম-খতিব সাহেবসহ অন্যান্য ধর্মীয় গুরু যারা আছেন, তাঁদের কথা বলুন, ছাত্রদের কথা বলুন, দল-শ্রেণি-পেশানির্বিশেষে প্রত্যেকটি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে।’ তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে দেশের উন্নয়ন ও মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন। সে জন্যই আমরা বলে থাকি, ‘করব কাজ, গড়ব দেশ; সবার আগে বাংলাদেশ’।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আসুন আমরা এই দেশের প্রত্যেকটি নাগরিক আমরা রাজনীতি করি বা না করি, আমরা কৃষক হই বা না হই, আমরা ছাত্র হই না হই, আমরা ব্যবসায়ী হই বা না হই, যে মানুষই হয়ে থাকি না কেন, যে পেশার মানুষ হয়ে থাকি না কেন, প্রত্যেকের আমাদের একটি আকাঙ্ক্ষা আছে... নিজের দেশটিকে আমরা ভালো দেখতে চাই। নিজের দেশটিকে আমরা সুন্দর দেখতে চাই।’

তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা দেখতে চাই দেশের মানুষ নিরাপদে বসবাস করছে। এই দেশের সন্তানেরা এ দেশেই বড় হচ্ছে, স্বাচ্ছন্দ্যে বড় হচ্ছে, খেয়ে-পরে, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি করে নিরাপদ ও নিরাপত্তার সাথে বড় হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য সেটাই। আমরা সেই লক্ষ্য অর্জন করতে চাই। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব একমাত্র যদি জনগণের সহযোগিতা থাকে। সে জন্যই আমরা জনগণকে সাথে নিয়ে চলতে চাই, জনগণকে পাশে রেখে চলতে চাই, জনগণকে সাথে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই, দেশ গঠন করতে চাই।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে এই কৃষক কার্ড উদ্বোধন করার মাধ্যমে আবারও আমি বাংলাদেশের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে দেশ গঠনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।’

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের শুরুতে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, ‘এই যে পয়লা বৈশাখ আজকের এই অনুষ্ঠানটি, পয়লা বৈশাখ কীভাবে আসল নিশ্চয়ই অনেকেরই আপনাদের ধারণা আছে। যদিও বর্তমানে এটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে রূপ নিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘পয়লা বৈশাখটি আসলে আমাদের এই বাংলাদেশের কৃষকদের সাথে সম্পৃক্ত। কৃষির ক্ষেত্রে হোক, ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে হোক, কৃষকেরা তাদের হিসাবের খাতাটি নতুন করে পয়লা বৈশাখ থেকে শুরু করেন। সেখান থেকে পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানটি এসেছে। যেহেতু পয়লা বৈশাখের মূল বিষয়টি আমাদের কৃষক ভাইদের সাথে জড়িত, কিষানি বোনদের সাথে জড়িত; সে জন্যই আমরা কৃষক কার্ড প্রদানের এই অনুষ্ঠানটির উদ্বোধন ঘোষণা করলাম।’

প্রধানমন্ত্রী জানান, কৃষকদের জন্য ইতিমধ্যে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে। কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ ও কৃষকদের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিশেষ করে উত্তর অঞ্চলসহ বাংলাদেশের যেসব অঞ্চল কৃষিনির্ভরশীল এলাকা, সেই সকল অঞ্চলে কৃষক ভাইদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব, কিষানি বোনদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব, আমরা কৃষিতে সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করব। একই সাথে আমাদের চেষ্টা থাকবে যে শুধু কৃষিপণ্য উৎপাদন করলেই চলবে না, সেই সকল অঞ্চলে কীভাবে কৃষিপণ্যের সাথে সম্পৃক্ত যেসব কলকারখানা আছে, সেগুলোও যাতে প্রতিষ্ঠিত করা যায়, তার ব্যবস্থা নিতে হবে।’

তারেক রহমান বলেন, ‘কৃষক যাতে তার পণ্যের মূল্য আরও বেশি পেতে পারে, যাতে করে আমাদের কৃষিজাত পণ্য বিদেশেও রপ্তানি করতে পারি সেই জন্য আমরা পদক্ষেপ গ্রহণ করব।’ তিনি বলেন, ‘আপনারা গতকাল খবরে দেখেছেন—গতকাল বাংলাদেশের যে সকল ব্যবসায়ী এই কৃষিজাত পণ্যের ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত, যাদের কৃষিজাত পণ্যের কলকারখানা আছে, তাদের সাথে প্রায় চার ঘণ্টা বৈঠক করেছি। তাদের সমস্যার কথা শুনেছি এবং অনেকগুলো সমাধানের চেষ্টা আমরা করেছি। যাতে করে তারা আরও বেশি বিনিয়োগ করতে পারে, আরও বেশি মানুষকে সম্পৃক্ত করতে পারে, আরও বেশি কৃষিপণ্য কৃষক ভাইদের কাছ থেকে কিনতে পারে এবং সেই সকল পণ্যকে তারা বিদেশে রপ্তানি করতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তাতে একদিকে যেমন কৃষক ভাইদের সুবিধা হবে, একইভাবে দেশের জন্য আমরা মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হব।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কৃষক ভাইদের অনেক সমস্যা আছে; যেমন টাঙ্গাইলের আনারস বিখ্যাত। এই আনারসের প্রচুর ফলন। কিন্তু এই আনারসকে আমরা প্রিজার্ভ করে রাখতে পারি না।’ তিনি বলেন, ‘আনারসটা সিজনের পরেও যাতে আমরা রাখতে পারি। কোল্ডস্টোরেজ বা সে রকম প্রক্রিয়াজাত করার কিছু নেই এ রকম অনেক পণ্য আছে বাংলাদেশে, সেগুলোকে আমরা যদি প্রক্রিয়াজাত করে রাখতে পারি, কোল্ডস্টোরেজ করে রাখতে পারি; তাহলে কৃষক ভাইয়েরা লাভবান হবেন।’

কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদের সভাপতিত্বে ও অতিরিক্ত সচিব সেলিম খানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রতিনিধি জিয়াওকুন শি, কৃষিসচিব রফিকুল ই মোহামেদ বক্তব্য দেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

নীরবে পেট্রোডলার চুক্তি বাতিল সৌদির, পেট্রোইউয়ানের উত্থান ঠেকাতেই ইরান যুদ্ধ

অবরোধে ক্ষুব্ধ ইরান আটকাতে পারে আরেক জলপথ, সিদ্ধান্ত পাল্টাতে যুক্তরাষ্ট্রকে সৌদির চাপ

মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি-স্থিতিশীলতা রক্ষায় চীনা প্রেসিডেন্টের চার প্রস্তাব

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি ৪৫ দিন বাড়ানোর চেষ্টা, আলোচনার পরবর্তী ভেন্যু নিয়ে মতবিরোধ

কুষ্টিয়ায় পীরকে হত্যা: সাবেক শিবির নেতার হুকুমে হামলা চালায় আসামিরা

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত