বাংলাদেশে নারীদের ৪৫ দশমিক ৫ শতাংশ প্রযুক্তিনির্ভর লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার (টিএফজিবিভি) শিকার হন। সক্রিয়ভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নারীদের মধ্যে এ হার ৬৩ দশমিক ৭ শতাংশ। যার মধ্যে মাত্র ৪ দশমিক ৬ শতাংশ পুলিশের দ্বারস্থ হন।
প্রযুক্তিনির্ভর লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা নিয়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ও ডিজিটালই রাইট পরিচালিত ‘এবিউজ বিয়ন্ড দ্য স্ক্রিন’ শীর্ষক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণা তথ্য অনুযায়ী—অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁরা অপরাধীকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্লক করে দেন। অনেকেই হয়রানির পর অনলাইন ব্যবহার কমিয়ে দেন।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
গবেষণা থেকে উঠে আসা তথ্য তুলে ধরেন মহিলা পরিষদের সিনিয়র প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কর্মকর্তা আফরুজা আরমান ও ডিজিটালি রাইটের হেড অব রিসার্চ আব্দুল্লাহ তিতির। তারা জানান, গবেষণাটি মিশ্র পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়েছে। চলতি বছর ৭ থেকে ১৩ জানুয়ারি ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেট জেলার সিটি করপোরেশন এবং উপজেলা পর্যায়ে ১৫ থেকে ৫৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ৫২১ জন নারী, তরুণী ও কিশোরীর ওপর জরিপ করা হয়। পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা ও আইন বিশেষজ্ঞ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতিনিধিদের মধ্য থেকে চারজন গুরুত্বপূর্ণ তথ্যদাতার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। প্রযুক্তি-সহায়তায় সংঘটিত লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার অভিজ্ঞতা রয়েছে, এমন আটজন নারীর বিস্তারিত সাক্ষাৎকারও নেওয়া হয়।
জরিপ, গুরুত্বপূর্ণ তথ্যদাতাদের সাক্ষাৎকার এবং ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া তথ্য মিলিয়ে চারটি বিষয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এগুলো হলো—সহিংসতার ধরন ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর বিস্তার, প্রতিকার চাইতে গিয়ে ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা ও বাধা, অনলাইন ও ডিজিটাল মাধ্যমে এ ধরনের সহিংসতার প্রচলন এবং আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা।
গবেষণায় দেখা গেছে, অনলাইনে সহিংসতার শিকার নারীদের ৫৭ দশমিক ৪ শতাংশ গত ১২ মাসেও এ ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের ৬৫ দশমিক ৮ শতাংশ একটি ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন। আর ৩৪ দশমিক ২ শতাংশ একই সঙ্গে দুই বা তার বেশি ধরনের সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশ মনে করেন, অনলাইনে উপস্থিত থাকলে হয়রানির শিকার হওয়া স্বাভাবিক।
তবে গবেষকদের মতে, ক্ষতিকর আচরণকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়ার এ প্রবণতা উদ্বেগজনক।
গবেষণায় ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রযুক্তি-সহায়তায় সংঘটিত লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার অভিজ্ঞতা সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। এ গোষ্ঠীর ৪৯ শতাংশ এ ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষিত নারীদের মধ্যে এ হার ৭৬ দশমিক ৭ শতাংশ। অন্যদিকে অর্থনৈতিক শোষণের শিকার হওয়ার হার গৃহিণীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি—৫০ দশমিক ৪ শতাংশ।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া নারীদের মাত্র ৯ দশমিক ৭ শতাংশ দুই ধাপের পরিচয় যাচাই পদ্ধতি (টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন) ব্যবহার করেন। পাসওয়ার্ড ব্যবস্থাপনার বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করেন মাত্র ৫ শতাংশ।
গবেষণায় প্রযুক্তিনির্ভর লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার কয়েকটি প্রচলিত ধরন চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হয়রানি ও লিঙ্গভিত্তিক শোষণ সবচেয়ে প্রচলিত ধরন। এ ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন ভুক্তভোগীদের ৫২ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থনৈতিক শোষণ ও প্রতারণা শিকার হয়েছেন ভুক্তভোগীদের ৩৭ দশমিক ১ শতাংশ। অন্যদের তুলনায় বয়োজ্যেষ্ঠ নারী ও গৃহিণীদের মধ্যে এর প্রবণতা বেশি। যৌন ও ছবি-ভিত্তিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ। শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি দেখা গেছে। পরিচয়ের অপব্যবহার ও ভুয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের মাধ্যমে সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন ও অনুসরণ (স্টকিং) এর মুখোমুখি হয়েছেন ভুক্তভোগীদের ১৫ দশমিক ২ শতাংশ। এ ছাড়া দলবদ্ধভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট বা পোস্টে আক্রমণ, গণহারে অভিযোগ দিয়ে পোস্ট সরানোর চেষ্টা এবং ট্রলিংয়ের মাধ্যমে নারীদের মানহানি করার প্রবণতা দেখা গেছে। নাম ও পরিচয় গোপন রেখে বার্তা পাঠানোর সুযোগ রয়েছে, এমন অ্যাপ ব্যবহার করেও যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটছে।
গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে মুখাবয়ব ও শরীরের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন বা বিকৃত করে ব্ল্যাকমেল করার ঘটনাও উঠে এসেছে। ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহার করে তৈরি ছবি বা কনটেন্ট দিয়ে নারীদের হুমকি দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, সাবেক অন্তরঙ্গ সঙ্গীরা অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার হাতিয়ার হিসেবে এসব কৌশল ব্যবহার করেন।










