৪০ লাখ কৃষকের কাছে কার্ড পৌঁছে দেব এ বছরই: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান জনসভায় ঘোষণা দেন, এ বছরই দেশের ৪০ লাখ কৃষক কার্ড পাবেন। জনসভা থেকে আখচাষিদের প্রণোদনা দেওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছি, যাতে আগামী মৌসুম থেকে কৃষকদের আখচাষে কষ্ট কম হয়। কেন প্রণোদনা দেওয়া হলো? কারণ বিএনপি বিশ্বাস করে, এই দেশের কৃষি বাঁচলে, কৃষক বাঁচলে এই দেশ বাঁচবে।’ আজ মঙ্গলবার বিকেলে রাজশাহীর মাদ্রাসামাঠের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচনের সময় বিএনপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সরকার গঠন করতে পারলে বিএনপি কৃষকদের পাশে দাঁড়াবে। সরকার গঠনের সাত দিনের মধ্যে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। সেই অনুযায়ী সাত দিনের মধ্যে ১৩ লাখ কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে।
কৃষক কার্ডের বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা কৃষক ভাইদেরকে একটি কার্ড দিতে চাই, যার নাম ফারমার্স কার্ড বা কৃষি কার্ড। ইতিমধ্যে এর কাজ শুরু হয়েছে। আগামী কিছু দিনের মধ্যে কাজ শেষ হবে। তারপর ধীরে ধীরে আমরা কৃষক ভাইদের কাছে কার্ডগুলো পৌঁছানোর চেষ্টা করব। আমরা ৪০ লাখ কৃষকের কাছে কার্ড পৌঁছে দেব এ বছরই।’
তিনি বলেন, কোনো কৃষক বছরে দুই বা তিনটি ফসল উৎপাদন করলে অন্তত একটি ফসলের সার-বীজ এই কার্ডের মাধ্যমে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। এতে কৃষকদের কষ্ট কমবে। এই কার্ডের মাধ্যমে তাঁরা বীমা করতে পারবেন, সহজে ব্যাংকঋণ নিতে পারবেন এবং আগামীকাল বৃষ্টি হবে কি না, সেই তথ্যও জানতে পারবেন। ফলে বীজ বপন বা সার প্রয়োগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।
পাঁচ বছরে খনন হবে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল
কৃষকদের সেচসুবিধা নিশ্চিত করতে সারা দেশে খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হবে। এরই মধ্যে আট মাসে ৮০০ কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছে। এতে কৃষকেরা সেচসুবিধা পাবেন এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ হবে। তিনি বলেন, ‘এই উত্তরাঞ্চল তো দেশের শস্যভান্ডার। এখানে যেমন পানির কষ্ট হয়, অন্যখানেও হয়। শহীদ জিয়ার সময় খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। এই যে বরেন্দ্র প্রকল্প, সেটা শহীদ জিয়ার সময় কার্যকর হয়েছিল।’
পদ্মা ও তিস্তা নদীর পানির সমস্যা সমাধানে ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘পদ্মা নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। এ জন্য তিস্তা ও পদ্মা নদীতে ব্যারাজ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পানির সমস্যা যারা তৈরি করেছে, তাদের সঙ্গে কথা বলা হবে। বাংলাদেশের পানির হিস্যা পাওয়ার জন্য যতদূর যেতে হয়, সরকার সেই চেষ্টা করবে। পাশাপাশি যত দ্রুত সম্ভব ব্যারাজ নির্মাণের কাজ শেষ করা হবে।’
উপজেলা হাসপাতাল হবে ১৫০ শয্যার
গ্রামীণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর শয্যাসংখ্যা ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১৫০ করার সিদ্ধান্তের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘বিএনপি জনগণের সরকার। তাই জনগণের কথা চিন্তা করে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রত্যেক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বেড সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে। এখন ৫০ বেডের হাসপাতাল আছে। ৩০ বেড করেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তিনি রেখে গেছেন ৩০ বেড, ১৯৯১ সালে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া আরও ২০ বেড বাড়িয়েছিলেন। এবার যেহেতু বিএনপি সরকার গঠন করেছে, সে জন্য প্রত্যেক হাসপাতাল ৫০ বেড থেকে ১৫০ বেডে উন্নীত করব।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে চাই। আমরা শিশুদের জন্য বেড রাখব। মা-বোনদের জন্য আলাদা বেড রাখব। কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিসের ব্যবস্থা করব, যাতে এতদূর আসতে না হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘গত জুনে উপস্থাপিত বাজেটে কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিসের খরচ কমানো হয়েছে। হৃদরোগীদের চিকিৎসার সরঞ্জামের ওপর কর কমানো হয়েছে। আগে হার্টের রোগীদের যে সরঞ্জামের জন্য এক লাখ ২০ হাজার টাকা লাগত, তা এখন ৬০ থেকে ৬৫ হাজার টাকায় নেমে এসেছে।’
ডিসেম্বরের মধ্যে ৪৬টি বন্ধ কারখানা চালুর উদ্যোগ
প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশের বন্ধ মিল-কারখানা চালুর জন্য বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাকে উৎসাহিত করা হয়েছে। এরই মধ্যে বন্ধ ছয়টি মিল-কারখানা উদ্যোক্তাদের দেওয়া হয়েছে, যাতে তাঁরা সেগুলো চালু করতে পারেন। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সারা দেশে বন্ধ থাকা প্রায় ৪৬টি কারখানা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য শ্রমিকদের বেকারত্ব দূর করা।
দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিবেশ বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘বিএনপি সরকার দেশে নিরাপত্তা বাড়ানোর চেষ্টা করছে এবং বেকারত্বের অভিশাপ কমিয়ে আনতে চাচ্ছে। দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হচ্ছে।’
কিন্তু কিছু রাজনৈতিক দল রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে সরকারের উন্নয়নমূলক কাজ বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন যদি উপজেলা হাসপাতালে বেড না বাড়ে, মিল-কারখানা চালু না হয়, খাল খনন না হয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে কে? আমার প্রশ্ন, যারা এমন কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করতে চায়, যাতে জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে কি তারা জনগণের বন্ধু হলো? খাল খনন কর্মসূচি কি জনগণের কর্মসূচি নয়?’
নারীদের অনার্স পর্যন্ত বিনা মূল্যে পড়াশোনা
নারীদের শিক্ষা ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত বিনা মূল্যে পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছিলেন। এবার বিএনপি সরকার অনার্স পর্যন্ত বিনা মূল্যে পড়াশোনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি ভালোভাবে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হবে।
নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এই কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এতে তাঁরা সন্তানদের ভালো খাবারের ব্যবস্থা করতে পারবেন, জরুরি প্রয়োজন মেটাতে পারবেন এবং ছোট ছোট বিনিয়োগ করতে পারবেন। তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা একটি পরিবারকে মায়ের নেতৃত্বে আত্মনির্ভরশীল করতে চাই। এভাবে একটি গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগ এবং সর্বশেষ বাংলাদেশ আত্মনির্ভরশীল হবে।’
এ সময় বিএনপির গাছ লাগানোর কর্মসূচির কথাও উল্লেখ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের প্রক্রিয়া যেন কেউ বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সে জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
তাঁর ভাষায়, ‘বিদেশ থেকে কেউ এসে আমাদের দেশ গড়ে দিয়ে যাবে না। কষ্ট করে আমাদেরই গড়তে হবে। ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাত দিয়ে কষ্ট করে আমাদের এই দেশ গড়তে হবে।’
তিনি বলেন, জনগণের সমর্থনই বিএনপি সরকারের শক্তি। দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
আজকের এ জনসভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটনের পরিচালনায় বক্তব্য দেন, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদ, অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মন্ডল, শফিকুল হক মিলন, ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় চৌধুরী, দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন প্রমুখ।
অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, বিএনপির শিল্প বিষয়ক সম্পাদক আবুল কালাম এমপি, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদা হাবীবা, কৃষকদলের সভাপতি কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিন প্রমুখ।










