Ajker Patrika

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ.লীগের সাবেক ৭ এমপি ও পরিবারের বিরুদ্ধে দুদকের ১৬ মামলা

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮: ১৭
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ.লীগের সাবেক ৭ এমপি ও পরিবারের বিরুদ্ধে দুদকের ১৬ মামলা
ছবি: বাসস

জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, সম্পদের তথ্য গোপন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক সাত সংসদ সদস্য (এমপি) ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ১৬টি মামলার অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ ছাড়া সাবেক এক এমপির বিরুদ্ধে করা মামলায় আদালতে চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আজ বুধবার দুদকের সচিব সাইদুর রহমান খান সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানিয়েছেন।

এসব মামলায় সাবেক এমপিদের পাশাপাশি তাঁদের স্ত্রী, ভাই ও সন্তানদেরও আসামি করা হয়েছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে কোটি কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, সম্পদবিবরণীতে তথ্য গোপন, ব্যাংক হিসাবে বিপুল অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর ও সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ।

মামলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে যাঁদের বিরুদ্ধে, তাঁরা হলেন কুষ্টিয়া-৪ আসনের সাবেক এমপি সেলিম আলতাফ জর্জ ও আবদুর রউফ, কুষ্টিয়া-১ আসনের রেজাউল হক চৌধুরী, হবিগঞ্জ-৩ আসনের মো. আবু জাহির, ফেনী-৩ আসনের হাজি রহম উল্লাহ, লক্ষ্মীপুর-২ আসনের নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়ন ও সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক এমপি ফরিদা ইয়াসমিন। এ ছাড়া ভোলা-৩ আসনের সাবেক এমপি নুরুন্নবী চৌধুরীর বিরুদ্ধে করা মামলায় চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

কুষ্টিয়া-৪ আসনের সাবেক এমপি সেলিম আলতাফ জর্জের বিরুদ্ধে দাখিল করা সম্পদবিবরণীতে ৬৪ লাখ ৪৮ হাজার ৪৭৮ টাকার সম্পদের তথ্য কম দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ১ কোটি ১ লাখ ৬৪ হাজার ৩ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করে ভোগদখলে রাখার অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগে দুদক আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় মামলা করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

একই আসনের সাবেক এমপি আবদুর রউফের বিরুদ্ধে ২ কোটি ৬৫ লাখ ১০ হাজার ৬০৫ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর স্ত্রী জান্নাতুন নাহারের বিরুদ্ধে ১ কোটি ৩৯ লাখ ৯৯ হাজার ২৯২ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। এ সম্পদ অর্জনে সহায়তার অভিযোগে আবদুর রউফসহ দুজনের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা করার অনুমোদন দিয়েছে দুদক।

কুষ্টিয়া-১ আসনের সাবেক এমপি রেজাউল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে সম্পদবিবরণীতে ৩৭ লাখ ২৬ হাজার ৬০০ টাকা কম দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ২ কোটি ৪৬ লাখ ৯২ হাজার ৫৩৫ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

রেজাউল হক চৌধুরীর ছোট ভাই দৌলতপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. বুলবুল আহমেদ টোকেন চৌধুরীর বিরুদ্ধেও পৃথক মামলা হচ্ছে। তাঁর বিরুদ্ধে সম্পদবিবরণীতে ৩৪ লাখ ১৪ হাজার টাকা কম দেখানো ও ১ কোটি ৭৯ লাখ ৩৫ হাজার ২৬৮ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।

সম্পদবিবরণীতে ৭ কোটি ২৭ লাখ ৩৬ হাজার ৬২৭ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য গোপন করে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য দেওয়ার অভিযোগে হবিগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক এমপি মো. আবু জাহিরের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন করেছে দুদক। এ ছাড়া তাঁর নামে ৯ কোটি ৩২ লাখ ৭১ হাজার ৫৫৯ টাকার জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ থাকার অভিযোগ রয়েছে। চারটি ব্যাংক হিসাবে ২২ কোটি ৫৬ লাখ ৩ হাজার ৭৫৬ টাকা স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগে দুদক আইন ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ফেনী-৩ আসনের সাবেক এমপি হাজি রহম উল্লাহর বিরুদ্ধে দুদক আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারায় মামলা করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সাবেক এমপি নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়নের বিরুদ্ধে ৭৯ লাখ ৯৯ হাজার ৬৪২ টাকার জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় দুদক আইন ও ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সে সঙ্গে তাঁর স্ত্রী চৌধুরী রুবিনা ইয়াছমিন লুবনার বিরুদ্ধে ১ কোটি ৮২ লাখ ৫১ হাজার ৫৮৯ টাকার জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। স্ত্রীর ওই সম্পদ অর্জনে সহায়তার অভিযোগে নয়নসহ দুজনের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

নঈম নিজাম ও ফরিদা ইয়াসমিনের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন

সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফরিদা ইয়াসমিনের বিরুদ্ধে ২ কোটি ৭৪ লাখ ১৩ হাজার ১৮০ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে পরিচালিত ১৭টি ব্যাংক হিসাবে ২১ কোটি ৯ লাখ ৩৪ হাজার ৮১৪ টাকা লেনদেনের অভিযোগে পৃথক মামলা করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

ফরিদা ইয়াসমিনের স্বামী বাংলাদেশ প্রতিদিনের সাবেক সম্পাদক ও নিউজটোয়েন্টিফোরের সাবেক সিইও নঈম নিজামের বিরুদ্ধেও মামলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ২ কোটি ৮ লাখ ৫০ হাজার ১৩৫ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে পরিচালিত ১৯টি ব্যাংক হিসাবে ৩৯ কোটি ৩৯ লাখ ৬১ হাজার ৯১৩ টাকা লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। এসব ঘটনায় দুদক আইন ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

নুরুন্নবী চৌধুরীর বিরুদ্ধে চার্জশিট

ভোলা-৩ আসনের সাবেক এমপি নুরুন্নবী চৌধুরীর বিরুদ্ধে করা মামলায় চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন দিয়েছে দুদক। মামলাটি ২০২৫ সালের ১৪ জুলাই দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, বরিশালের (ভোলা জেলা) কার্যালয়ে করা হয়। মামলায় নুরুন্নবী চৌধুরী ছাড়াও লালমোহনের উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সোহাগ ঘোষ, তজুমদ্দিনের উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. সেলিম মিয়াসহ সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের সভাপতিদের আসামি করা হয়েছিল। আসামির মোট সংখ্যা ১৮।

দুদকের তদন্তে বলা হয়েছে, লালমোহন ও তজুমদ্দিন উপজেলায় ২০২১-২২, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা কর্মসূচির আওতায় মোট ৩৫৬টি প্রকল্প নেওয়া হয়। এর মধ্যে ১১টি প্রকল্পে কোনো কাজ না করেই বরাদ্দের ৩১ লাখ ৭২ হাজার ৩৩৩ টাকা উত্তোলন করা হয় বলে অভিযোগ। আরও চারটি প্রকল্পে ৩ লাখ ৩১ হাজার টাকার কাজ কম করে ওই অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।

সব মিলিয়ে ৩৫ লাখ ৩ হাজার ৩৩৩ টাকা উত্তোলন করে আত্মসাতের অভিযোগে মামলাটি করা হয়। তদন্তে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ায় ১৮ আসামির বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০ ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় আদালতে চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া, সাবেক বসুরহাট পৌর মেয়র আবদুল কাদের মির্জা, তাঁর স্ত্রী আখতার জাহান বকুল ও ছেলে মির্জা মাসরুর কাদের তাশিকের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তিনটি মামলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের পরিমাণ যথাক্রমে ১ কোটি ১৯ লাখ ৯৬ হাজার ৯৫০, ১ কোটি ৫০ লাখ ৮৩ হাজার ৪০০ ও ৮১ লাখ ৭৩ হাজার ৭৪৫ টাকা।

এ ছাড়া যশোরের সাবেক পৌর মেয়র জহিরুল ইসলাম চাকলাদার ও তাঁর স্ত্রী শামীমা শারমিনের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগে দুটি মামলা অনুমোদন করেছে সংস্থাটি। অভিযোগের পরিমাণ ২৪ কোটি ৫৮ লাখ ৪৫ হাজার ২২১ ও ৬ কোটি ৭২ লাখ ৯ হাজার ৪৫৩ টাকা।

খুলনা জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা এস এম মাহাবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে এবং স্ত্রী জাকিয়া মাহাবুবসহ দুজনের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগে দুটি মামলা অনুমোদন করা হয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত