Ajker Patrika

অস্ত্র-কাণ্ডে মন্ত্রিত্ব গেল ইশরাকের

• গেন্ডারিয়ায় শনিবার অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযান।

• এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।

• রোববার ডেকে নিয়ে পদত্যাগ করার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর।

• সংবাদ সম্মেলনে স্বেচ্ছায় প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়ার ঘোষণা।

• বিএনপি চাইলে মেয়র পদে নির্বাচনের প্রস্তুতি আছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০২: ০০
অস্ত্র-কাণ্ডে মন্ত্রিত্ব গেল ইশরাকের
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের আগে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছেন ইশরাক হোসেন। গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবে। ছবি: আজকের পত্রিকা

অস্ত্র-কাণ্ড নিয়ে বিতর্কের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়ার ঘোষণা দিলেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে গতকাল সোমবার সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন তিনি। বিএনপি চাইলে তিনি ডিএসসিসির মেয়র পদে নির্বাচন করতে প্রস্তুত বলেও জানান।

জাতীয় প্রেসক্লাবে দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করেন ইশরাক হোসেন। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী যথাসময়ে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হন তিনি। তাঁর সঙ্গে কয়েক শ নেতা-কর্মী ও সমর্থক ছিলেন। তাঁরা মুহুর্মুহু স্লোগান দেন। ফলে সংবাদ সম্মেলন অনেকটা সমাবেশের রূপ নেয়।

সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন বলেন, গতকাল (সোমবার) থেকে তিনি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে। তাঁর কারণে যাতে প্রধানমন্ত্রীর কোনো কর্মকাণ্ড ম্লান হয়ে না যায়, ঢাকা না পড়ে যায়, দল যাতে কোনো কারণে বিব্রত না হয়। প্রধানমন্ত্রী তাঁকে মাদকবিরোধী কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছেন।

রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় গত শনিবার রেললাইনের পাশে অস্ত্র হাতে ইশরাকের মাদকবিরোধী অভিযানের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। ইশরাক দাবি করেন, তিনি নিজের নিরাপত্তার জন্য বৈধ অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন। সূত্র জানায়, সচিবালয়ে রোববার মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করতে ইশরাককে নির্দেশ দেন। তবে রাতে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই খবর প্রকাশ হলে একে অসত্য, ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন ইশরাকের প্রেস কর্মকর্তা। গতকাল দুপুরে ইশরাক সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়ার ঘোষণা দিলেন।

বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সাড়ে তিন মাসের মাথায় গত ১ জুন শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। ২২ আগস্ট তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন জহির উদ্দিন স্বপন। এরপর তিনি মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান। এ ছাড়া মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় নাম আসায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য পদ থেকে বিএনপির ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ১ অক্টোবর পদত্যাগ করেন।

শনিবারের অভিযানের ঘটনায় গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক বলেন, ‘গণমাধ্যমের ভূমিকায় আমি হতাশ হয়েছি, কেন আমাকে এভাবে টার্গেট করা হলো।’ তিনি বলেন, ‘দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে এ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। তার কিছুটা সত্য, কিছুটা অতিরঞ্জিত। আমাকে টার্গেট করে হেয়প্রতিপন্ন করতে কল্পকাহিনি বানানো হয়েছে। এতে করে দলও বিব্রত হয়েছে।’ মাদক নির্মূলের মূল উদ্দেশ্য থেকে দৃষ্টি ভিন্ন দিকে নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করে তিনি বলেন, ‘জমি দখল করতে যাই নাই, চাঁদা উঠাইতেও যাই নাই, মাদক নির্মূলের উদ্দেশ্যে গিয়েছিলাম। আমার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য একটি আগ্নেয়াস্ত্র সঙ্গে ছিল। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আশঙ্কা থেকে আমি আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়েছিলাম।’

সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক বলেন, ঢাকা-৬ আসনের গেন্ডারিয়ার গুমটিঘর ও মুন্সিরটেকে দীর্ঘদিন ধরে মাদক কেনাবেচা চলছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা বারবার তাঁর কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ করেছেন। মাদক বিক্রির পাশাপাশি এলাকাটি বিভিন্ন ধরনের মাদক সরবরাহের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি স্থানীয় থানা-পুলিশের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন। ঢাকা-৬ আসনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত বৈঠকে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা ও বিএনপির নেতারাও উপস্থিত থাকতেন। তিনি বলেন, গুমটিঘর এলাকায় একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। এ জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আধা সরকারি পত্র (ডিও লেটার) পাঠানো এবং ফাঁড়ির জন্য জায়গা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি।

ইশরাকের দাবি, গত ১৮ সেপ্টেম্বরের একটি বৈঠকে স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে এলাকাটিতে ‘সামাজিক প্রতিরোধ’ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। ওই সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় ১৭ অক্টোবর (শনিবার) অভিযান চালানো হয়। অভিযানে যাওয়ার আগে পুলিশকে জানানো হয়েছিল। অভিযানের বিস্তারিত তথ্য আগেভাগে জানালে তা ফাঁস হওয়ার আশঙ্কায় শেষ মুহূর্তে সংশ্লিষ্টদের খবর দেওয়া হয়।

ইশরাক হোসেন শনিবার বিকেলে নিজের ফেসবুক পেজে গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানের একাধিক ভিডিও প্রকাশ করেন। একটি ভিডিওতে তাঁকে অস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নিতে দেখা যায়। তাঁর সঙ্গে থাকা আরেক ব্যক্তির হাতেও অস্ত্র দেখা যায়। অন্য একটি ভিডিওতে কয়েকজনকে হাতকড়া পরিয়ে পুলিশের সঙ্গে নিয়ে যেতে দেখা যায়। ওই ঘটনার পর বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন ওঠে, একজন জনপ্রতিনিধি এভাবে অস্ত্র হাতে অভিযান পরিচালনা করতে পারেন কি না।

রোববার এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে ডিএমপির ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ডিএমপির ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে ঘটনাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তে আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়ে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংবাদ সম্মেলনে শনিবারের অভিযানের বর্ণনা দিয়ে ইশরাক বলেন, গুমটিঘর এলাকায় প্রবেশের পর একদল লোককে ছোটাছুটি করতে দেখে নিজের নিরাপত্তার জন্য তিনি লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নেন। পরে প্রায় ৪৫ মিনিট ওই এলাকায় হেঁটে বিভিন্ন স্থানে মাদক বিক্রি ও সেবনের চিত্র দেখেন। কয়েকটি বাড়িতে ঢুকে পুলিশের উপস্থিতিতে ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোনভর্তি একটি স্কুলব্যাগ, প্রায় ৩০০ গ্রাম হেরোইন, কয়েক বোতল মদ এবং দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এগুলো কোথা থেকে এসেছে—এমন প্রশ্নের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি সেখানে থাকা ব্যক্তিরা। অভিযানের পর ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ নিয়ে যায়।

বিএনপির এই নেতা বলেন, তাঁর নামে দুটি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স রয়েছে, এর একটি পিস্তল ও একটি রাইফেল। অভিযানের সময় দ্বিতীয় অস্ত্রটি লাইসেন্সধারী এক সহকর্মীর কাছে রাখা হয়েছিল।

সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী স্বাভাবিক কার্যক্রমে পুরোপুরি ফিরতে পারেনি। পুলিশ সদস্যের সংকট, যানবাহনের অভাব এবং মাদক কারবারিদের হামলার আশঙ্কায় ওই এলাকায় কার্যকর অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। তিনি বলেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের চাপের মুখে মাদকবিরোধী অভিযানের সমন্বয় ও নেতৃত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা কমিটির সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার কথাও তিনি বলেন।

ইশরাকের দাবি, অভিযানে তাঁর কোনো ব্যক্তিগত, দলীয় বা রাজনৈতিক স্বার্থ ছিল না। মাদকের মূল সরবরাহকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনাই তাঁর লক্ষ্য। মাদকবিরোধী অভিযানের সময় কেউ আহত হয়ে থাকলে সে জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি। তিনি দৃঢ়ভাবে দাবি করেন, নিজের নিরাপত্তার জন্য অস্ত্র হাতে নিয়ে তিনি কোনো ভুল করেননি।

‘দল চাইলে মেয়র নির্বাচনে প্রস্তুত’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র পদে নির্বাচন করবেন কি না, সংবাদ সম্মেলনে এমন প্রশ্নের জবাবে ইশরাক হোসেন বলেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার বিএনপি ও দলের প্রধান তারেক রহমানের। ২০২০ সালে ডিএসসিসি নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, নগরীর বিভিন্ন সমস্যা এবং সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের ঘাটতি নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। দল চাইলে মেয়র পদে নির্বাচন করতে তিনি প্রস্তুত। আবার দল অন্য কাউকে মনোনয়ন দিলেও তাঁর পক্ষে কাজ করবেন।

সংবাদ সম্মেলন শেষে নেতা-কর্মীদের নিয়ে ইশরাক প্রেসক্লাব চত্বরে বের হলে নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন স্লোগান দেন। গাড়িতে চড়ে নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে হাত নাড়েন তিনি। এরপর হ্যান্ডমাইকে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত পুনর্ব্যক্ত করেন। বেলা ৩টার দিকে তাঁকে বহনকারী গাড়ি প্রেসক্লাব থেকে বেরিয়ে শিক্ষা ভবন হয়ে সচিবালয়ের পাশ দিয়ে জিরো পয়েন্ট হয়ে গোপীবাগের বাসার দিকে যায়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত