Ajker Patrika

সড়ক-সেতুর টোল: ইটিসিতে কাজ করে না ৭০% গাড়ির ট্যাগ

  • ডিজিটালি টোল দিতে নম্বরপ্লেটে আরএফআইডি ট্যাগ
  • ইটিসিতে শনাক্ত হয়েছে মাত্র ৩০% গাড়ির ট্যাগ
  • যমুনা সেতুতে ৮০% ট্যাগই অকার্যকর পাওয়া যাচ্ছে
  • ইটিসি থাকতেও অনেক গাড়ি হাতে টোল দিচ্ছে
তৌফিকুল ইসলাম, ঢাকা
সড়ক-সেতুর টোল: ইটিসিতে কাজ করে না ৭০% গাড়ির ট্যাগ
যমুনা সেতু টোল প্লাজা। ফাইল ছবি

সড়ক-সেতুতে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ইটিসি) পদ্ধতিতে টোল দিতে অপরিহার্য আরএফআইডি ট্যাগ ৭০ শতাংশ গাড়ির ক্ষেত্রেই কাজ করছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। ইটিসি ব্যবস্থা চালু করা সংস্থাগুলো এ দাবি করেছে। তবে আরএফআইডি ট্যাগযুক্ত আধুনিক নম্বরপ্লেট প্রস্তুতকারী বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) দাবি করছে, বেশির ভাগ গাড়ির আরএফআইডি ট্যাগই সচল।

দ্রুত টোল পরিশোধের জন্য দেশের কিছু সড়ক ও বড় সেতুতে চালু হয়েছে ডিজিটাল টোল দেওয়ার পদ্ধতি ইটিসি। এ পদ্ধতিতে গাড়ির নম্বরপ্লেটে থাকা রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেনটিফিকেশন (আরএফআইডি) ট্যাগের মাধ্যমে টোল পরিশোধ করা হয়। এ ট্যাগ ছাড়া ইটিসি ব্যবস্থা গাড়ির তথ্য ‘রিড করতে’ পারে না।

২০১২ সালে বিআরটিএ ডিজিটাল নম্বরপ্লেট ও আরএফআইডি ট্যাগ সংযোজন কার্যক্রম শুরু করে। তারা গাড়ির মালিকদের কাছ থেকে কয়েক হাজার টাকা করে নিয়ে ডিজিটাল নম্বরপ্লেট ও আরএফআইডি ট্যাগ দিয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে যানবাহন ট্র্যাকিং করা যাবে। এতে করে চুরি হওয়া গাড়ির অবস্থান শনাক্ত এবং আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন সুবিধা পাওয়া যাবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ থেকে সেভাবে প্রত্যাশিত সুবিধা পাওয়া যায়নি।

বিআরটিএ ২০১২ সাল থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৫৪ লাখ ৪২ হাজার ১৬০ সেট আরএফআইডি ট্যাগযুক্ত রেট্রো-রিফ্লেক্টিভ নম্বরপ্লেট প্রস্তুত করেছে। এর মধ্যে ৪৮ লাখ ৯৫ হাজার ১২৫ সেট নম্বরপ্লেট মোটরযানে সংযোজন করা হয়েছে। তবে বর্তমানে ঠিক কতগুলো ট্যাগ সচল আর কতগুলো অকার্যকর, তার কোনো তথ্য নেই বিআরটিএর কাছে।

চালু গাড়ির ট্যাগ পরিস্থিতি

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) রিপোর্ট অনুযায়ী, গত ১৬ থেকে ২২ মে পর্যন্ত সাত দিনে সংস্থাটির ইটিসির আওতাধীন ১৫টি সেতু ও সড়কের টোল প্লাজা দিয়ে ৮ লাখ ৬১ হাজার ৪০২টি যানবাহন চলাচল করেছে। এর মধ্যে মাত্র ২ লাখ ৪৮ হাজার ৬৫৫টি যানবাহনের আরএফআইডি ট্যাগ শনাক্ত করতে পেরেছে ইটিসি। অর্থাৎ শনাক্তকরণের হার মাত্র ২৮ দশমিক ৮৭ শতাংশ। বাকি ৭১ দশমিক ১৩ শতাংশ যানবাহনের আরএফআইডি ট্যাগ শনাক্ত করা যায়নি।

সওজের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমাদের সিস্টেম অ্যানালিস্টের তথ্য অনুযায়ী, আরএফআইডি শনাক্তের হার বর্তমানে প্রায় ৩০ শতাংশ। এ ট্যাগ সঠিকভাবে রিড না হলে যানবাহন শনাক্ত করা যায় না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে গাড়ি থামিয়ে ম্যানুয়ালভাবে (হাতে হাতে) টোল আদায় করতে হয়। এতে টোল প্লাজায় যানবাহনের অপেক্ষার সময় বেড়ে যায়।’

একই চিত্র দেখা যাচ্ছে সেতু বিভাগের আওতাধীন সেতুগুলোতেও। যমুনা সেতু সাইট অফিসের একজন কর্মকর্তা জানান, সেখানে অধিকাংশ যানবাহনের ট্যাগ অকার্যকর পাওয়া যায়। বিশেষ করে ট্রাকের ক্ষেত্রে এ সমস্যা বেশি। ওই কর্মকর্তার হিসাবে, যমুনা সেতু ব্যবহারকারী যানবাহনের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ ট্যাগই অকার্যকর।

তবে সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ বলেন, ‘ইটিসিতে আরএফআইডি ট্যাগের সমস্যার বিষয়টি আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। যেসব যানবাহনের আরএফআইডি কার্যকর থাকে না, সেগুলোকে ম্যানুয়াল টোল পরিশোধ করতে হয়।’

বিআরটিএ সূত্র জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কার, মাইক্রোবাস, ট্রাক, ট্যাংকলরি, মোটরসাইকেল, থ্রি-হুইলারসহ সব ধরনের মোটরযানের জন্য ৫৪ লাখ ৪২ হাজার ১৬০ সেট আরএফআইডি ট্যাগযুক্ত নম্বরপ্লেট প্রস্তুত করা হয়েছে। আর শুরু থেকে চলতি বছরের ৩০ মার্চ পর্যন্ত ২ লাখ ৭৫ হাজার ৫২৫টি সিঙ্গেল আরএফআইডি ট্যাগ প্রতিস্থাপনও করা হয়েছে। এখন সারা দেশে বিআরটিএর নিবন্ধিত ২০ শ্রেণির যানবাহনের মোট সংখ্যা প্রায় ৬৭ লাখ ২৪ হাজার ৬৪৭টি।

কতটি ট্যাগ বর্তমানে সচল রয়েছে, তার হিসাব নেই বিআরটিএর কাছে। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো যানবাহন ফিটনেস নবায়নের জন্য এলে তখন ট্যাগ পরীক্ষা করা হয়। অকার্যকর হলে নতুন ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু যেসব যানবাহনের নিয়মিত ফিটনেস নবায়ন করা হয় না, সেগুলোর ট্যাগের বর্তমান অবস্থা বলা সম্ভব নয়।

গত ১১ মে এক গণবিজ্ঞপ্তিতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) বলেছে, অনেক যানবাহনে এখনো ডিজিটাল নম্বরপ্লেট ব্যবহার করা হচ্ছে না। আবার অনেক গাড়ির আরএফআইডি ট্যাগ অকার্যকর থাকায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সমস্যা হচ্ছে। এ জন্য ডিজিটাল নম্বরপ্লেট ও কার্যকর আরএফআইডি ট্যাগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয় ডিএমপির পক্ষ থেকে।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিএর পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘দুই বছর ধরে শতভাগ গাড়ির আরএফআইডি ট্যাগ প্রদান করা হচ্ছে। যেসব গাড়ি ফিটনেস নবায়ন করতে আসে, তাদের আরএফআইডিসহ সবকিছু যাচাই করেই ফিটনেস দেওয়া হচ্ছে। সেই হিসাবে প্রায় ৯০ শতাংশ গাড়ির ট্যাগ থাকার কথা।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধুলাবালি, পানি, আর্দ্রতা ও অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে অনেক সময় আরএফআইডি ট্যাগ অকার্যকর হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত গরমে ট্যাগের প্লাস্টিক আবরণ ও অভ্যন্তরীণ সার্কিট ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার পানি বা আর্দ্রতা প্রবেশ করলে শর্টসার্কিটের ঝুঁকি তৈরি হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শেও ট্যাগের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ অংশ নষ্ট হতে পারে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, বিআরটিএ গাড়ির মালিকদের প্রথম ডিজিটাল নম্বরপ্লেট ও আরএফআইডি ট্যাগ দেওয়ার সময় বলেছিল, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে যানবাহন ট্র্যাকিং, চুরি হওয়া গাড়ি শনাক্ত এবং আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু এত বছরেও সেই সুবিধাগুলো কার্যকর করা যায়নি। যানবাহনে আরএফআইডি অবকাঠামো থাকলেও তা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় রিডার ও সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি। এর জন্য দায়ী বিআরটিএ।’

কর্তৃপক্ষের সার্ভারে আরএফআইডি ট্যাগ লাগানো গাড়ির সার্বিক তথ্য দেখাবে। যেমন কর, গাড়ির ফিটনেস, রুট পারমিট ইত্যাদি। আর কেন্দ্রীয় ডেটাবেইসে গাড়ির মালিকের নাম, গাড়ির রংসহ বিস্তারিত তথ্য জমা থাকবে। এর মাধ্যমে রুট পারমিটের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয়ভাবে খুদে বার্তায় জানানো হবে হালনাগাদ করার তথ্য। এই ট্যাগের মাধ্যমে কোনো মোটরযানের গতিবিধির ওপর লক্ষ রাখাও যায়, যা চুরি ঠেকাতে সহায়ক।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত