আপত্তি ও কাটছাঁটে আটকে আছে নদী কমিশন আইন
• ২০২০ সালে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়
• দফায় দফায় সভা করেও খসড়া চূড়ান্ত করা যায়নি
• পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিআইডব্লিউটিএর আপত্তিতে আইনের খসড়ায় কাটছাঁট

দেশের নদ-নদীর সুরক্ষায় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে কার্যকর ক্ষমতা দিতে দীর্ঘ এক দশক আগে নির্দেশ দিয়েছিলেন উচ্চ আদালত। তার চার বছর পর ২০২০ সালে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু আইনের খসড়া তৈরির পর আন্তমন্ত্রণালয় সভা ও দফায় দফায় পর্যালোচনার পরও তা চূড়ান্ত হয়নি। প্রকল্প গ্রহণে নদী কমিশনের অনাপত্তি গ্রহণ, নদী আদালত প্রতিষ্ঠা ও কমিশনকে নদীকে সংকটাপন্ন ঘোষণা দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়ে সরকারের দুটি কর্তৃপক্ষের আপত্তিসহ নানা কারণে নতুন আইনের বিষয়টি থমকে আছে। দখল-দূষণসহ বিভিন্ন সমস্যা থেকে নদীকে রক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারছে না কমিশন।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০১৩-এর ১২ ধারায় নদী দখলমুক্ত করা, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, দূষণ রোধ ও মৃতপ্রায় নদী খননসহ ১৩ ধরনের কার্যাবলি নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এসব ক্ষেত্রে কমিশনের মূল দায়িত্ব সরকারকে সুপারিশ করা। সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়া বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করার সুস্পষ্ট ক্ষমতা এ ধারায় নেই।
একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ ও ২০১৯ সালে উচ্চ আদালতের পৃথক দুটি রায়ে নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি রায়ে বলা হয়, নদী রক্ষা কমিশনকে তুরাগ নদসহ দেশের সব নদ-নদী দূষণ ও দখলমুক্ত করে সুরক্ষা, সংরক্ষণ এবং উন্নয়নের লক্ষ্যে আইনগত অভিভাবক ঘোষণা করা হলো। ...নদ-নদী সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা, অধিদপ্তর এবং মন্ত্রণালয় আজ থেকে সব নদ-নদী দূষণ ও দখলমুক্ত করে স্বাভাবিক নৌচলাচলের উপযোগী করে সুরক্ষা, সংরক্ষণ, উন্নয়ন, শ্রীবৃদ্ধিসহ যাবতীয় উন্নয়নে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে যথাযথ সহযোগিতা দিতে বাধ্য থাকবে।
আদালতের রায়ে সব নদ-নদী, খাল-বিল-জলাশয়ের ক্ষেত্রে নতুন প্রকল্প প্রণয়নের লক্ষ্যে পরিকল্পনা কমিশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিআইডব্লিউটিএসহ সব সরকারি সংস্থাকে নদী রক্ষা কমিশনের অনাপত্তিপত্র গ্রহণ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, বিদ্যমান কমিশন আইনের প্রায় ৭৬ শতাংশ পরিবর্তনের প্রস্তাব থাকায় পুরোনো আইন সংশোধনের পরিবর্তে তা রহিত করে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ২০২০ সালের ডিসেম্বরে নতুন আইনের খসড়া তৈরি করেছিল। ২০২১ সালে তা নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এ নিয়ে ২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত চারটি আন্তমন্ত্রণালয় সভা এবং তিনটি মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা সভা হয়েছে। কিন্তু খসড়া চূড়ান্ত হয়নি।
নতুন আইনের খসড়ায় নদী রক্ষা কমিশনকে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়া, তদন্ত ও অনুসন্ধান পরিচালনা, সুপারিশ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এবং দূষণকারীদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি কমিশনের নিজস্ব প্রসিকিউশন কর্মকর্তা ও আইনজীবী নিয়োগ এবং আইন প্রয়োগের ক্ষমতা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। খসড়ায় নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য শাস্তি, ফৌজদারি কার্যবিধির প্রয়োগ এবং অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।
দুই সংস্থার আপত্তিতে আইনে কাটছাঁট
নদী কমিশনের একটি সূত্র জানায়, নদী কমিশনকে শক্তিশালী করতে খসড়ায় যেসব সুপারিশ করা হয়েছে, তার গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় একাধিক দফায় কাটছাঁট করা হয়েছে। প্রস্তাবিত নদী রক্ষা আইনে নদী বা খাল দখল, দূষণ, নাব্যতা হ্রাস কিংবা পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির কারণে সংকটাপন্ন হয়ে পড়লে কমিশনকে তাকে সংকটাপন্ন ঘোষণা করার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এ বিধান নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের দাবি, দুটি সংস্থাকে এ দায়িত্ব দিলে কর্তৃত্বের দ্বৈততা দেখা দেবে। কমিশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের আপত্তিতে পৃথক নদী আদালত প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব বাতিল করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের বক্তব্য, তাদের আওতায়ই এসব বিষয়ে আইনি প্রতিকারের সুযোগ রয়েছে। নদী কমিশনের আওতায় পৃথক আদালত প্রতিষ্ঠা সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে, এর বাইরে নদী নিয়ে প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে কমিশনের অনুমতি নেওয়ার বিধান, কমিশনের সব সদস্যকেই সার্বক্ষণিক করার প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। নদী রক্ষা কমিশনে পাঁচজন সদস্য থাকার বিধান রয়েছে। গত ছয় বছর ধরেই তা অপূর্ণাঙ্গ অবস্থায় চলছে।
বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তারা যা বলেন
নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘কমিশনের কাজের পরিধি ব্যাপক হলেও কার্যকর ক্ষমতা নেই। আমরা কমিশনকে শক্তিশালী করতে সংশোধিত আইনটি প্রস্তুত করে সুপারিশ করেছিলাম। তবে শুনেছি, প্রস্তাবিত আইনে কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানোর বেশ কিছু সুপারিশ বাদ দেওয়া হয়েছে। কমিশনের স্থায়ী সদস্যসংখ্যা কমানো, চেয়ারম্যান ও সদস্যদের অপসারণের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগীয় সুরক্ষা না রাখা এবং আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত না করার বিষয়গুলোও উদ্বেগজনক। এতে স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে কমিশনের ওপর সরকারি চাপ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।’
সাবেক চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘নদী দখল, অবৈধ বালু উত্তোলন, দূষণ ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট হওয়া ঠেকাতে কমিশনকে কার্যকর নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা দিতে হবে। নদীসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি ও অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন আলোচনায়ও কমিশনকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।’
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া ‘আইনগত সীমাবদ্ধতার’ পাশাপাশি কমিশনের প্রশাসনিক কাঠামোর সমস্যার কথা স্বীকার করেছেন। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘কমিশনের চেয়ারম্যানসহ পাঁচ সদস্য থাকার কথা থাকলেও গত ছয় বছরে এটি পূর্ণাঙ্গ ছিল না। পূর্ণকালীন সদস্যের ঘাটতি এবং অস্থায়ী সদস্য পাওয়া কঠিন হওয়ায় কমিশনের কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমস্যা তৈরি হয়েছে।’
সচিব বলেন, ‘কমিশনের কার্যক্রম সচল করতে পূর্ণকালীন সদস্যের সংখ্যা বাড়ানো এবং কোরাম-সংক্রান্ত জটিলতা কমানোর প্রস্তাব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হবে। কমিশনকে কার্যকর করতে আইনগত ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সাংগঠনিক কাঠামোও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।’









