Ajker Patrika

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে দুই বাঙালির সাইকেলে বিশ্বভ্রমণ আবার আলোচনায়

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে দুই বাঙালির সাইকেলে বিশ্বভ্রমণ আবার আলোচনায়
রামনাথ বিশ্বাস ও বিমল মুখার্জি। ছবি: সংগৃহীত

প্রায় এক শতাব্দী আগে, যখন ভারত ব্রিটিশ শাসনের অধীনে, তখন দুই বাঙালি যুবক সাইকেলে চড়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ঘুরে এমন এক ইতিহাস গড়েছিলেন, যা শুধু ভ্রমণের নয়—উপনিবেশবাদ, জাতীয় পরিচয় এবং স্বাধীনতার ভাবনারও এক অনন্য দলিল। স্কটল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব গ্লাসগোর নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে সেই দুই পথিকৃৎ সাইক্লিস্ট বিমল মুখার্জি ও রামনাথ বিশ্বাসের অসাধারণ অভিযাত্রার গল্প।

জাপানে অনুষ্ঠিত আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমসকে সামনে রেখে প্রকাশিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে বিমল মুখার্জি ও রামনাথ বিশ্বাসের বিশ্বভ্রমণ ব্রিটিশদের সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছিল, যেখানে ভারতীয়দের শারীরিক সক্ষমতা ও আত্মনির্ভরতার বিষয়ে নানা ঔপনিবেশিক স্টেরিওটাইপ প্রচলিত ছিল।

গবেষণার লেখক ইউনিভার্সিটি অব গ্লাসগোর ইম্পেরিয়াল ও পোস্ট-কলোনিয়াল ইতিহাসের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক সৌভিক নাহা। তিনি মনে করেন, এই দুই বাঙালির সাইকেলযাত্রা কেবল ক্রীড়া বা অভিযানের বিষয় ছিল না। বরং এটা ছিল রাজনৈতিক শিক্ষা, সামাজিক অভিজ্ঞতা এবং উপনিবেশবিরোধী চেতনা বিকাশের একটি স্বতন্ত্র মাধ্যম।

সাইকেলে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন

বিমল মুখার্জি ১৯২৬ থেকে ১৯৩৭ সালের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সাইকেলে ভ্রমণ করেন। দীর্ঘ এই অভিযাত্রায় তিনি ইউরোপ, এশিয়া ও অন্যান্য মহাদেশের বহু দেশ অতিক্রম করেন। অর্থের অভাব কখনো তাঁর পথ আটকে রাখতে পারেনি।

গবেষণায় বলা হয়েছে, ভ্রমণের খরচ চালাতে তিনি নানা ধরনের কাজ করেছেন। কখনো ফটোগ্রাফার, কখনো নাবিক, কখনো মাছ ধরার কাজ, আবার কখনো দুগ্ধ খামারে শ্রমিক কিংবা শিক্ষক হিসেবেও কাজ করেছেন। পাশাপাশি নিজের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় বক্তৃতা দিয়ে আয়ও করেছেন।

বিমল মুখার্জির ভ্রমণকাহিনিতে বিশ্বের বহু খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বের উল্লেখ পাওয়া যায়। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহাত্মা গান্ধী, নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী মেরি কুরি, রুশ নৃত্যশিল্পী আন্না পাভলোভা, নৃত্যগুরু উদয় শঙ্কর, মানবতাবাদী চিকিৎসক আলবার্ট শভাইটজার এবং ফিনল্যান্ডের সুরকার জ্যঁ সিবেলিয়াস।

গবেষকদের মতে, এসব সাক্ষাৎ তাঁর ভ্রমণকে শুধু ভূগোলের নয়, সংস্কৃতি ও চিন্তারও এক বৈশ্বিক যাত্রায় পরিণত করেছিল।

রামনাথ বিশ্বাসের বিপ্লবী পথচলা

অন্যদিকে রামনাথ বিশ্বাসের জীবন ছিল আরও রাজনৈতিক। ১৯৩১ সালে তাঁর প্রথম বড় বিশ্বভ্রমণের আগে তিনি সিঙ্গাপুর বন্দরে কেরানি হিসেবে কাজ করতেন। একই সঙ্গে তিনি উপনিবেশবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

বিদেশ সফরের অভিজ্ঞতা তিনি ধারাবাহিকভাবে ভ্রমণকাহিনিতে লিপিবদ্ধ করেন। সেখানে সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ, বর্ণবৈষম্য এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার সংগ্রাম নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।

সৌভিক নাহার গবেষণায় বলা হয়েছে, বিভিন্ন দেশের সাধারণ মানুষের জীবন, শ্রমিক আন্দোলন এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা রামনাথ বিশ্বাসের চিন্তাকে নতুনভাবে গড়ে তোলে। তাঁর লেখায় ভারতীয় স্বাধীনতার প্রশ্ন যেমন রয়েছে, তেমনি সমাজতন্ত্র ও প্যান-এশীয় সংহতির ভাবনাও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।

কেন সাইকেল ছিল আলাদা

সৌভিক নাহার মতে, ট্রেন বা মোটরগাড়ির তুলনায় সাইকেল ভ্রমণ মানুষকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা দেয়। কারণ একজন সাইক্লিস্ট ধীরে চলেন, নিজের ইচ্ছামতো পথ বেছে নিতে পারেন, যেকোনো সময় থামতে পারেন এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ গড়ে তুলতে পারেন। তিনি বলেন, ‘সাইকেল তাঁদের এমন সব মানুষের কাছে নিয়ে গেছে, যাঁদের সঙ্গে অন্য কোনো পরিবহনে ভ্রমণ করলে পরিচয় হওয়ার সুযোগ কম ছিল। বিভিন্ন সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয় তাঁদের উপনিবেশবাদ সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়।’

সৌভিক নাহা আরও বলেন, তাঁদের লেখাগুলো দেখায় যে উপনিবেশবিরোধী চিন্তা সব সময় বড় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান থেকে জন্ম নেয় না। অনেক সময় তা গড়ে ওঠে প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে।

ঔপনিবেশিক ধারণার বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ

ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতীয়দের দুর্বল, নির্ভরশীল ও শারীরিকভাবে অক্ষম হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। বিমল মুখার্জি ও রামনাথ বিশ্বাসের হাজার হাজার কিলোমিটারের সাইকেলযাত্রা সেই ধারণার বাস্তব প্রতিবাদ হয়ে ওঠে। তাঁদের অসাধারণ সহনশীলতা, আত্মনির্ভরতা এবং প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার ক্ষমতা দেখিয়ে দিয়েছিল যে ভারতীয় পরিচয় কোনো ঔপনিবেশিক বর্ণনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

বিশ্বের নানা দেশের মানুষের সঙ্গে মিশে তাঁরা উপলব্ধি করেছিলেন, স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক শাসনের অবসান নয়; এটি মানুষের মর্যাদা, সমতা এবং আত্মপরিচয়েরও প্রশ্ন।

এশিয়ান গেমসের আগে ইতিহাসের পুনরাবিষ্কার

আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত জাপানের আইচি ও নাগোয়ায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে এশিয়ান গেমস। এই আয়োজনকে সামনে রেখে প্রকাশিত গবেষণাটি ভারতীয় উপমহাদেশের সাইক্লিং ইতিহাসের এক প্রায় বিস্মৃত অধ্যায়কে নতুন করে সামনে এনেছে।

সৌভিক নাহা বলেন, ‘প্রায় এক শতাব্দী আগে বিমল মুখার্জি ও রামনাথ বিশ্বাস সাইকেলকে শুধু সহনশীলতার পরীক্ষা হিসেবে ব্যবহার করেননি, বরং ভারতীয় পরিচয় ও সক্ষমতা নিয়ে প্রচলিত ঔপনিবেশিক ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। একটি সাধারণ বাহন কীভাবে রাজনৈতিক শিক্ষা, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং স্বাধীনতার চেতনার বাহক হয়ে উঠতে পারে—এই দুই বাঙালির জীবন সেই ইতিহাসেরই এক অনন্য উদাহরণ।’

উল্লেখ্য, ১৯০৩ সালে বর্তমান ওডিশার গঞ্জাম জেলায় জন্মগ্রহণ করেন বিমল মুখার্জি। তাঁর পৈতৃক নিবাস পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার পটলডাঙা স্ট্রিট। বিমল মুখার্জিকে প্রথম বাঙালি ভূপর্যটক বলে মনে করা হয়। ১৯২৬ থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় সমস্ত মহাদেশ একটি সাইকেলে করে ভ্রমণ করেছিলেন। জনপ্রিয় ভ্রমণবিষয়ক বই ‘দুচাকায় দুনিয়া’ বিমল মুখার্জির লেখা।

অন্যদিকে, ১৮৯৪ সালের ১৩ জানুয়ারি বাংলাদেশের হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার বিদ্যাভূষণ পাড়ায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন রামনাথ বিশ্বাস। তাঁর মা গুণময়ী দেবী ও বাবা বিরজানাথ বিশ্বাস। বিশ্বমানের ভূপর্যটকের পাশাপাশি রামনাথ বিশ্বাস লেখক হিসেবেও খ্যাত ছিলেন। তাঁর লেখা বিখ্যাত বই ‘আফগানিস্তানের ভ্রমণ’।

দ্য টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া থেকে সংক্ষেপে অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত