
আজ ২৩ সেপ্টেম্বর, জলবিষুব। মানে আজ দিন-রাত সমান! আর এই সমান হওয়ার অদৃশ্য সমীকরণ আছে। প্রতি বছর ২১ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বরের মধ্য়ে সূর্য নিরক্ষরেখার ওপর দিয়ে যায়। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় এটি জলবিষুব বা শারদ বিষুব। এই দিনে পৃথিবীর সর্বত্র দিন ও রাত প্রায় সমান হয়। এরপর উত্তর গোলার্ধে দিন ছোট হতে শুরু করে, সূর্যের আলো কমতে থাকে। অন্যদিকে দক্ষিণ গোলার্ধে দিন বড় হতে শুরু করে। অনেকের কাছে এটি কেবল একটি জ্যোতির্বিজ্ঞানের ঘটনা। কিন্তু মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই সময়টা অনেকের জন্য মানসিক ওঠাপড়ার সূচনা হয়ে উঠতে পারে।
আমাদের দেশের মতো উত্তর গোলার্ধের দেশগুলোয় জলবিষুবের পর দিনের আলো কমে যাওয়া সরাসরি প্রভাব ফেলে মস্তিষ্কের রসায়নে। সূর্যালোক কমলে সেরোটোনিন হরমোনের উৎপাদন কমে যায়, যা আমাদের মন ভালো রাখার প্রধান রাসায়নিক। একই সঙ্গে মেলাটোনিন হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, ফলে ঘুম ও জাগরণের স্বাভাবিক ছন্দ বিঘ্নিত হয়। এই দুই পরিবর্তনের ফলেই অনেকে শরৎ ও শীতে বিষণ্নতা, ক্লান্তি ও উদ্বেগ অনুভব করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে বলা হয় সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার বা এসএডি। বাংলাদেশে এই সমস্যা কম নয়। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, শীতকালে দেশে প্রায় ৪২ শতাংশ তরুণ শিক্ষার্থী মানসিকভাবে বিষণ্নতা অনুভব করেন, বিশেষত পরীক্ষার চাপ ও দিন ছোট হয়ে যাওয়ার কারণে। সেরোটোনিন হ্রাসের কারণে অনেকে অতিরিক্ত ঘুম, কার্বোহাইড্রেট-সমৃদ্ধ খাবারের প্রতি তীব্র আকর্ষণ, মনোযোগের ঘাটতি এবং দৈনন্দিন কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। কেউ কেউ আত্মসমালোচনা বা নেতিবাচক চিন্তার শিকার হন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কিছু সাংস্কৃতিক কারণও এই সমস্যাকে বাড়িয়ে তোলে। শীতকালে পারিবারিক অনুষ্ঠান ও উৎসবের আধিক্য থাকে; যারা একাকী বা বিষণ্ন, তাদের কাছে এই সময়টা আরও কষ্টের হয়ে ওঠে। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার ও সচেতনতার অভাব অনেককে সাহায্য নেওয়ার পথ থেকে বিরত রাখে। তবে সমাধানের উপায়ও সহজ। বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রথম ও প্রধান করণীয় হলো বাইরে বেরিয়ে পর্যাপ্ত সূর্যালোক গ্রহণ করা। সম্ভব না হলে উজ্জ্বল কৃত্রিম আলোর ব্যবহার, নিয়মিত ব্যায়াম এবং ঘুমের রুটিন ঠিক রাখা যেতে পারে। সিজনাল বিষণ্নতার লক্ষণ টানা দুই বছর একই সময়ে দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
জলবিষুবের পর দিন ছোট হওয়ার যে প্রভাব, তা ২০২৬ সালের বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আরও তীব্র ও জটিল রূপ নিয়েছে। দেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততার বিস্তার, নদীভাঙন ও অনিয়মিত বৃষ্টি কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতিই করছে না, মানুষের মনের গভীরে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে গড় তাপমাত্রা প্রতি এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে একজন প্রাপ্তবয়স্কের উদ্বেগজনিত ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ২১ শতাংশ বেড়ে যায় এবং উদ্বেগ ও বিষণ্নতা একসঙ্গে হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ২৪ শতাংশ বেড়ে যায়। বন্যার মতো ঘটনার সম্মুখীন হওয়া মানুষদের মধ্যে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের হার আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই সংকট সবচেয়ে বেশি কাঁপিয়ে দিচ্ছে তরুণ প্রজন্মকে। ঢাকার কিশোর-কিশোরীদের ওপর ২০২৬ সালে প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ৮৫ শতাংশ কিশোর জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, ৭৪ শতাংশ বিষণ্নতা অনুভব করেছে এবং ৬২ শতাংশ মনে করেছে যে, জলবায়ু পরিবর্তন তাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই প্রজন্ম বেড়ে উঠছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি হয়ে, যা তাদের মধ্যে ইকো-অ্যাংজাইটি বা জলবায়ু উদ্বেগ এবং সোলাস্টালজিয়া বা নিজের চেনা পরিবেশ হারানোর শোক তৈরি করছে।

জলবায়ু-বাধ্যতামূলক অভিবাসনও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা ও সুবর্ণচরে অভিবাসীদের ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, জোরপূর্বক স্থানচ্যুতি, বাড়ি ও জীবিকার ক্ষতি এবং নিজের ভিটেয় ফিরতে না পারার অনিশ্চয়তা তাদের মধ্যে তীব্র মানসিক চাপ, নিরাপত্তাহীনতা ও আবেগিক কষ্ট তৈরি করছে। সুবর্ণচরের জলবায়ু-অভিবাসীদের মানসিক স্বাস্থ্যের গড় স্কোর মাত্র ৩৪ দশমিক ২, যা অন্যান্য মাত্রার তুলনায় সবচেয়ে নিম্ন। একইভাবে যমুনা নদীর তীরে বসবাসকারী নদী-যাযাবর বেদে সম্প্রদায়ের মানুষেরা বছরে একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়ে এক ধরনের স্থানচ্যুতি-লুপে আটকে পড়ছেন, যা তাদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ, ক্লান্তি ও পরিচয়-বিভ্রাট তৈরি করছে।
এই পরিস্থিতিতে ২০২৬ সালের জলবিষুবকে কেবল একটি জ্যোতির্বিজ্ঞানের ঘটনা হিসেবে দেখা আর সম্ভব নয়। এটি এমন একটি সময়, যখন শরতের ছায়ার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে জলবায়ু-উদ্বেগের অন্ধকার। দেশের কোটি মানুষ, বিশেষত তরুণ, নারী, বয়স্ক ও বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী, একই সঙ্গে ঋতু পরিবর্তনের জৈবিক প্রভাব এবং জলবায়ু সংকটের অস্তিত্বগত ভয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

জলবিষুবের পর দিনের আলো কমে যাওয়ার প্রভাব কিশোর-কিশোরীদের বিকাশমান মস্তিষ্কে সবচেয়ে তীব্রভাবে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, শরৎকালে কিশোর-কিশোরীদের মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যক্রমে ধীরগতির তরঙ্গের প্রাধান্য বেড়ে যায়, যা মনোযোগ, স্মৃতি ও শেখার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। জলবিষুবের পর সূর্যালোক হ্রাস পেলে দেহঘড়ি বিঘ্নিত হয়, ফলে কিশোরদের ঘুমের সময়সূচি এলোমেলো হয়ে পড়ে এবং স্কুলে মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা হয়।
বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব আরও জটিল। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখের লেন্সের মাধ্যমে আলো প্রবেশের ক্ষমতা কমে যায়, ফলে মস্তিষ্কে সূর্যালোকের সংকেত পৌঁছাতে দেরি হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় শারীরিক সীমাবদ্ধতা, দীর্ঘমেয়াদি রোগ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, যা বয়স্কদের মৌসুমি বিষণ্নতার প্রতি আরও সংবেদনশীল করে তোলে। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, ৪৫ থেকে ৫২ শতাংশ বয়স্ক মানুষ বিষণ্নতার লক্ষণে ভুগছেন এবং জলবিষুব-পরবর্তী সময়ে এই হার আরও বাড়ে। সুবর্ণচর ও খুলনার বয়স্ক জলবায়ু-অভিবাসীদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যের গড় স্কোর মাত্র ৩৪ দশমিক ২। তাই বয়স্কদের জন্য এই সময়ে নিয়মিত সূর্যালোক গ্রহণ, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সম্ভব হলে হালকা ব্যায়াম অত্যন্ত জরুরি। ফলে জলবিষুব কেবল দিন-রাতের সমান হওয়ার দিন নয়; এটি আমাদের মনকে নিজের দিকে তাকানোর সুযোগও দেয়। শরতের এই পরিবর্তনকে বুঝে, নিজের ও প্রিয়জনের মানসিক যত্ন নিলে এই শরৎ ঋতুটিও সুস্থতার সঙ্গী হয়ে উঠতে পারে।
লেখক: চিকিৎসক, কাউন্সিলর ও সাকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার, ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার বিডি

লন্ডনের বিখ্যাত জায়গা ট্রাফালগার স্কয়ারের ‘ফোরথ প্লিন্থ’। সেখানে ১০ সেপ্টেম্বর সকালে উন্মোচিত হয়েছে এক নতুন ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য। যার নাম ‘লেডি ইন ব্লু’। আগামী দুই বছরের জন্য স্থান পাওয়া এই ভাস্কর্যটি তৈরি করেছেন নিউইয়র্কভিত্তিক জনপ্রিয় শিল্পী শাবালালা সেলফ।
২ ঘণ্টা আগে
বন্ধু মানে জীবন, সুখ-দুঃখের সঙ্গী, রক্তের সম্পর্কের চেয়ে আপন। কিন্তু আজ সেই বন্ধুত্বের সম্পর্ক ঢেকে যাচ্ছে মৃত্যুর মিছিলে। কুমিল্লায় মায়ের আইফোন হাতে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বেরিয়ে আর ঘরে ফেরেনি অপ্রতিম। এমন ঘটনা কি একটিই? না, আরও ঘটেছে। মনে প্রশ্ন জাগে, শুধু টাকা বা লোভই কি বন্ধুর প্রাণ কেড়ে নেওয়া
৫ ঘণ্টা আগে
চিকেনের সঙ্গে মধু আর মাখনের মেলবন্ধন—শুনতে একটু অদ্ভুত মনে হতে পারে। তবে মচমচে ভাজা চিকেনের সঙ্গে রসুন, মাখন ও মধুর মিষ্টি-ঝাল সস একবার মিশিয়ে দেখলেই বদলে যেতে পারে ধারণা। বাইরে ক্রিসপি আবরণ আর ভেতরে নরম চিকেনের সঙ্গে মিষ্টি স্বাদের এই সমন্বয় হানি বাটার চিকেনকে করে তুলেছে বেশ আকর্ষণীয়। কোরিয়ায়...
৭ ঘণ্টা আগে
ডায়েট চার্ট থেকে হোয়াইট পয়জন খ্যাত সাদা চিনি বাদ দিয়ে গুড় কিংবা মধু আপন করে নেওয়ার ট্রেন্ড এখন তুঙ্গে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, চিনির জায়গায় গুড় ব্যবহার করলেই কি সব স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানো সম্ভব? পুষ্টিবিজ্ঞানীরা কিন্তু বলছেন ভিন্নকথা। অনেকে মনে করেন, গুড় খেলে ওজন বাড়ে না কিংবা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে...
৯ ঘণ্টা আগে