Ajker Patrika

ইতিহাস ও সিনেমায় বিখ্যাত ফোরথ প্লিন্থ চত্বরে ‘লেডি ইন ব্লু’

ফিচার ডেস্ক
ইতিহাস ও সিনেমায় বিখ্যাত ফোরথ প্লিন্থ চত্বরে ‘লেডি ইন ব্লু’
সম্পূর্ণ নীল রঙের পোশাকে এক কৃষ্ণাঙ্গ নারীর দ্রুত হেঁটে যাওয়ার ভঙ্গি নিয়ে গড়ে তোলা এই ভাস্কর্যটি কোনো পরিচিত ঐতিহাসিক চরিত্র নয়। এটি এক সাধারণ নারীর প্রতিচ্ছবি। ছবি: সংগৃহীত

লন্ডনের বিখ্যাত জায়গা ট্রাফালগার স্কয়ারের ‘ফোরথ প্লিন্থ’। সেখানে ১০ সেপ্টেম্বর সকালে উন্মোচিত হয়েছে এক নতুন ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য। যার নাম ‘লেডি ইন ব্লু’। আগামী দুই বছরের জন্য স্থান পাওয়া এই ভাস্কর্যটি তৈরি করেছেন নিউইয়র্কভিত্তিক জনপ্রিয় শিল্পী শাবালালা সেলফ। ১৮৪১ সালে নির্মিত এই আয়তক্ষেত্রাকার খালি প্লিন্থটিতে বসানো ১৬তম শিল্পকর্ম এটি। সম্পূর্ণ নীল রঙের পোশাকে এক কৃষ্ণাঙ্গ নারীর দ্রুত হেঁটে যাওয়ার ভঙ্গি নিয়ে গড়ে তোলা এই ভাস্কর্যটি কোনো পরিচিত ঐতিহাসিক চরিত্র নয়। এটি এক সাধারণ নারীর প্রতিচ্ছবি। যা আধুনিক ও সাধারণ নারীদের শহরের পথচলাকে ফুটিয়ে তোলে।

কেন তৈরি করা হয়েছিল ফোরথ প্লিন্থ

এটি মূলত চতুর্থ উইলিয়ামের একটি অশ্বারোহী মূর্তি স্থাপনের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু তহবিলের অভাবে এটি খালিই থেকে যায়। ১৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এর ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক চলে। অবশেষে ১৯৯৮ সালে, রয়্যাল সোসাইটি ফর দ্য এনকারেজমেন্ট অফ আর্টস, ম্যানুফ্যাকচারস অ্যান্ড কমার্স (আরএসএ) প্লিন্থটিতে অস্থায়ীভাবে প্রদর্শনের জন্য তিনটি সমসাময়িক ভাস্কর্য তৈরির বরাত দেয়। এর কিছুদিন পরেই, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম ও ক্রীড়া বিষয়ক সেক্রেটারি অফ স্টেট ক্রিস স্মিথ, স্যার জন মর্টিমারকে এর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সরকারি শিল্প কমিশনার, সমালোচক এবং সাধারণ জনগণের মতামত সংগ্রহের জন্য দায়িত্ব দেন। লন্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ারের চতুর্থ প্লিন্থ-এ স্থাপিত প্রথম ভাস্কর্যটি শিল্পী মার্ক ওয়ালিঞ্জারের তৈরি ‘একে হোমোর’। ১৯৯৯ সালে এটি চতুর্থ প্লিন্থের সমসাময়িক শিল্পকর্ম প্রদর্শনের প্রকল্পের অংশ হিসেবে প্রথম উন্মোচন করা হয়। এটি ছিল যীশু খ্রিস্টের একটি লাইফ-সাইজ বা বাস্তব মানবাকৃতির ভাস্কর্য।

ভাস্কর্যের গঠন ও ঐতিহাসিক মেলবন্ধন

‘লেডি ইন ব্লু’ ভাস্কর্যটির অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এর সুদৃঢ় ও গতিশীল ভঙ্গি। ল্যাপিস লাজুলি নামক দুর্লভ খনিজ পাথর থেকে অনুপ্রাণিত গাঢ় নীল পোশাক, মানানসই জুতো, গহনা ও বিনুনি করা চুলে সজ্জিত এই নারীমূর্তিটি থমকে দাঁড়িয়ে নেই। সে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সামনের দিকে হেঁটে চলেছে। ভাস্কর্যটির গাঢ় নীল রঙ এবং এর অনন্য রূপকশৈলী ট্রাফালগার স্কয়ারের পেছনের ন্যাশনাল গ্যালারিতে সংরক্ষিত রেনেসাঁ যুগের বিখ্যাত পেইন্টিংগুলোর ব্যবহৃত আল্ট্রামারিন রঙের কথা মনে করিয়ে দেয়। এর মুখের অবয়ব আফ্রিকার ঐতিহাসিক ‘ইফে’ ব্রোঞ্জ মূর্তির সৌন্দর্যকে বহন করে।

লন্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ারের চতুর্থ প্লিন্থ-এ স্থাপিত প্রথম ভাস্কর্যটি শিল্পী মার্ক ওয়ালিঞ্জারের তৈরি ‘একে হোমোর’। ছবি: সংগৃহীত
লন্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ারের চতুর্থ প্লিন্থ-এ স্থাপিত প্রথম ভাস্কর্যটি শিল্পী মার্ক ওয়ালিঞ্জারের তৈরি ‘একে হোমোর’। ছবি: সংগৃহীত

কেন তৈরি করা হলো এই ভাস্কর্য

ট্রাফালগার স্কয়ারের আশেপাশের ঐতিহ্যবাহী ঐতিহাসিক ভাস্কর্যগুলো অতীতকে স্মরণ করিয়ে দেয়। সেখানে শাবালালা সেলফ মানুষের দৃষ্টিকে একটি যৌথ ও আশাবাদী ভবিষ্যতের দিকে চালিত করতে চেয়েছেন। শিল্পী মনে করেন, লন্ডনের প্রায় ১,৫০০টি মূর্তির মধ্যে কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের প্রতিনিধিত্ব করার মতো ভাস্কর্য হাতে গোনা কয়েকটি। তবে শুধু সামাজিক প্রতিনিধিত্ব বা ‘আইডেন্টিটি পলিটিক্স’-এর ফ্রেমে একে আটকে রাখা তাঁর উদ্দেশ্য নয়। শিল্পী সেলফের মতে, এই ভাস্কর্যটির মূল বার্তা হলো মানুষ যেন কোনো ব্যাখ্যা বা অজুহাত ছাড়াই নিজেদের সত্তাকে আপন করে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অনুভূতি পায়। এটি এমন এক সর্বজনীন সাধারণ নারী, যার স্বতঃস্ফূর্ত হাঁটার ভঙ্গি ও শক্তি যে কাউকেই নিজের জীবনযাত্রায় সাহস নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেবে।

শিল্পী শাবালালা সেলফ ও তাঁর শিল্পদর্শন

১৯৯০ সালে নিউ ইয়র্কের হারলেমে জন্মগ্রহণকারী শাবালালা সেলফ বর্তমানে শিল্পকলা বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় নাম। মোমা, গুগেনহেইম এবং উইটনি মিউজিয়ামের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানে তাঁর কাজ স্থান পেয়েছে। তাঁর শিল্পকর্মের মূল সুর হলো মানুষের দেহকে উদ্‌যাপন করা। মানুষকে নিজের দেহের ভেতরে আত্মবিশ্বাসী ও ক্ষমতাবান বোধ করানো। পাবলিক আর্ট বা উন্মুক্ত স্থানের শিল্পকর্ম নিয়ে কাজ করতে গিয়ে সেলফ বর্ণবাদের অভিজ্ঞতাও লাভ করেছেন। ২০২২ সালে তাঁর তৈরি কৃষ্ণাঙ্গ নারীর অপর একটি ভাস্কর্য ‘সিটেড’ ইংল্যান্ডের বেক্সহিল-অন-সি শহরে বর্ণবাদীদের হাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাতে সাদা স্প্রে রঙ করে দেওয়া হয়। তবে পরে স্থানীয় বাসিন্দারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তা পরিষ্কার করেন। সেই তিক্ত ঘটনাকে অতিক্রম করে সেলফ ‘লেডি ইন ব্লু’ নিয়ে ট্রাফালগার স্কয়ারে এসেছেন। সেলফ বিশ্বাস করেন, চমৎকার শিল্পকর্মের শক্তি লুকিয়ে থাকে তার সহজবোধ্যতায়। জটিল কোনো তাত্ত্বিক বিতর্ক না ছড়িয়ে এটি যেন সরাসরি মানুষের হৃদয় ছুঁতে পারে। ‘লেডি ইন ব্লু’-এর মাধ্যমে তিনি অতীত বিষাদ বা বর্ণবাদী ঘৃণাকে পেছনে ফেলে একটি বর্ণিল, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং মুক্ত ভবিষ্যতের দিকে সবাইকে স্বাগত জানিয়েছেন।

‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে’ সিনেমার একটি দৃশ্যে আমরীশ পুরীকে ফোরথ প্লিন্থের একালায় ফ্রেমে বন্দী করা হয়। ছবি: সংগৃহীত
‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে’ সিনেমার একটি দৃশ্যে আমরীশ পুরীকে ফোরথ প্লিন্থের একালায় ফ্রেমে বন্দী করা হয়। ছবি: সংগৃহীত

কোথায় দেখেছেন ফোরথ প্লিন্থ

বিখ্যাত এই জায়গাটি কেবল চারুকলার উন্মুক্ত মঞ্চ নয়। বৈশ্বিক পপ কালচার ও চলচ্চিত্র ইতিহাসের এক জীবন্ত স্মারক এই জায়গাটি। একপাশে ১৯ শতকের ধ্রুপদী স্থাপত্য আর অন্যদিকে আধুনিক শিল্পকর্মের মেলবন্ধন ঘটানো এই প্লাজাটি রূপালী পর্দার অসংখ্য কালজয়ী মুহূর্তের সাক্ষী। হলিউডের ব্লকবাস্টার থেকে শুরু করে বলিউডের মহাকাব্যিক সিনেমা, সবখানেই ফোরথ প্লিন্থ ও ট্রাফালগার স্কয়ারের উপস্থিতি অনবদ্য। ‘হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ডেথলি হ্যালোস–পার্ট ২ ’-এ ডেথ ইটারদের তাণ্ডব ও সিনেমার বিশ্ব প্রিমিয়ার, কিংবা ‘এজ অব টুয়েমরো’-তে টম ক্রুজকে নিয়ে সামরিক আরএএফ পুমা হেলিকপ্টারের ফোরথ প্লিন্থের ঠিক পাশেই রোমাঞ্চকর অবতরণ। এই দৃশ্যগুলো এই স্থানটিকে দিয়েছে এক অ্যাডভেঞ্চারাস পরিচয়। আবার ‘ওয়ান্ডার ওম্যান’-এর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিজয় উৎসব কিংবা ‘দ্য দা ভিঞ্চি কোড’-এর রহস্যময় ট্রাভেল শটেও ফ্রেমবন্দি হয়েছে এই চত্বর। ব্রিটিশ সায়েন্স-ফিকশন সিরিজ ‘ডক্টর হু’-এর ৫০ বছর পূর্তিতেও হেলিকপ্টারে করে টিএআরডিআইএস এনে এই প্লিন্থের পাশেই নামানো হয়। শুধু হলিউড নয়, ভারতীয় উপমহাদেশের দর্শকের কাছেও এটি এক আবেগের নাম। ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে' সিনেমার একটি দৃশ্যে আমরীশ পুরীকে ফোরথ প্লিন্থের একালায় ফ্রেমে বন্দী করা হয়। আবার ‘এক থা টাইগার’-এর হাই-ভোল্টেজ অ্যাকশন দৃশ্যও এখানে শুট করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ট্রাফালগার স্কয়ারের ফোরথ প্লিন্থ বিশ্ব বিনোদন জগতেরও অন্যতম পরিচিত ও রোমাঞ্চকর একটি জায়গা।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, সিএনএন, বিবিসি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত