Ajker Patrika

নুনচি: চোখ দিয়ে মানুষের মন পড়ার ‘কোরিয়ান জাদু’

ফিচার ডেস্ক
নুনচি: চোখ দিয়ে মানুষের মন পড়ার ‘কোরিয়ান জাদু’
নুনচি চর্চার মূলকথা, কোনো পরিস্থিতি দেখার আগে নিজের মনে থাকা পুরোনো ধারণাগুলো ঝেড়ে ফেলুন। ছবি: পেক্সেলস

‘নুনচি’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো ‘চোখের মাপ’। এটি মূলত কোনো একক ব্যক্তি নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতির সামগ্রিক পরিবেশ এবং মানুষের অনুভূতি দ্রুত বুঝতে পারার ক্ষমতা। কোরিয়াতে শিশুদের মাত্র তিন বছর বয়স থেকেই এই শিক্ষা দেওয়া হয়। কোনো শিশু যদি পরিবেশের সাপেক্ষে বেমানান আচরণ করে, তবে কোরীয় অভিভাবকেরা তাকে শাসন করবেন। তাঁরা বলেন, ‘তোমার কেন কোনো নুনচি নেই?’ এটি কেবল আদবকেতা নয়, বরং চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার একটি অনন্য দক্ষতা। কোরীয়-আমেরিকান সাংবাদিক ও লেখক ইউনি হংয়ের আলোচিত বই ‘দ্য পাওয়ার অব নুনচি: দ্য কোরিয়ান সিক্রেট টু হ্যাপিনেস অ্যান্ড সাকসেস’। পাঁচ হাজার বছরের প্রাচীন কোরীয় জীবনদর্শন নুনচিকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে এই বই। লেখক ইউনি হং এই বইয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে কেবল পরিস্থিতির গভীর পর্যবেক্ষণ বা নুনচি ব্যবহার করে একজন মানুষ তার ব্যক্তিগত সুখ এবং পেশাগত সাফল্য নিশ্চিত করতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক মিরাকল ও নুনচি

ইউনি হং তাঁর বইয়ে একটি চমৎকার তথ্য দিয়েছেন। মাত্র ৭০ বছর আগে কোরীয় যুদ্ধের পর দক্ষিণ কোরিয়া ছিল বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ, যাদের কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল না। কিন্তু কয়েক প্রজন্মের ব্যবধানে আজ তারা বিশ্বের অন্যতম ধনী এবং প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এই উন্নতির পেছনে নুনচি একটি বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। অন্য জাতির দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রয়োজনগুলো বুঝতে পারা এবং সেই অনুযায়ী নিজেদের পরিকল্পনা বদলে ফেলার ক্ষমতা বা ‘দ্রুত নুনচি’ তাদের সফল করেছে।

যারা লাজুক বা অন্তর্মুখী, তাদের জন্য নুনচি একটি বড় শক্তি হতে পারে।
যারা লাজুক বা অন্তর্মুখী, তাদের জন্য নুনচি একটি বড় শক্তি হতে পারে।

অন্তর্মুখীদের জন্য এক মহাশক্তি

যারা লাজুক বা অন্তর্মুখী, তাদের জন্য নুনচি একটি বড় শক্তি হতে পারে। ইউনি হং মনে করেন, নুনচি মূলত অন্যের কথা মন দিয়ে শোনা এবং বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার বিষয়। এটি সামাজিক উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তা কাটাতে সাহায্য করে। পশ্চিমা বিশ্বে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও নুনচি সামাজিক ঐক্য এবং সমষ্টিগত সম্প্রীতির ওপর জোর দেয়। এটি মানুষের মন পড়ার কোনো অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা নয়, বরং পরিবেশের তথ্যগুলো ব্যবহার করে সবার জন্য স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতি তৈরির একটি বিজ্ঞান।

আলোচনায় নীরবতার শক্তি

বইটির একটি বিশেষ অংশ হলো আলোচনায় বা দর-কষাকষিতে নুনচির ব্যবহার। ইউনি হংয়ের মতে, সাফল্যের একটি বড় নিয়ম হলো ‘চুপ থাকার কোনো ভালো সুযোগই হারাবেন না’। বইটিতে ‘থিয়া’ নামের এক নারীর উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। থিয়া যখন তাঁর বসের কাছে বেতন বাড়ানোর কথা বলতে যান, তখন তিনি কৌশলে নীরবতা অবলম্বন করেন। তাঁর বস যখন অস্বস্তিকর নীরবতা কাটাতে অনর্গল কথা বলতে শুরু করেন, তখন থিয়া না চাইতেই তাঁর বসের কাছ থেকে জেনে নেন, কোম্পানির বেতন বাড়ানোর সামর্থ্য আসলে কতটুকু। শেষ পর্যন্ত কোনো তর্কে না জড়িয়েই থিয়া ২০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধিতে সফল হন। ইউনি হং মনে করেন, নীরবতা আপনাকে আলোচনার টেবিলে অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে রাখে।

ইউনি হং তাঁর বইয়ে লিখেছেন, বিশ্বের অন্যতম ধনী এবং প্রযুক্তিগতভাবে উন্নতির পেছনে নুনচি একটি বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। ছবি: পেক্সেলস
ইউনি হং তাঁর বইয়ে লিখেছেন, বিশ্বের অন্যতম ধনী এবং প্রযুক্তিগতভাবে উন্নতির পেছনে নুনচি একটি বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। ছবি: পেক্সেলস

নুনচি চর্চার মূল কথা

পূর্বধারণা বর্জন: কোনো পরিস্থিতি দেখার আগে নিজের মনে থাকা পুরোনো ধারণাগুলো ঝেড়ে ফেলুন।

লাইনের অন্তরালে পড়া: মানুষ সব সময় মুখে যা বলে, তা সত্য নয়। তাদের অঙ্গভঙ্গি এবং চোখের ভাষা বুঝতে শিখুন।

অনুপস্থিত শব্দগুলোর গুরুত্ব: কোরিয়ার মতো ‘হাই কনটেক্সট’ সমাজে যা বলা হচ্ছে না, তা বলা শব্দের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ইউনি হংয়ের এই বই আমাদের শেখায়, আলোচনার টেবিলে উচ্চকণ্ঠ ব্যক্তিই সব সময় জয়ী হয় না। বরং যে ব্যক্তি ধৈর্য ধরে পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করে এবং অন্যের অনুভূতি বুঝতে পারে, সেই দীর্ঘ মেয়াদে সফল হয়। নুনচি মূলত এমন এক দক্ষতা, যা আপনাকে পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেকে বদলে নিতে শেখায়, যাতে আপনি সব সময় বর্তমান সময়ে সচেতন থাকতে পারেন।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম, সিএনবিসি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত