Ajker Patrika

ঘুমের প্যারামিটারে কোন মহাদেশের অবস্থান কোথায়, কারা কম ঘুমায়, কারা বেশি

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা 
ঘুমের প্যারামিটারে কোন মহাদেশের অবস্থান কোথায়, কারা কম ঘুমায়, কারা বেশি
বিশ্বের বেশি ঘুমানো দেশগুলোর তালিকায় একচ্ছত্র আধিপত্য ইউরোপের, বিশেষ করে উত্তর ও পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর। প্রতীকী ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি করা।

আপনার বন্ধুত্ব কার সঙ্গে বেশি—বালিশ, নাকি যান্ত্রিক ব্যস্ততা? একুশ শতকের দ্রুতগতির পৃথিবীতে ‘ঘুম’ যেন এক বিলাসিতা। আমরা যখন উন্নত ক্যারিয়ার আর যান্ত্রিক উন্নতির পেছনে ছুটছি, তখন নীরবে আমাদের স্বাস্থ্য কেড়ে নিচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি অনিদ্রা। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, বিশ্বের সব প্রান্তের মানুষ একইভাবে এই অনিদ্রার শিকার নয়। কেউ হয়তো গভীর ঘুমে শান্তির রাত কাটাচ্ছে, আবার কেউ সূর্য ওঠার আগেই কর্মস্থলে ছুটছে মাত্র ৫ থেকে ৬ ঘণ্টার কাঁচা ঘুম চোখে নিয়ে। বৈশ্বিক ঘুমের এই মানচিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মহাদেশভেদে মানুষের জীবনযাত্রা আর সংস্কৃতি তাদের ঘুমের ধরনে এক বিশাল পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। দেখে নিন, কোনো মহাদেশের মানুষ ‘ঘুমকাতুরে’ আর কারা ‘অনিদ্রার শিকার’।

ঘুমের স্বর্গরাজ্য যখন পশ্চিমের দেশগুলো

বিশ্বের বেশি ঘুমানো দেশগুলোর তালিকায় একচ্ছত্র আধিপত্য ইউরোপের। বিশেষ করে উত্তর ও পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর। নেদারল্যান্ডস, ফিনল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে গড় ঘুমের সময় ৭ ঘণ্টা ২০ মিনিটের বেশি। সেসব দেশে কাজের চেয়ে ব্যক্তিগত জীবন এবং মানসিক প্রশান্তিকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। নেদারল্যান্ডসের মানুষের গড় ঘুমের সময় ৭ ঘণ্টা ২৪ মিনিট। এ ছাড়া সুইডেনের মতো দেশগুলোতে কাজের সময় সীমিত এবং ছুটি বেশি। এমনকি আয়ারল্যান্ড বা ফ্রান্সেও সামাজিক নিরাপত্তা আর উন্নত জীবনযাত্রার মান মানুষকে দুশ্চিন্তামুক্ত গভীর ঘুমের সুযোগ করে দেয়। তবে পূর্ব ইউরোপে রাশিয়ার মতো দেশগুলোতে আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণে ঘুমের সময় কিছুটা কম। রাশিয়ায় মানুষের ঘুমের গর সময় ৬ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় পারের শান্তি

প্রশান্ত মহাসাগরের ওশেনিয়া অঞ্চলের প্রধান দুই দেশ নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া ঘুমের দৌড়ে রয়েছে সবার শীর্ষে। এই দুটি দেশের মানুষের ঘুমের গড় যথাক্রমে ৭ ঘণ্টা ২৭ মিনিট এবং ৭ ঘণ্টা ২০ মিনিট। এই অঞ্চলের দেশগুলোতে আউটডোর অ্যাকটিভিটি এবং পারিবারিক সময়কে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হয়। বিশেষ করে নিউজিল্যান্ডের অধিবাসীরা বিশ্বের অন্যতম সুখী এবং নিরুপদ্রব ঘুমের অধিকারী জাতি হিসেবে পরিচিত।

উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা

আমেরিকা মহাদেশের দেশগুলোতে ঘুমের বেশ তারতম্য দেখা যায়। কানাডার মানুষ গড়ে ঘুমায় ৭ ঘণ্টা ১১ মিনিট এবং যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ ৭ ঘণ্টা ৬ মিনিট। এদের স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ায় ঘুমের গড় সময় বৈশ্বিক গড়ের কাছাকাছি।

অন্যদিকে, লাতিন বা দক্ষিণ আমেরিকার চিত্র ভিন্ন। ব্রাজিলের মানুষ গড়ে ৬ ঘণ্টা ৪০ মিনিট ও মেক্সিকোর মানুষ গড়ে ৬ ঘণ্টা ৩৭ মিনিট ঘুমায়। এই দেশগুলোতে যানজট, দীর্ঘ যাতায়াত এবং একাধিক কর্মস্থলে কাজ করার চাপ মানুষের ঘুমের সময় কেড়ে নিচ্ছে। এখানে রাত জেগে সামাজিক মেলামেশার সংস্কৃতিও ঘুমের সময়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

অনিদ্রার এপিসেন্টার প্রাচ্য

পুরো বিশ্বে কম ঘুমানো দেশগুলোর তালিকায় ওপরের দিকে রয়েছে এশিয়ার দেশগুলো। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলোতে মানুষ ৬ ঘণ্টার কম ঘুমায়। পূর্ব এশিয়ার দেশ জাপানে মানুষ গড়ে ৫ ঘণ্টা ৫২ মিনিট ঘুমায়। দক্ষিণ কোরিয়ায় সেই সময় ৬ ঘণ্টা ২ মিনিট—এরা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ঘুম বঞ্চিত দেশের মানুষ। দেশটির তীব্র কর্মব্যস্ততা এবং প্রাতিষ্ঠানিক চাপ মানুষকে রোবটের মতো কাজ করতে বাধ্য করে। এদিকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ভারতে মানুষ গড়ে ৬ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট ঘুমায়। ইন্দোনেশিয়ায় ৬ ঘণ্টা ২৫ মিনিট এবং সিঙ্গাপুরে ৬ ঘণ্টা ৩৪ মিনিট ঘুমের গড় সময়। প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার, স্মার্টফোনের নেশা এবং প্রতিযোগিতামূলক ক্যারিয়ার এই অঞ্চলের মানুষের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কুয়েতে মানুষের ঘুমের গড় সময় ৬ ঘণ্টা ১৫ মিনিট। কাতার-সৌদি আরবের মতো দেশগুলোতে তীব্র গরম এবং কাজের ধরনের কারণে মানুষ অনেক দেরিতে ঘুমাতে যায়, যার প্রভাব পড়ে মোট ঘুমের সময়ের ওপর।

অনিদ্রার এই বৈশ্বিক সংকট শুধু ক্লান্তির বিষয় নয়, এটি সরাসরি আমাদের হৃদ্‌রোগ, মানসিক অবসাদ আর কর্মক্ষমতার সঙ্গে জড়িত। ইউরোপ বা ওশেনিয়ার দেশগুলো আমাদের শেখাচ্ছে, উৎপাদনশীল হওয়ার মানে এই নয় যে আপনাকে রাতের ঘুম বিসর্জন দিতে হবে। দিনের শেষে বালিশের সঙ্গে আপনার সখ্য কতটা গভীর, তার ওপর নির্ভর করছে ভবিষ্যতের সুস্থতা। তাই আজ রাত থেকে কি একটু দ্রুত ঘুমাতে যাবেন? ভেবে দেখুন।

সূত্র: ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ, স্ট্যাটিস্টা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত