সবুজ ছাদের শহরগুলো

একটি আধুনিক শহরের ওপর থেকে নিচের দিকে তাকালে সাধারণত যা নজরে পড়ে তা হলো, ধূসর রঙের একচ্ছত্র আধিপত্য। ইট, সুরকি, পিচ, নুড়ি আর ধাতুর ছাদের ধূসর রং। কিন্তু বিশ্বের হাতে গোনা কয়েকটি শহর এই চেনা ছবিটা বদলে দিচ্ছে। সেখানকার দালানের ছাদগুলো এখন ঘাস, বুনো ফুল আর রং-বেরঙের বাগানে জীবন্ত। এসব ছাদবাগান শহর ঠান্ডা রাখছে, বৃষ্টির অতিরিক্ত পানি শুষে নিচ্ছে এবং কংক্রিটের রাজ্যে প্রকৃতিকে দিচ্ছে এক চিলতে মাথা গোঁজার ঠাঁই। শহরের ছাদজুড়ে এই সবুজ বিপ্লব বা গ্রিন রুফ নেটওয়ার্ক এখন নগর-পরিকল্পনার অন্যতম বিশ্বব্যাপী ট্রেন্ড। বিশ্বজুড়ে ছাদবাগান ও গ্রিন রুফে শীর্ষে থাকা শহরগুলোর অর্জন, কৌশল এবং নগর নীতিটা একটু ব্যতিক্রম।
গ্রিন রুফ চ্যাম্পিয়ন সুইজারল্যান্ড
সুইজারল্যান্ডের মাঝারি আকারের শহর বাসেল বিশ্বমানের র্যাঙ্কিংয়ে সবার ওপরে। পুরো বিশ্বকে পেছনে ফেলে ছাদবাগানের শীর্ষস্থান দখল করে নিয়েছে শহরটি। বাসেল শহরে প্রতি বাসিন্দার বিপরীতে গড়ে ৫ দশমিক ৭১ বর্গমিটার গ্রিন রুফ রয়েছে। এটি বিশ্বের যেকোনো শহরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০০২ সাল থেকে বাসেল শহরের আবাসন আইনে সব নতুন সমতল ছাদে সবুজ বাগান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ২০০৬ সাল থেকে শহরটিতে প্রতিবছর গড়ে ৮০ হাজার বর্গমিটার সবুজ ছাদ যুক্ত হচ্ছে। ২০০৬ সালে শহরের ২৩ শতাংশ সমতল ছাদ সবুজ ছিল। এই সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৪০ শতাংশে গিয়ে পৌঁছেছে। তুলনামূলকভাবে জার্মানির জাতীয় গড়ের চেয়ে চার গুণ বেশি প্রতি-মানুষ গ্রিন রুফ রয়েছে বাসেলে।
জার্মানির সবুজ ছাদ নীতি
জার্মানিতে ছাদবাগান নীতি ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়েছে। দেশটির বড় শহরগুলো একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে সবুজ ছাদের সংখ্যা বাড়াচ্ছে। জার্মানির ছাদবাগানের ক্ষেত্রে সেরা শহর হিসেবে ধরা হয় মূলত স্টুটগার্ট এবং হামবুর্গকে। তবে ঐতিহাসিকভাবে এবং ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে স্টুটগার্টকে ইউরোপের ‘সবুজ ছাদের রাজধানী’ বলা হয়। প্রতি বাসিন্দার বিপরীতে ৪ দশমিক ১ বর্গমিটার গ্রিন রুফ নিয়ে জার্মানিতে শীর্ষে রয়েছে শহরটি, যা দেশটির রাজধানী বার্লিনের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। ফ্রাঙ্কফুর্টে রয়েছে ১ দশমিক ৯ বর্গমিটার, নুরেমবার্গ-এ ১ দশমিক ৬, হ্যানোভার-এ ১ দশমিক ৬ এবং ডুসেলডর্ফ-এ ১ দশমিক ৪ বর্গমিটার সবুজ ছাদ রয়েছে প্রতি নাগরিকের বিপরীতে। জার্মানির ৭২ শতাংশ বড় শহর গ্রিন রুফ থাকলে ভবনের বর্জ্য পানি বা ওয়াটার বিল কমিয়ে দেয়। ফলে মালিকদের কাছে ছাদবাগান তৈরি আর্থিক প্রণোদনা হিসেবে কাজ করে। পুরো জার্মানিতে বর্তমানে প্রায় ১২ কোটি বর্গমিটার সবুজ ছাদ রয়েছে।

লন্ডনের স্কাই লাইন ও সিঙ্গাপুরের ভার্টিক্যাল গার্ডেন
বড় মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে ভূমির স্বল্পতা কাটাতে ছাদই হয়ে উঠেছে একমাত্র ভরসা। গ্রেটার লন্ডনে প্রায় ১৫ লাখ বর্গমিটার গ্রিন রুফ রয়েছে। আকর্ষণীয় বিষয় হলো, সেন্ট্রাল বিজনেস জোনে ঘনবসতি ও ভূমির অভাব বেশি থাকায় সেখানে প্রতি অধিবাসীর জন্য ১ দশমিক ২১ বর্গমিটার সবুজ ছাদ গড়ে তোলা হয়েছে। ২০০৮ সালে লন্ডন শহর প্রথম তাদের নগর-পরিকল্পনায় এটি বাধ্যতামূলক করে। ট্রপিক্যাল সিঙ্গাপুরে সবুজ কেবল ছাদে থেমে নেই। সেখানে ভবনের দেওয়াল বেয়ে উঠেছে উদ্ভিদ। সিঙ্গাপুরে প্রায় ১৯৩ হেক্টর বা ১৯ লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার জুড়ে স্কাই রাইজ গ্রিনারি রয়েছে, যা লন্ডনের চেয়েও বড়। পুরো সিঙ্গাপুর সিটি-স্টেটের প্রায় ৪০ শতাংশ এলাকা প্রাকৃতিক সবুজে ঢাকা।
টরন্টোর গ্রিন রুফ পরীক্ষা এবং সাম্প্রতিক মোড়
উত্তর আমেরিকায় প্রথম শহর হিসেবে ২০০৯ সালে কানাডার অন্টারিও প্রদেশের রাজধানী টরন্টো নতুন ভবনে ছাদবাগান বাধ্যতামূলক করেছিল। ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে টরন্টোতে ১ হাজারেরও বেশি ভবনে মোট ১০ লাখ বর্গমিটারের বেশি গ্রিন রুফ নির্মিত হয়। দীর্ঘ ১৫ বছর সফলভাবে চলার পর ২০২৫ সালে ওন্টারিও প্রাদেশিক সরকার দ্রুত আবাসন নির্মাণের অজুহাতে গ্রিন রুফের বাধ্যতামূলক নিয়মটি বাতিল করেছে। ফলে এক দশকের বেশি সময় ধরে শহর সবুজ করা সেই আইনটি এখন ইতিহাস।
নীতির জোরেই গড়ে ওঠে সবুজ শহর
কংক্রিটের দেয়াল আর রাজপথের কোলাহল এড়িয়ে শহরের আসল জীবন আর সতেজ বাতাস এখন ছাদের ওপর ডালপালা মেলছে। হয়তো আপনার শহরের পরবর্তী সুন্দর পার্কটি গড়ে উঠবে আপনার মাথার ওপরের ছাদটিতেই। জনপ্রতি ছাদবাগানের দিক থেকে বাসেল এবং স্টুটগার্ট বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে। আবার বিশাল আয়তনের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে মিউনিখ ও সিঙ্গাপুর। বিশ্বের যেসব শহরের আকাশসীমা ধীরে ধীরে সবুজ হয়ে উঠছে, তা দুর্ঘটনাবশত হয়নি। এটি সম্ভব হয়েছে নগর পরিকল্পনাবিদের সঠিক পরিকল্পনা এবং সরকারের কড়া আইনের ফলে। ২০১০ সাল থেকে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের সব নতুন ভবনে গ্রিন রুফ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সান ফ্রান্সিসকোতে নতুন ভবনের ছাদে ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ অংশ সোলার প্যানেল অথবা সবুজ বাগান কিংবা উভয়ের মিশ্রণে ঢাকা বাধ্যতামূলক। পোর্টল্যান্ড ও হামবুর্গে ছাদবাগান তৈরির জন্য স্কয়ার ফুটে নগদ অর্থ ও ভর্তুকি সহায়তা দেয়।
সূত্র: ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ










