Ajker Patrika

লুই আমলে নিখোঁজ নৌ অভিযান রহস্যে নতুন আলো ফেলল বিরল প্রেমপত্র

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০০: ০০
লুই আমলে নিখোঁজ নৌ অভিযান রহস্যে নতুন আলো ফেলল বিরল প্রেমপত্র
১৮১৭ সালের একটি চিত্রকর্ম থেকে দেখা যাচ্ছে ফরাসি নৌ-কর্মকর্তা লা পেরুজ ষোড়শ লুই-এর কাছ থেকে বিশ্বভ্রমণ অভিযানের নির্দেশ গ্রহণ করছেন। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

১৭৯৩ সালের ২১ জানুয়ারি ফ্রান্সের রাজা ষোড়শ লুইকে গিলোটিনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, মৃত্যুর আগে তিনি জানতে চেয়েছিলেন, ‘মঁসিয়ে দ্য লা পেরুজের কোনো খবর আছে?’

রাজা তখনো জানতেন না, তিন বছর আগে সমুদ্রযাত্রায় বেরিয়ে নিখোঁজ হওয়া ফরাসি নৌ-অভিযাত্রী লা পেরুজের ভাগ্যে কী ঘটেছে। এবার সেই রহস্যময় অভিযানের নতুন তথ্য সামনে এসেছে বিরল কিছু ব্যক্তিগত চিঠির মাধ্যমে। চিঠিগুলো লিখেছিলেন লা পেরুজের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই অভিযানের অপর সদস্য ফরাসি বিজ্ঞানী জ্যঁ-আন্দ্রে মঙ্গেজ। ১৭৮৮ সালে জাহাজ থেকে মঙ্গেজের লেখা চিঠিগুলোতে উঠে এসেছে অভিযানের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি এক অভিজাত পরিবারের বিবাহিত নারীর প্রতি তাঁর গভীর আবেগের কথাও।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানায়, বই ও পাণ্ডুলিপি বিশেষজ্ঞ লুদোভিক মিরাঁ চিঠিগুলোকে ‘অলৌকিক আবিষ্কার’ বলে অভিহিত করেছেন। আগামী ১৭ নভেম্বর প্যারিসের হোটেল দ্রু-তে নিলামকারী প্রতিষ্ঠান দাগ-এর আয়োজিত নিলামে চিঠিগুলো বিক্রি হওয়ার কথা। এগুলোর সম্ভাব্য মূল্য ধরা হয়েছে ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ইউরো।

১৭৮৫ সালের ১ আগস্ট ফ্রান্সের ব্রেস্ত বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেছিল লা পেরুজের নেতৃত্বাধীন দুটি জাহাজ—লা বুসোল ও লাস্ত্রোলাব। মোট ২২৫ জন নাবিক, কর্মকর্তা ও বিজ্ঞানী ছিলেন এই অভিযানে। ব্রিটিশ অভিযাত্রী ক্যাপ্টেন জেমস কুকের বৈজ্ঞানিক সাফল্যের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নতুন বাণিজ্যপথ অনুসন্ধান ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার বোটানি বে অঞ্চলে ব্রিটিশদের স্থায়ী ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনা সম্পর্কেও নিশ্চিত হতে চেয়েছিল ফ্রান্স।

প্রায় তিন বছর ধরে আলাস্কা, ক্যালিফোর্নিয়া, এশিয়া, রাশিয়া ও সামোয়া ঘুরে বিভিন্ন প্রতিবেদন পাঠিয়েছিল অভিযানের জাহাজ দুটি। তবে সামোয়ায় এক সংঘর্ষে লাস্ত্রোলাবের ক্যাপ্টেনসহ ১১ জন নিহত হন। ১৭৮৮ সালের মার্চে অস্ট্রেলিয়ার বোটানি বে ছেড়ে যাওয়ার পর জাহাজ দুটির সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।

ধারণা করা হয়, কয়েক মাস পর সলোমন দ্বীপপুঞ্জের পূর্বে ভানিকোরো দ্বীপের প্রবালপ্রাচীরে ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়ে জাহাজ দুটি ডুবে যায়। ১৮২৬ ও ১৯৬৪ সালে ধ্বংসাবশেষের সন্ধান মিললেও ২০০৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সেগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট বিবরণ আজও অজানা।

নতুন আবিষ্কৃত চিঠিগুলো মঙ্গেজ লিখেছিলেন নরমঁদির রুয়াঁ শহরের অভিজাত পরিবারের মেয়ে লুইজ ভিক্তোয়ার ল্য ক্লুস্তিয়েকে। তাঁর বিয়ে মেনে নিতে না পারার বেদনা এবং অতীত আচরণের জন্য অনুশোচনা চিঠিগুলোতে স্পষ্ট। মিরাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গেজ বারবার লিখেছেন, ফিরে এসে তিনি আরও ভালো মানুষ হয়ে উঠবেন।

চিঠিতে মঙ্গেজ জানিয়েছেন, খ্যাতির আকাঙ্ক্ষা ও নতুন জ্ঞান অর্জনের ইচ্ছা তাঁকে অভিযানে টেনেছিল। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েনও বিপজ্জনক যাত্রায় তাঁর যোগ দেওয়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছিল। শেষ চিঠিতে তিনি অভিযানের দুঃখজনক পরিণতির কথা জানিয়ে বাড়ি ফেরার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছিলেন।

১৮২১ সালে মারা যান ল্য ক্লুস্তিয়ে। তিনি জীবদ্দশায় মঙ্গেজ কিংবা অভিযানের পরিণতি জানতে পারেননি। তবু চিঠিগুলো যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন। উনিশ শতকের একটি সাধারণ চিত্রখোদাইয়ের বই বিক্রির প্রস্তুতির সময় সেগুলো খুঁজে পান নিলামকারী বেনোয়া দেরুয়িনো। তাঁর ধারণা, ব্যক্তিগত ও প্রেমঘন বিষয়বস্তু প্রকাশিত হওয়ার আশঙ্কায় চিঠিগুলো গোপন রাখা হয়েছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চিঠিগুলো শুধু নিখোঁজ নৌ-অভিযানের ইতিহাস নয়, অষ্টাদশ শতাব্দীর দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় বিজ্ঞানীদের মানসিক সংগ্রাম, ভয়, শোক ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক বোঝারও এক বিরল সুযোগ।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত