জানুন যুক্তরাজ্যের শীতকালীন উৎসবের অন্দরে কী থাকে

ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা পিছিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইউরোপজুড়ে নেমে আসে দীর্ঘ ও কনকনে রাতের চাদর। তবে ব্রিটিশরা শীতের এই অন্ধকার আর নিস্তব্ধতাকে হতাশায় মোড়াতে দেয় না। এই সময়টাকে তারা জাদুকরী আলো, রূপকথার আবহ আর প্রকৃতির সান্নিধ্যে সেটিকে বরণ করে নেয়। পালন করে দারুণ কিছু উৎসব। শীতের এই সময়টা যেন পরিবার নিয়ে ঘর ছেড়ে একটু অন্যরকম পৃথিবীর খোঁজে বেরিয়ে পড়ার মোক্ষম সময়। যুক্তরাজ্যের হরেক রকম বৈচিত্র্যময় এমন কিছু উৎসব আছে যেখানে ইতিহাস, সংস্কৃতি আর প্রকৃতির মিতালি একাকার হয়ে গেছে।
ফাসকালির বনের ঘড়ির কাঁটা ও জাদুকরী ফরেস্ট
স্কটল্যান্ডের পিটলোচ্রির ফাসকালি ফরেস্টে পা রাখলেই মনে হবে কোনো টাইম মেশিনের ভেতর ঢুকে পড়েছেন। স্থানীয় লোককথা বলে, এই জঙ্গলটি নাকি প্রতি ২৫ বছরে মানুষের জীবনের এক ঘণ্টা সময় চুরি করে নেয়! আর এই রহস্যকে ঘিরেই স্কটল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শরৎকালীন আয়োজন দ্য এনচ্যান্টেড ফরেস্ট-এর ২৫ বছর পূর্তি উদ্যাপিত হয়েছে ‘স্টপ দ্য ক্লক: দ্য ২৫থ আওয়ার’ থিমে। জিউয়েল-হিউড বা রত্নখচিত বনের পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে যখন কানে বাজে কাল্পনিক সুর আর চোখে পড়ে মিচড়ে যাওয়া অদ্ভুত সব ঘড়ি, তখন মনে হবে রূপকথার কোনো পাতায় হারিয়ে গেছেন। মূলত মানুষকে প্রকৃতির কাছাকাছি আনতে এবং দীর্ঘ রাতের বিষণ্নতা কাটিয়ে একটি শৈল্পিক আবহ তৈরি করতেই এই অনন্য আয়োজন।

নর্থ পেনাইনসের নক্ষত্রবীথি
শহরের কৃত্রিম আলো আর কংক্রিটের জঙ্গল থেকে দূরে, যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে অন্ধকার ও পরিষ্কার আকাশ যেখানে মিশে গেছে তার নাম নর্থ পেনাইনস। এখানে শহরের কৃত্রিম আলোর বাতি না থাকায় খালি চোখেই মিল্কিওয়ে বা গ্যালাক্সির চমৎকার রূপ দেখা যায়। এই অঞ্চলটিতে রেকর্ডসংখ্যক ১৬টি অফিশিয়াল ‘ডার্ক স্কাই ডিসকভারি সাইট’ রয়েছে, যা স্টারগেজিংপ্রেমীদের কাছে এটিকে এক পবিত্র তীর্থস্থানে পরিণত করেছে। গ্রাসহোম অবজারভেটরিতে পরিবার নিয়ে তারা দেখার এই আয়োজনগুলো কেবল বিনোদন নয়, বরং মহাবিশ্বের বিশালতার সঙ্গে মানুষের মেলবন্ধন ঘটানোর এক দারুণ মাধ্যম।
মার্সি নদীর তীরে আলোর বন্যা
ইংল্যান্ডের লিভারপুলে পা রাখলে দেখবেন, মার্সি নদীর তীর আর শহরের আইকনগুলো রঙিন আলোয় ঝলমল করছে। ইউরোপের বড় বড় লাইট ফেস্টিভ্যালগুলোতে সাধারণত চড়া মূল্যের টিকিট কাটতে হয়, কিন্তু লিভারপুলের মার্সি নদীর তীরের এই ফেস্টিভ্যালটি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ও ফ্রি। এখানে কোনো এন্ট্রি গেট বা লাইন ধরার ঝামেলা নেই। টুগেদার থিম সামনে রেখে এখানে ছয় মিটার উঁচু পিয়োনি ফুল কিংবা জ্যাক-ইন-দ্য-বক্সের মতো অবাক করা শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়। শিল্প ও সাধারণ মানুষের দূরত্ব ঘুচিয়ে শহরকে এক মিলনমেলায় পরিণত করাই এই উৎসবের মূল উদ্দেশ্য।

স্লিমব্রিজের মিস্টিক্যাল মার্শ ও রাতের বন্যপ্রাণী
হ্যালোইনের প্রচলিত গা ছমছমে ভয়ের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে গ্লুচেস্টারশায়ারের স্লিমব্রিজ ওয়েটল্যান্ড সেন্টার নিয়ে এসেছে এক অভিনব আয়োজন। হ্যালোইনের ভূত-ভয় বা ভীতিপ্রদ পরিবেশ যাদের ভালো লাগে না, তাদের জন্য এটি এক চমৎকার বিকল্প। এখানে ভয়ের কোনো ব্যাপার নেই, বরং জলাভূমির আসল জীবজন্তুদের নিয়ে তৈরি বিশাল সব আলো ঝলমলে লণ্ঠন প্রকৃতির এক মায়াবী রূপ ফুটিয়ে তোলে। জলাভূমির প্রাকৃতিক রূপের আদলে তৈরি বিশাল সব হস্তনির্মিত লণ্ঠন যেমন দৈত্যাকার ব্যাঙ বা মাছরাঙা, পুরো পরিবেশকে এক মায়াবী রূপ দেয়। একই সঙ্গে লিংকনশায়ারের পেঁচা দেখা কিংবা মার্সহেডে কাঁচের ঘরের ভেতর থেকে ব্যাজারদের খাবার খাওয়ার দৃশ্য দেখার মতো আয়োজনগুলো বন্যপ্রাণীর প্রতি মানুষের কৌতূহল ও ভালোবাসাকে জাগিয়ে তোলে।
শীতের এই দীর্ঘ রাতগুলো কেবল কম্বলের নিচে গুটিসুটি মেরে কাটানোর জন্য নয়। এই সময়টা প্রকৃতির রূপ বদলে যাওয়ার এই সময়টা আমাদের মনে করিয়ে দেয় অন্ধকার যতই দীর্ঘ হোক না কেন, আলো, শিল্প আর মানবীয় উষ্ণতা মিলে তাকে ঠিকই জাদুকরী করে তুলতে পারে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান









