ইনস্ট্যান্ট নুডলস খাওয়ার তালিকায় কোন দেশ এগিয়ে

ক্লান্তিময় দিন শেষে ঝটপট এক বাটি গরম নুডলস। আজ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের রান্নাঘরেই এর দেখা মেলে। রান্নাঘরের তাকে রাখা এক প্যাকেট ইনস্ট্যান্ট নুডলস আর এক কেটলি গরম পানিই যথেষ্ট। হংকংয়ের বিখ্যাত শেফ ডেভিড লাই একে একেবারে নিখাদ ‘গণতান্ত্রিক খাবার’ বলে ডেকেছেন। এটি সস্তা, সবার নাগালে এবং এক চিমটি সস্তায় ডোপামিন এনে দিতে ওস্তাদ। দামি কোনো খাবারের তালিকায় এটি না থাকলেও, বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের খাদ্যতালিকায় ইনস্ট্যান্ট নুডলস নিজের জায়গা শক্ত করে নিয়েছে। তবে নুডলস খাওয়ার এই প্রতিযোগিতায় কোন দেশ কতটা এগিয়ে, আর এর পেছনের রহস্যই বা কী?
বিশ্বজুড়ে মানুষ প্রতি বছর কতগুলো নুডলস খাচ্ছে জানেন? ওয়ার্ল্ড ইনস্ট্যান্ট নুডলস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে এই চাহিদা ২০২৫ সালে পৌঁছে গেছে ১২৪.২১ বিলিয়ন বা ১২,৪২১ কোটি সার্ভিংয়ে! আর গ্লোবাল মার্কেট বলছে, ৬৪.৬৭ বিলিয়ন ডলারের এই ইনস্ট্যান্ট নুডলস শিল্প নাকি লাফিয়ে ৯৮.৪৬ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকবে। ২০১৯ সালে যা ছিল ১০৬.৪ বিলিয়ন। অর্থাৎ, মহামারি শুরুর পর থেকে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে আগের চেয়ে প্রায় ১৮ বিলিয়ন বেশি পরিবেশন নুডলস খাওয়া হচ্ছে। বৈশ্বিক এই চড়াও চাহিদা প্রমাণ করে যে, উৎপাদিত তৈরি খাবারের মধ্যে এটি অন্যতম জনপ্রিয়।
তালিকার শীর্ষে চীন ও হংকং
মোটের ওপর নুডলস ব্যবহারের বিচারে অন্য কোনো দেশ চীন ও হংকংয়ের ধারেকাছেও নেই। ২০২০ সালের হিসাব অনুযায়ী, কেবল চীন ও হংকংজুড়ে ৪৬.৪ বিলিয়ন সার্ভিং নুডুলস খাওয়া হয়েছে। যা বিশ্বব্যাপী মোট চাহিদার প্রায় ৩৯.৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি পাঁচটি বাটির প্রায় দুটিই তাদের পেটে যায়। তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া (১২.৬ বিলিয়ন সার্ভিং বা ১০.৮ শতাংশ)। এটি বিশ্বখ্যাত ‘ইন্দোমি’ ব্র্যান্ডের দেশ। এর পরপরই রয়েছে ভিয়েতনাম (৭.০ বিলিয়ন) এবং ভারত (৬.৭ বিলিয়ন)। তবে ভারতের অবস্থান এখন ক্রমান্বয়ে তৃতীয় স্থানে উঠে আসছে। এমনকি নাইজেরিয়ার মতো দেশও শীর্ষ ১০-এর তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। তবে মজার ব্যাপার হলো, মোট সংখ্যার বিচারে বড় দেশগুলো এগিয়ে থাকলেও ‘মাথাপিছু’ খাওয়ার প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন ভিয়েতনাম! ভিয়েতনামের একেকজন নাগরিক বছরে গড়ে ৮১ থেকে ৮৭ বাটি নুডুলস চেটেপুটে সাফ করে ফেলেন। যা বিশ্ব গড়ের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ বেশি। অন্যদিকে, কে-ড্রামা দেখে ফ্যান হয়ে যাওয়া দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষও কম যায় না; তারা সোনার রঙের টিনের পাত্রে রামেন খেয়ে মাথাপিছু ৭৯ বাটির রেকর্ড গড়েছে। আর যুক্তরাষ্ট্র এখন এই তালিকায় ষষ্ঠ স্থানে উঠে এসেছে, যেখানে তারা সাধারণ চিকেন ব্রথ ছেড়ে একটু স্পাইসি এশিয়ান ফ্লেভারের দিকে ঝুঁকেছে।

নুডলস নিয়ে যত এক্সপেরিমেন্ট
নুডলস মানেই কি শুধু ফুটন্ত পানিতে মশলা ঢেলে পাঁচ মিনিটে পেটে চালান করা? শেফ ডেভিড লাই তা মানেন না। তিনি নুডলসকে নিয়ে রীতিমতো এক্সপেরিমেন্ট জুড়ে দিয়েছেন। ইতালিয়ান কঠিন এক কৌশল স্প্যাগেটি অল-আসাসিনার আদলে তিনি শুকনো নুডলস ব্লকগুলোকে মাখন আর গরুর চর্বিতে টানা ৩০ মিনিট ধরে প্যানে ভাজেন। সঙ্গে টমেটো পাল্প আর সমৃদ্ধ ব্রথ যোগ করে একে বানিয়ে ফেলেন চমৎকার ক্যারামেলাইজড, ক্রিসপি ও চিউয়ি এক মাস্টারপিস। বিজ্ঞানীরা অবশ্য এর পেছনে অন্য রহস্য খুঁজে পান। হাই এনার্জি ডেন্সিটি, লবণ, চর্বি আর কার্বোহাইড্রেটের মারপ্যাঁচে এই নুডলস আমাদের ব্রেনের ন্যাচারাল ‘পেট ভরে গেছে’ সিগন্যালকে বাইপাস করে এক মারাত্মক আসক্তি তৈরি করে। তবে এই বদনাম ঘোচাতে নিসিন-এর মতো কোম্পানিগুলো এখন কানসেন মেশিনের মতো প্রযুক্তির সাহায্য নিচ্ছে, যাতে নুডলসের মাঝেই ৩৩টি জরুরি পুষ্টি উপাদান ব্লেন্ড করে একে স্বাস্থ্যকর বানিয়ে ফেলা যায়।
কঠিন সময়েই বাড়ে নুডলসের কদর
ইনস্ট্যান্ট নুডলসের চাহিদা কেবল আরামদায়ক খাবারের ঝোঁক থেকে বাড়ছে, বিষয়টা এমন নয়। এর পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক সমীকরণ। ২০১৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে যে বছর বিশ্বজুড়ে মহামারি আঘাত হানে তার এক বছরের ব্যবধানে নুডলসের চাহিদা লাফিয়ে ১০.১ বিলিয়ন পরিবেশন বেড়ে যায়। পরবর্তী সময়ে বিশ্বজুড়ে দেখা দেওয়া উচ্চ মূল্যস্ফীতিও নুডলসের জনপ্রিয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। যখন নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে এবং পরিবারগুলো বাজেট সংকুচিত করতে বাধ্য হয়, তখন সামান্য কিছু টাকা আর কিছুটা গরম পানির সমন্বয়ে তৈরি এক বাটি নুডলসই হয়ে ওঠে সবচেয়ে সাশ্রয়ী খাবার। সহজ কথায়, ইনস্ট্যান্ট নুডলসের গল্পটি কেবল ঝটপট তৈরির সুবিধার নয়; এটি মূলত সাশ্রয়ী মূল্যের গল্প। চীন ভলিউমের দিক থেকে শীর্ষে, ভিয়েতনাম ক্ষুধার দিক থেকে, আর সস্তার এই এক বাটি নুডলস প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষের ঘরে শান্তি বজায় রাখছে।
শহর বন্ধ, আপনি চরম ক্লান্ত, তবুও ঘরে এক প্যাকেট নুডলস থাকা মানে আপনি নিরাপদ। বিশ্বজুড়ে মানুষ কেন এটি ছাড়তে পারে না? কারণ এটি কেবল খাবার নয়, এটি এক গ্লোবাল ইমোশন।
সূত্র: ফার্স্ট পোস্ট, ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ









