Ajker Patrika

ছুটির দিনে সন্তোষপুর

মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম 
ছুটির দিনে সন্তোষপুর
ছবি: দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ

ঢাকা থেকে বেশি দূরে নয় সন্তোষপুর। হাজার হাজার রাবারগাছ আছে এখানে। সেই বনে আছে বন্য বানরের লুকোচুরি। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার নওগাঁও ইউনিয়ন সন্তোষপুরে এই রাবার বন। এক সাংবাদিক বন্ধুর পাঠানো ছবি দেখে উৎসাহী হয়ে উঠি যাওয়ার জন্য। ঝটপট বন্ধুদের সঙ্গে পরিকল্পনা করে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। ছুটির দিনে আপনারাও কিন্তু চলে যেতে পারেন।

যানজটের ভয়ে ভোর চারটায় গাড়ি ছাড়ি। তারপরও কপাল মন্দ হলে যা হয়। জটেই পড়ে রইলাম। মাওনা পার হওয়ার পর কিছুটা স্বস্তি মিলল। এক টানে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ফুলবাড়িয়ার কান্দানিয়া গ্রামে পৌঁছাতে পেরেছি। স্থানীয় সেই সাংবাদিক বন্ধু জানালেন, এখানে বানর দেখার মোক্ষম সময় বিকেলবেলা। তাই অনুমতি নিয়ে ঢুঁ মারি দুলমা গ্রামের দীপ্তি অর্কিডস বাগানে।

প্রধান ফটক পেরিয়ে বাগানে ঢুকতেই চোখ জুড়িয়ে যায়। শক্ত পাতার আবরণে লাল, হলুদ, সাদা, বেগুনি ইত্যাদি রঙের নানান ফুল ফুটে আছে। প্রায় ২৬ একর জায়গাজুড়ে এই অর্কিড বাগান। এ ছাড়া আরও আছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের গাছপালা। বাগানজুড়ে পাখির কলতান। বেশ ভালো লাগা সময় পার হলো।

নামাজ শেষে হেঁটে চলে গেলাম টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার গুপ্ত বৃন্দাবন গ্রামে। জায়গাটা ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল জেলার সীমানায় পড়েছে। সেখানে রয়েছে একটি প্রাচীন তমালগাছ। এর সঠিক বয়স কেউই ‘সঠিক’ভাবে বলতে পারেন না। তবে শতাধিক বছর যে পেরিয়েছে, সেটা নিশ্চিত। স্থানীয় এক পুরোহিত জানালেন, তমালগাছটি নাকি একবার মারা যাওয়ার প্রায় ১২ বছর পর নতুন করে ডাল-পালা-পাতা গজিয়েছে! গাছটি দেখতেও বেশ অদ্ভুত। অনেকখানি জায়গাজুড়ে এর বিস্তৃতি। প্রকৃতি ও বৃক্ষপ্রেমী মির্জা রাসেল জানালেন, এটা তমাল নয়। তবে বিরল প্রজাতির কোনো বৃক্ষ। গাছের নাম যা-ই হোক না কেন, বর্তমানে একে ঘিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজা-অর্চনা চলে। দর্শনার্থীদের জন্যও এটি বেশ আকর্ষণীয়। গাছ নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে করতে ছুটি সন্তোষপুর রাবারবাগানের পথে।

ছবি: দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ
ছবি: দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ

সুনসান নিরিবিলি গ্রাম্য পথে গাড়ি চলছে বেশ দ্রুতগতিতে। দুই পাশে স্বপ্নময় নিসর্গ, পাকা ধানের সুগন্ধ, সিজনের পাকা আনারসের ঘ্রাণ নিতে নিতে কখন যে সন্তোষপুর পৌঁছে গিয়েছিলাম, টের পাইনি। গাড়ি থামে বনের ভেতর রাবার প্রক্রিয়াকরণ কারখানার দরজায়। ভেতরে ঢুকে রাবার তৈরির প্রক্রিয়া দেখে বনের পথ ধরে বিট অফিসের দিকে হাঁটতে থাকি।

নয়নাভিরাম সন্তোষপুর বনাঞ্চল ১০৬ একর জমি নিয়ে বিস্তৃত। এই বনে রয়েছে শাল-গজারিসহ নানান জাতের গাছ। এ ছাড়া আরও আছে বাংলাদেশ বন শিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত রাবারবাগান। বুনো ঘ্রাণ আর শেষ বিকেলে ঘরে ফেরা বিভিন্ন পাখির কিচিরমিচির শুনতে শুনতে পৌঁছে যাই বন বিট অফিসের সামনে। এই পাশটায় যেন বানরের সভা বসেছে! নানান বয়স আর আকারের বানর। দোকানিদের কাছ থেকে কলা, বাদাম কিনে আমরাও বানরের বাঁদরামিতে অংশ নিই। আশ্চর্য বিষয়, বানরগুলো আমাদের কোলে, কাঁধে একেবারে নির্ভয়ে এসে উঠে বসল! আমরা যেন ওদের কত চেনা-পরিচিত।

ছবি: দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ
ছবি: দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, সন্তোষপুরের এই বনে বিরল প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় ৫০০ বানর রয়েছে। আগে আরও অনেক ধরনের প্রাণীর দেখা মিলত। কিন্তু প্রাকৃতিক বনের বুকে আশির দশকে রাবারবাগান সৃজন আর মানুষের উৎপাতে এখন শুধু বানরকুলই কোনোরকমে টিকে আছে। বন বিভাগ থেকে বানরের জন্য খাবার বরাদ্দ থাকলেও তা অপ্রতুল। তাই বনে ঘুরতে আসা মানুষদের দেওয়া খাবারই এখন তাদের ভরসা। স্থানীয়রা এদের সামাজিক বানর হিসেবেই আখ্যায়িত করে। কারণ, এরা সাধারণত উৎপাত করে না। তবে বনে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের কেউ যদি খাবার না দেয়, তাহলে খুব অসহায়ভাবে তার কাঁধে বা কোলে বসে থাকবে। অগত্যা হাড়কিপ্টে মানুষও বানরের জন্য কিছু টাকা খরচে বাধ্য হয়। ভ্রমণপিয়াসি মানুষ আর বানরের অভূতপূর্ব মিলনের মাঝেই দিনের আলো মিলিয়ে গেল। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরও ফিরতি পথ ধরতে হলো।

যাবেন যেভাবে

নিজস্ব বা ভাড়ার গাড়ি নিয়ে গেলে ঘুরতে সুবিধা বেশি। তবে ঢাকার মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে ময়মনসিংহগামী বিভিন্ন পরিবহনের বাসে উঠে নামতে হবে ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ডে। সেখান থেকে অটোরিকশা বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় অর্কিড বাগান। ইচ্ছা করলে সারা দিনের জন্য ভাড়া নিয়ে একেবারে সন্তোষপুর রাবারবাগানসহ আরও আশপাশ ঘুরে আসা যায়। যাঁরা শুধু সন্তোষপুর বানরপল্লি যেতে চান, তাঁরা ফুলবাড়িয়া উপজেলা পরিষদের সামনে থেকে অটোরিকশায় সরাসরি চলে যেতে পারেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত