কিছু কিছু উৎসব থাকে, যেগুলো স্থান-কাল-পাত্র ও সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে উঠে সর্বজনীন হয়ে যায়। আমাদের দেশে রাস উৎসব তেমনি। তবে এটি খুব বেশি জায়গায় অনুষ্ঠিত হয় না। দেশে রাস উৎসবের জন্য তিনটি জায়গা বেশ বিখ্যাত।
রাস উৎসব হিন্দু, মতুয়া ও মণিপুরী সম্প্রদায়ের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। প্রতিবছর কার্তিকী পূর্ণিমায় বৈষ্ণবভাবাপন্ন হিন্দু, মণিপুরী ও মতুয়া সম্প্রদায়ের লোকজন ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে পালন করেন রাস। আগামী ১৮ ও ১৯ নভেম্বর যথাক্রমে স্মার্ত্ত ও গোস্বামীমতে রাস উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। মেলার দেশের মানুষ হিসেবে ঘুরে আসতে পারেন এই প্রাচীন উৎসবটি।
কান্তজিউ মন্দির
দিনাজপুরের কাহারোলে আছে দেশের সুন্দরতম টেরাকোটাসমৃদ্ধ কান্তজিউ মন্দির। দিনাজপুরের মহারাজ প্রাণনাথ রায় ১৭২২ সালে মন্দিরটির নির্মাণকাজ শুরু করেছিলেন। এর নির্মাণকাজ শেষ করেন তাঁর পালক পুত্র রামনাথ রায়, ১৭৫২ সালে। প্রতিবছর এখানে মাসব্যাপী রাস উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।
মূলত দিনাজপুর মহারাজের সময় থেকে, অর্থাৎ ১৭৫২ সাল থেকে এই রাস উৎসব উদ্যাপিত হয়ে আসছে। মন্দির প্রতিষ্ঠার পর থেকে চিরাচরিত প্রথানুযায়ী ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমীর আগের দিন পুনর্ভবা নদীপথে নৌবহর করে কান্তজিউ মন্দিরে থাকা কান্তনগর বিগ্রহ দিনাজপুরের রাজবাড়ির মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়। কান্তনগর সেখানে তিন মাস অবস্থান করে। এরপর কার্তিক পূর্ণিমার এক দিন আগে ভক্ত-পুণ্যার্থীরা হেঁটে কান্তনগর বিগ্রহকে ফের মন্দিরে নিয়ে আসেন।
রাজপরিবারের ঐতিহ্য মেনে এখনো এখানে রাস উৎসব হয়। মেলা বসে, লোকে-লোকারণ্য হয়ে ওঠে মন্দিরের বিস্তীর্ণ মাঠ। আপনিও শামিল হন এ মিলনমেলায়। ঢাকা থেকে সড়ক ও রেলপথে দিনাজপুর হয়ে চলে যেতে পারেন দেশের ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী এই মেলায়। শত বছরের ইতিহাস গায়ে মেখে ঘুরে আসুন শীতের উত্তরবঙ্গ থেকে।
কমলগঞ্জের রাস
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর ও আদমপুরে প্রতিবছর রাস উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। রাসের মূল আয়োজন করেন স্থানীয় মণিপুরীরা। বিষ্ণুপ্রিয়া ও মৈতৈ মণিপুরীরা রাস পালন করেন, তবে আলাদাভাবে। বিষ্ণুপ্রিয়া সম্প্রদায়ের লোকজন মাধবপুরের জোড়মণ্ডপে এবং মৈতৈ সম্প্রদায়ের লোকজন আদমপুরের মণ্ডপে নিজেদের রীতিপদ্ধতি মেনে রাস উৎসব করে থাকেন। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাস উৎসবটি পালিত হয় মাধবপুরের জোড়মণ্ডপে। এখানে তিনটি একই রকম মণ্ডপ করা হয়। প্রতিটি মণ্ডপকে কাগজ কেটে সুন্দর করে সাজানো হয়, আলোকসজ্জা করা হয়। একেক বছর একেক শিংলুপ (পুঞ্জি বা গোষ্ঠী) দায়িত্ব পায় মণ্ডপ সাজানোর।
সকাল থেকে ভোররাত অবধি চলে রাসের নানা পর্ব। খুব ভোরে গোষ্ঠলীলা বা রাখাল নৃত্যের মাধ্যমে এর সূচনা হয় এবং পরিসমাপ্তি হয় শেষরাতে শ্রীকৃষ্ণের মহারাসলীলার মাধ্যমে। বিকেলে কৃষ্ণের সখ্য ও বাৎসল্য রসের লীলা সবাইকে বিমোহিত করে, এটি চলে গোধূলি পর্যন্ত। তবে রাসের মূল আকর্ষণ রাতের মহারাস। মণিপুরী নৃত্যের তালে তালে রাধারূপী নর্তকীদের নৃত্যশৈলী উপস্থিত দর্শকদের নিয়ে যায় মর্ত্যলোক ছাপিয়ে ভিন্ন কোনো জগতে। মাধবপুরে এই রাসলীলার শুরু ১৮৪২ সালে, যা আজও বহমান। মণিপুরের রাজা ভাগ্যচন্দ্র ১৭৭৯ সালে প্রথম রাস উৎসব পালন করেছিলেন। এই উৎসবে শামিল হতে যে কেউ চলে যেতে পারেন।
বাসে ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গল গিয়ে সেখান থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে সরাসরি চলে যাওয়া যায় মাধবপুরের জোড়মণ্ডপে।
সারা রাত রাস দেখার পাশাপাশি পূর্ণিমা রাতে চা-বাগানের অপার্থিব সৌন্দর্য দেখে নিতে পারবেন এখানে। চা-বাগানে পূর্ণিমা দেখার এই অভিজ্ঞতা সারা জীবন সুখস্মৃতি হয়ে থাকবে।
দুবলার চর প্রতিবছর কার্তিক পূর্ণিমায় গহিন সুন্দরবনের দুবলার চরের আলোরকোলে অনুষ্ঠিত হয় রাস উৎসব। অংশ নেন হাজার হাজার পুণ্যার্থী। মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রবর্তক হরিচাঁদ ঠাকুর (১৮১২-১৮৭৮) এবং তাঁর পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুরকে (১৮৪৬-১৯৩৬) স্মরণ করা হয় এ উৎসবে। ১৯২৩ সালে ছোট পরিসরে দুবলার চরে রাস উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই থেকে প্রতিবছর মতুয়া মতাবলম্বীরা এখানে আসেন দিন তিনেকের জন্য। তাঁরা বিভিন্ন ধর্মীয় কৃত্যানুষ্ঠান পালন করেন। রাসের পরের দিন ভোরবেলায় সমুদ্রস্নানের মাধ্যমে নিজেদের পাপ মোচন করেন। প্রতিবছর সাধারণত ট্রলারযোগে উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে দুবলার চরে জড়ো হন শত শত নারী-পুরুষ। সারা রাত ধরে চলে রাসের নানা কৃত্যানুষ্ঠান। দুবলার চরের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে কীর্তনীয়াদের কীর্তনের মূর্ছনায়। এই মেলায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তীর্থযাত্রী ও দর্শনার্থীরা লঞ্চ, ট্রলার ও নৌকাযোগে এখানে সমবেত হন। বিদেশি পর্যটকেরাও আসেন। এ উপলক্ষে সাংস্কৃতিক নানা আয়োজন থাকে। তিন দিনব্যাপী এ আয়োজনে দর্শনার্থী ও পুণ্যার্থীদের বনে প্রবেশের জন্য অনুমতি (পাস পারমিট) নিতে হয়। অনুমতিপত্র ছাড়া বনে ঢোকা যায় না।
বন, সাগর, পরিবেশ আর মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে দেখে আসতে পারেন দুবলার চরের এ রাস উৎসব। সড়কপথে খুলনায় নেমে, সেখান থেকে জলপথে অনুমতিপত্র সংগ্রহ করে দুবলার চর যেতে হবে।
সতর্কতা
রাস ধর্মীয় উৎসব। ভাবগাম্ভীর্যের মাধ্যমে এ উৎসব উদ্যাপন করা হয়ে থাকে। ফলে এর পবিত্রতা রক্ষা করা ভ্রমণকারী হিসেবে আপনার দায়িত্ব।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ফোকলোর বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছে বৃষ্টিতে ভেজার ছোট ছোট ভিডিও। সেসব ভিডিওতে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে রোমান্টিক গান কিংবা কবিতা। এই রোমান্টিক ভাবটা যে শুধু সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, এমন নয়। ব্যক্তিমনে এর বিস্তার অনেক বেশি। ভেবেছেন কি, বৃষ্টি কেন মনে রোমান্টিক অনুভূতি তৈরি করে...
১৪ ঘণ্টা আগে
আকাশে মেঘ করেছে দেখে খিচুড়ি খেতে চান না, এমন মানুষের সংখ্যা খুব কম। রাতের ভোজে যাঁরা খিচুড়ি খাওয়ার কথা ভাবছেন, তাঁদের জন্য রেসিপি ও ছবি পাঠিয়েছেন রন্ধনশিল্পী আফরোজা খানম মুক্তা। এই রেসিপি দেখে রেঁধে ফেলুন মেঘলা দিনে ছাকবাটা খিচুড়ি...
১৬ ঘণ্টা আগে
এপারে খাগড়াছড়ির তবলছড়ি, ওপারে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য। সারা রাত বাস জার্নি করে সকালে ডাকবাংলোতে নামতেই আমাদের স্বাগত জানালেন স্থানীয় ভ্রমণবান্ধব যুবক শাহজাহান। আলাপচারিতা শেষে আমরা তাঁর বাড়ি যামিনীপাড়া গ্রামের পথে হাঁটতে শুরু করি।
২১ ঘণ্টা আগে
আবহাওয়া খারাপ থাকলে সমুদ্রসৈকতে ভ্রমণ করা অনেক সময় রোমাঞ্চকর মনে হলেও ঝুঁকিপূর্ণ। সমুদ্রসৈকতে ভ্রমণের সময় ঝড়বৃষ্টিতে আটকে গেলে নিরাপত্তার জন্য জেনে নিতে হবে বিভিন্ন সতর্কসংকেত। এগুলো জানলে নিজেরাই বুঝতে পারবেন, কখন কী করতে হবে নিরাপত্তার জন্য।
১ দিন আগে