Ajker Patrika

৯১ বছর বয়সে মাকায়ার ১৮তম বিশ্বকাপ মিশন

ফিচার ডেস্ক
৯১ বছর বয়সে মাকায়ার ১৮তম বিশ্বকাপ মিশন
৯১ বছর বয়সেও ফুটবলের স্মৃতি ও আবেগকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ববোধ তাড়া করে বেড়ায় মাকায়া মার্কেজকে। ছবি: এএফপি

সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছেন আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি। একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন ‘আসন্ন ম্যাচে লিওনেল মেসি কি খেলবেন?’ উত্তরে কোচ জানালেন, ‘এই প্রশ্নটা যদি অন্য কেউ করত, আমি নিশ্চিতভাবেই এড়িয়ে যেতাম। যেহেতু আপনি জিজ্ঞেস করেছেন, তাই উত্তর দিচ্ছি, লিও (মেসি) আগামীকাল শুরুর একাদশে থাকছে না। সে বেঞ্চে থাকবে এবং পরে মাঠে নামবে।’ ইতিমধ্যে এই ভিডিওটি অনেকেই দেখেছেন। জানেন, কে এই সাংবাদিক? তিনি বিশ্বরেকর্ডধারী কিংবদন্তি আর্জেন্টাইন ক্রীড়া সাংবাদিক এনরিকে মাকায়া মার্কেজ। আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে এবং বিশ্ব ক্রীড়া সাংবাদিকতায় তিনি যেন এক জীবন্ত রূপকথা। ১৯৫৮ সাল থেকে আজ পর্যন্ত একটিও ফুটবল বিশ্বকাপ মিস করেননি। স্বচক্ষে দেখেছেন ডি স্টেফানো, পেলে, ক্রুইফ, ম্যারাডোনা থেকে শুরু করে মেসির জাদুকরী সব কীর্তি।

মাকায়া এবারের বিশ্বকাপে মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মাঠে পদার্পণ করেছেন নিজের ক্যারিয়ারের ১৮তম বিশ্বকাপ কভার করতে। সেদিন সংবাদ সম্মেলনে স্কালোনি তাঁর প্রশ্নের উত্তরের শুরুটা করেছিলেন এই বলে যে, ‘সত্যি বলতে, আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারাটা আমার জন্য পরম আনন্দের। আপনি ১৮টি বিশ্বকাপ কভার করেছেন, এটা ভাবাই অবিশ্বাস্য! আমি যখন আর্জেন্টিনার হয়ে খেলতাম, তখনো আপনি সাংবাদিকতার এক বিশাল ব্যক্তিত্ব ছিলেন, আর আজ তো আরও ওপরে।’ অন্য সব সাংবাদিকের ক্ষেত্রে দল নিয়ে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখলেও, মাকায়ার দীর্ঘ সাত দশকের গৌরবময় ক্যারিয়ারের প্রতি সম্মান জানিয়ে স্কালোনি মেসির খেলার রহস্যটি উন্মোচন করেছিলেন।

১৯৫৮ থেকে ২০২৬-এর হাইপার-কানেক্টেড বিশ্ব

মাকায়া মার্কেজের এই দীর্ঘ পথচলা শুরু হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ৬৮ বছর আগে। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৩ বছর। বুয়েনস আইরেসের ‘রেডিও বেলগ্রানো’ নামের একটি ছোট দল থেকে তাঁকে পাঠানো হয়েছিল ১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপ কভার করতে। সে সময়ের ভ্রমণ আজকের মতো সহজ ছিল না। মাকায়া ডগলাস ডিসি-৭ নামক একটি প্রপেলার বিমানে করে ডাকার, ইতালি, ডেনমার্ক হয়ে বহু ট্রেন ও ফেরি পেরিয়ে ‘অলৌকিক’ উপায়ে সুইডেনে পৌঁছেছিলেন। বিমানটির সরাসরি ওড়ার ক্ষমতা না থাকায় বারবার জ্বালানি নেওয়ার জন্য থামতে হতো। রেডিওতে যখন ধারাভাষ্য পাঠানো হতো, তখন তারা নিজেরাও জানতেন না, তা আক্ষরিক অর্থে আর্জেন্টিনায় পৌঁছাবে কি না। সেই থেকে শুরু। এরপর বিশ্ব রাজনীতির পটপরিবর্তন কিংবা সাদাকালো টেলিভিশন থেকে আজকের ডিজিটাল যুগ। কিন্তু সেই মাকায়া প্রতিবার বিশ্বকাপের মাঠে হাজির থেকেছেন। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে যখন তিনি তাঁর ১৭তম বিশ্বকাপ কভার করছিলেন, তখন ফিফা এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রেস অ্যাসোসিয়েশন তাঁকে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপ কভার করা সাংবাদিক হিসেবে বিশ্বরেকর্ডের স্বীকৃতি দেয়। ২০২৬-এর এই আসরে তিনি ডাইরেক্ট টিভি, ডি স্পোর্টস এবং ‘ডি স্পোর্টস রেডিও’র ধারাভাষ্যকার ও ট্যাকটিক্যাল অ্যানালিস্ট হিসেবে কাজ করছেন।

সংবাদ সম্মেলন শেষে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনির সঙ্গে ক্রীড়া সাংবাদিক এনরিকে মাকায়া মার্কেজ। ছবি: সংগৃহীত
সংবাদ সম্মেলন শেষে আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনির সঙ্গে ক্রীড়া সাংবাদিক এনরিকে মাকায়া মার্কেজ। ছবি: সংগৃহীত

আর্জেন্টিনার ফুটবলের কণ্ঠস্বর

বিশ্বকাপের বাইরেও মাকায়া আর্জেন্টিনার ফুটবলের ঘরের মানুষ। ১৯৮৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি দেশটির অত্যন্ত জনপ্রিয় টিভি শো ‘ফুটবল দে প্রিমেরা’ হোস্ট করেন। সে যুগে মাঠে গিয়ে খেলা দেখার মতো টাকা সবার থাকত না। তাই পুরো আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে তাদের প্রিয় দলের হাইলাইটস ও ট্যাকটিক্যাল অ্যানালাইসিস দেখার একমাত্র নির্ভরযোগ্য মাধ্যম ছিলেন এই মাকায়া। আর্জেন্টিনায় প্লে-বাই-প্লে ধারাভাষ্যকারকে বলা হয় ‘রেলেটর’ এবং যিনি কৌশলগত বিশ্লেষণ করেন তাঁকে বলা হয় ‘কমেন্টারিস্টা’। মাকায়া মূলত তাঁর নিখুঁত কৌশলগত বিশ্লেষণের জন্যই সমাদৃত।

নক্ষত্রের সান্নিধ্য মাকায়া

মাকায়া মার্কেজ ফুটবল ইতিহাসের এমন কিছু স্মৃতি তৈরি করেছেন, যা আর কারো পক্ষে সম্ভব নয়। তাঁর মতে, ফুটবল ইতিহাসের সেরা পাঁচ তারকা হলেন আলফ্রেডো ডি স্টেফানো, পেলে, ইয়োহান ক্রুইফ, ডিয়েগো ম্যারাডোনা এবং লিওনেল মেসি। এই প্রত্যেককে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তাঁর শৈশবের বন্ধু ডি স্টেফানো। ৮ বছর বয়সে মাকায়া বুয়েনস আইরেসের ফ্লোরেস এলাকায় খবরের কাগজ বিক্রি করতেন। তাঁর নিউজস্ট্যান্ডের মাত্র ৫০ মিটার দূরেই থাকতেন আলফ্রেডো ডি স্টেফানো। বয়সে বড় হলেও ডি স্টেফানো মাকায়ার নিউজস্ট্যান্ডে এসে বিনামূল্যে পত্রিকা পড়তেন এবং পরে মাকায়াকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে একসঙ্গে ফুটবল খেলতেন। মাকায়ার চোখে ডি স্টেফানোই ইতিহাসের সেরা। ১৯৫৮ সালের সেই প্রথম বিশ্বকাপেই তিনি ১৭ বছর বয়সী পেলের উত্থান ও ব্রাজিলের প্রথম বিশ্বকাপ জয় দেখেছিলেন। মাকায়ার মতে, পেলের টেকনিক্যাল দক্ষতার পাশাপাশি ছিল অবিশ্বাস্য শারীরিক ক্ষমতা। ডিয়েগো ম্যারাডোনার সঙ্গে ছিল তাঁর অম্ল-মধুর সম্পর্ক। তাঁদের সম্পর্ক এতটাই ঘনিষ্ঠ ছিল যে, ১৯৮৯ সালে ম্যারাডোনার বিয়েতেও তিনি আমন্ত্রিত ছিলেন। ম্যারাডোনা নাকি ঠাট্টা করে বলতেন, তিনি কোচ হলে মাকায়াকেই অ্যাসিস্ট্যান্ট বানাবেন। তবে সাংবাদিকতার জায়গায় মাকায়া সব সময় আপসহীন ছিলেন। ১৯৯০-এর দশকে জাপানে একটি প্রীতি ম্যাচ খেলতে যাওয়ার ব্যাপারে ম্যারাডোনা ও খেলোয়াড়দের অনীহা নিয়ে মাকায়া টিভিতে সমালোচনা করেন। ম্যারাডোনা রেগে গিয়ে টিভিতে বলেছিলেন, ‘মাকায়া কিচ্ছু জানে না।’ কিন্তু পরবর্তী সময়ে ম্যারাডোনা নিজের ভুল বুঝতে পেরে মাকায়াকে কফির আমন্ত্রণ জানান এবং একটি টিভি ক্রু ডেকে ক্যামেরার সামনে মাকায়ার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন। ১৯৮৬ সালের বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল নিয়ে অনেক আর্জেন্টাইন আবেগাক্রান্ত হলেও, মাকায়া বরাবরই বাস্তবসম্মত ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ ধরে রেখেছেন।

স্বপ্ন এখনো শেষ হয়নি

বার্ধক্যজনিত স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাকায়ার পাবলিক অ্যাপিয়ারেন্স কিছুটা কমেছে। কিন্তু বিশ্বকাপ মিস করার কথা তিনি স্বপ্নেও ভাবেন না। কাজ নিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি অনুভব করি এটা করা আমার দায়িত্ব বা বাধ্যবাধকতা।’ ফিফা প্রধান জিয়ান্নি ইনফান্তিনোও মেক্সিকোর উদ্বোধনী সংবাদ সম্মেলনে মাকায়ার এই উপস্থিতিকে ‘সত্যিই অবিশ্বাস্য’ বলে প্রশংসা করেছেন। ৯১ বছর বয়সেও ফুটবলের স্মৃতি ও আবেগকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দেওয়ার এই অনন্য তাড়না মাকায়া মার্কেজকে ফুটবল ইতিহাসের এক অমর চরিত্র করে তুলেছে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, নাইজেরিয়ান টেলিভিশন অথরিটি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত