Ajker Patrika

অ্যাঞ্জেল ডেলগাডিলো: দ্য ফাদার অব দ্য মাদার রোড

ফিচার ডেস্ক
অ্যাঞ্জেল ডেলগাডিলো: দ্য ফাদার অব দ্য মাদার রোড
১৯৪০-এর দশকের দিকে বাবার ক্ষৌরকর্মের দোকানের দায়িত্ব নেন অ্যাঞ্জেল। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের একটি রাজ্য অ্যারিজোনা। সেই রাজ্যের এক উত্তপ্ত ধুলোমাখা শহরের নাম সেলিগম্যান। শহরটিতে ৯৮ বছর বয়সী এক নরসুন্দর অ্যাঞ্জেল ডেলগাডিল। সব সময় মুখে তাঁর অমলিন হাসি। ভালোবেসে মানুষ তাঁকে ডাকে ‘রুট ৬৬-এর দেবদূত’ বা ‘দ্য ফাদার অব দ্য মাদার রোড’ নামে।

যুক্তরাষ্ট্রের রুট ৬৬-এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষটির এক অদ্ভুত গল্প। আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম বড় এই মহাসড়ক একসময় মানচিত্র থেকে প্রায় মুছেই যাচ্ছিল। সেই মরণাপন্ন রাস্তা একক প্রচেষ্টায় বাঁচিয়ে তুলেছিলেন এই ব্যক্তি। অ্যাঞ্জেল ডেলগাডিলো প্রমাণ করে দিয়েছেন, নিষ্ঠা আর জেদ থাকলে শুধু একটি দোকান কিংবা শহর নয়, আস্ত ইতিহাসকেও মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

মাদার রোডের সোনালি দিন

শিকাগো থেকে লস অ্যাঞ্জেলেস পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার ৯৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুট ৬৬ বা মাদার রোড হিসেবে পরিচিত। ১৯২৬ সালে এই রাস্তা উদ্বোধন করা হয়। সেই সময় রাস্তাটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ফেডারেল হাইওয়ে সিস্টেমের অংশ। ১৯২৭ সালে জন্মগ্রহণ করা অ্যাঞ্জেল ডেলগাডিলোর শৈশব কেটেছে এই রাস্তার ব্যস্ততা দেখে। মডেল এ বা মডেল টি গাড়িতে চড়ে আসা পর্যটকদের হেডলাইটের আলো এসে পড়ত তাঁদের বাড়ির দেয়ালটিতে। সেই ছায়ার সঙ্গে খেলে বেড়াতেন অ্যাঞ্জেল এবং তাঁর ভাইবোনেরা। সেই সময়ে ভ্রমণ ছিল খুব ধীরস্থির। মানুষ প্রতিটি শহরে থামত, স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলত এবং তাদের দোকানে এসে খাওয়াদাওয়া করত। ১৯৪০-এর দিকে বাবার ক্ষৌরকর্মের দোকানের দায়িত্ব নেন অ্যাঞ্জেল। তখন সেলিগম্যান দিয়ে দিনে প্রায় ৯ হাজার গাড়ি যাতায়াত করত। তাঁর ভাই হুয়ান খুললেন আইকনিক স্নো ক্যাপ বার্গার জয়েন্ট আর অন্য ভাই জো সামলাতেন পেট্রলপাম্প।

তবে বিপর্যয় নেমে এল ১৯৫৮ সালের দিকে। সরকার যখন আধুনিক ইন্টারস্টেট হাইওয়ে কিংবা দ্রুতগতির চার লেনের রাস্তা তৈরির কাজ শুরু করল, তখন রুট ৬৬-এর গুরুত্ব কমে যেতে থাকল। ১৯৭৮ সালের ২২ সেপ্টেম্বর বেলা ২টা ৩০ মিনিটে সেলিগম্যানের পাশ দিয়ে যখন নতুন ইন্টারস্টেট হাইওয়ে খুলে দেওয়া হলো, মুহূর্তেই শহরটি একরকম জনমানবহীন হয়ে পড়ল। পর্যটকেরা দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর নেশায় নতুন রাস্তা ধরল। ফলে সেলিগম্যানের ব্যবসা-বাণিজ্য রাতারাতি বন্ধ হয়ে গেল। এতে অ্যাঞ্জেলের পরিবার চরম অর্থকষ্টে পড়ল। কিন্তু এই শহর ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার সামর্থ্য বা ইচ্ছা—কোনোটাই তাঁদের ছিল না।

অ্যাঞ্জেল ডেলগাডিলো।
অ্যাঞ্জেল ডেলগাডিলো।

অ্যাঞ্জেলের এক নতুন লড়াই

১৯৮৫ সালে রুট ৬৬-কে অফিশিয়ালি মানচিত্র থেকে বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু মাঝে মাঝে কিছু পর্যটক ঠিকই অ্যাঞ্জেলের দোকানে আসতেন। তাঁরা বলতেন, ‘আমরা আমাদের বাবা-মায়েদের দেখা সেই পুরোনো যুক্তরাষ্ট্রকে খুঁজছি।’ অ্যাঞ্জেল অনুভব করলেন, মানুষের মনে এই রাস্তার জন্য এক গভীর নস্টালজিয়া আছে। তিনি চিন্তা করলেন, এই রাস্তাকে যদি ‘ঐতিহাসিক’ তকমা দেওয়া যায়, তাহলেই পর্যটকেরা আবার ফিরবে। ১৯২৭ সালের মহামন্দার সময় বেড়ে ওঠা অ্যাঞ্জেল জানতেন, হার মানলে পেটে ভাত জুটবে না। তিনি সস্ত্রীক রুট ৬৬ ধরে কিঙ্গম্যান পর্যন্ত প্রত্যেক ব্যবসায়ীর দ্বারে দ্বারে ঘুরতে থাকলেন। পরে ১৯৮৭ সালে ১৬ জন মিলে গঠন করলেন হিস্টোরিক রুট ৬৬ অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যারিজোনা। তাঁদের দীর্ঘ এই আন্দোলনের পর রাজ্য সরকার সেলিগম্যান থেকে কিঙ্গম্যান পর্যন্ত রাস্তাকে ‘ঐতিহাসিক রুট ৬৬’ হিসেবে ঘোষণা করতে বাধ্য হলো।

অ্যাঞ্জেলের সেই ছোট উদ্যোগের কথা যেন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল। অ্যারিজোনার দেখাদেখি অন্য সাতটি রাজ্যও তাদের রুট ৬৬-এর অংশগুলো সংস্কারে এগিয়ে এল। মৃতপ্রায় সেই শহর সেলিগম্যান আবার প্রাণচঞ্চল। এ বছর রুট ৬৬ বা মাদার রোড তার ১০০ বছর পূর্ণ করতে যাচ্ছে। আজও অ্যাঞ্জেলের সেই দোকানের পুরোনো চেয়ারটি আছে। দোকানের আয়নাজুড়ে হাজারো মানুষের ভিজিটিং কার্ড, যাঁরা গত ৭৫ বছরে তাঁর কাছে চুল কাটাতে এসেছেন। ৯৮ বছর বয়সেও অ্যাঞ্জেল যখন কোনো পর্যটকের সঙ্গে হাত মেলান, তখন সেই স্পর্শের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকে শতাব্দীপ্রাচীন এক ইতিহাস।

সূত্র: বিবিসি

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত