
ভ্যালেন্টাইন ডে কবে থেকে, কোন কারণে এবং কোথায় শুরু হয়, তার সঠিক ইতিহাস জানা কঠিন। কারণ, সেসব তথ্য জানতে হলে আমাদের ইতিহাসের বেশ কয়েকটি স্তর পেরোতে হবে। সেগুলোর মধ্যে আছে রোমান উৎসব থেকে খ্রিষ্টান শহীদের গল্প, আর মধ্যযুগীয় কবিতা থেকে আধুনিক বাণিজ্যিক রূপ।
তবে ব্রিটানিকার মতো কিছু সূত্রে জানা যায়, প্রাচীন রোমান উৎসব লুপারকালিয়াকে কিছু গবেষক ভ্যালেন্টাইনস ডের মূল বলে মনে করেন। খ্রিষ্টপূর্ব সময়ে, ফেব্রুয়ারি মাস ছিল প্রাচীন রোমে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। ১৩ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি সেখানকার মানুষ উদ্যাপন করত লুপারকালিয়া নামের এক উর্বরতা উৎসব। তবে এটি একই সঙ্গে ছিল বসন্ত উৎসবও। এই সময় যুবক-যুবতীদের নাম টোকেনের মাধ্যমে জুড়ে দেওয়ার রীতি ছিল, যা পরে ভালোবাসা দিবসের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রথা হিসেবে অনেকে মনে করেন।
সেন্ট ভ্যালেন্টাইন: ইতিহাস ও কিংবদন্তি
লুপারকালিয়া উৎসব চলতে থাকে খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতক পর্যন্ত। ৪৯৬ খ্রিষ্টাব্দে পোপ প্রথম গেলাসিয়াস এই ‘অখ্রিষ্টীয়’ উৎসব নিষিদ্ধ করেন। নিষিদ্ধ করলেই তো চলবে না, মানুষকে আনন্দ করার কোনো একটা উৎস দিতে হবে। পোপ প্রথম গেলাসিয়াস ১৪ ফেব্রুয়ারি তারিখটিকে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের ভোজ দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন।

কিন্তু কে ছিলেন এই সেন্ট ভ্যালেন্টাইন? গির্জার ইতিহাসে তো একাধিক সন্ত ভ্যালেন্টাইন নামে পরিচিত ছিলেন! একই নামে এই অনেক ভ্যালেন্টাইনের মধ্যে দুজনের কথা বিশেষভাবে জানা যায়। তাঁদের মধ্যে একজন ভ্যালেন্টাইন অব রোম এবং অন্যজন ভ্যালেন্টাইন অব টার্নি নামে পরিচিত। এর মধ্যে ভ্যালেন্টাইন অব রোম ছিলেন একজন পুরোহিত। কিংবদন্তি অনুসারে, সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস যুবকদের বিয়ে নিষিদ্ধ করে দেন। কিন্তু সাধু ভ্যালেন্টাইন সেই আদেশ অমান্য করে গোপনে সৈন্যদের বিয়ে পড়াতেন। এই অপরাধে তাঁকে ২৬৯ খ্রিষ্টাব্দের দিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আর ভ্যালেন্টাইন অব টার্নি ছিলেন টার্নি শহরের বিশপ। তিনিও ২৭৩ খ্রিষ্টাব্দের দিকে শহীদ হন।
তাঁদের নিয়ে নানান কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্পটি হলো, কারাগারে বন্দী অবস্থায় ভ্যালেন্টাইন তাঁর কারারক্ষীর অন্ধ মেয়েকে সুস্থ করে তোলেন। মৃত্যুর আগে সাধু তাঁকে একটি চিঠি লেখেন, যাতে তিনি সই করেছিলেন ‘তোমার ভ্যালেন্টাইন’ নামে। এই চিহ্নিতকরণ আজও ভালোবাসার বার্তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
প্রেমের সঙ্গে প্রথম সংযোগ: চসারের কবিতা
সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের ভোজ দিবস হিসেবে ১৪ ফেব্রুয়ারি উদ্যাপিত হলেও দিনটি প্রেম ও রোমান্টিক ভালোবাসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে অনেক পরে, মধ্যযুগে। এই পরিবর্তনের মূল কৃতিত্ব দেওয়া হয় ইংরেজ কবি জেফ্রি চসারকে।
১৩৮২ সালে লেখা তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘পার্লামেন্ট অব ফাউলস’-এ তিনি লিখেছিলেন,
For this was on seynt Volantynys day,
Whan euery bryd comyth there to chese his make.
(এটি ছিল সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের দিন,
যখন প্রতিটি পাখি তার সঙ্গী বেছে নিতে আসে।)
এই কবিতাই প্রথম সেন্ট ভ্যালেন্টাইন দিবসকে প্রেম ও রোমান্সের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করে। চসারের আগপর্যন্ত দিনটির সঙ্গে ভালোবাসার কোনো সম্পর্ক ছিল না বলে ঐতিহাসিকেরা মনে করেন।
আধুনিক রূপ
চসারের পর থেকে ধীরে ধীরে ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রেমিক-প্রেমিকাদের দিন হিসেবে জনপ্রিয়তা পেতে থাকে। পনেরো শতকের দিকে ফ্রান্সের কারাগারে বন্দী ডিউক অব অর্লিয়াঁর স্ত্রীকে লেখা প্রেমপত্রের মতো পুরোনো ভ্যালেন্টাইন কার্ডগুলোর দেখা মেলে।

এরপর আঠারো শতকের দিকে ইংল্যান্ডে হাতে লেখা প্রেমপত্র ও ছোটখাটো উপহার বিনিময়ের রীতি ব্যাপক আকার ধারণ করে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি, এস্থার হাওল্যান্ড নামের এক নারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে ভ্যালেন্টাইন কার্ড তৈরি ও বিক্রি শুরু করে। এখন যেভাবে দিনটি পালন করতে দেখা যায়, সেটি ছিল এর প্রথম ধাপ।
প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বৈচিত্র্যময় ভালোবাসা দিবসের আয়োজন
পশ্চিমা বিশ্বে ১৪ ফেব্রুয়ারি সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে হিসেবে ব্যাপক উৎসাহের সঙ্গে উদ্যাপিত হয়। শুধু তা-ই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তেও দিনটি পালনে বৈচিত্র্য দেখা যায়। কোথাও এটি প্রেমিক-প্রেমিকার দিন, আবার কোথাও এটি বন্ধুত্ব উদ্যাপনের দিন হিসেবেও পরিচিত।
জাপানে চকলেটে বিনিময়
পূর্ব এশিয়ার দেশ জাপানে ভালোবাসা দিবসের রীতি কিছুটা ভিন্ন। সেখানে ১৪ ফেব্রুয়ারি শুধু মেয়েরা ছেলেদের চকলেট উপহার দিয়ে থাকে। এই চকলেট আবার দুই রকমের হয়। একজন নারী তার প্রকৃত প্রেমিক বা স্বামীকে যে চকলেট দেয়, তাকে বলা হয় হনমেই-চোকো অথবা প্রকৃত ভালোবাসার চকলেট। অন্যদিকে, সহকর্মী, বন্ধু বা পরিচিত পুরুষদের সামাজিক বাধ্যবাধকতা হিসেবে যে চকলেট দেওয়া হয়, তাকে বলা হয় গিরি-চোকো বা বাধ্যবাধকতার চকলেট। অন্যদিকে, এই দিনের এক মাস পর, ১৪ মার্চ হোয়াইট ডে পালিত হয়। ফেব্রুয়ারিতে যারা চকলেট পেয়েছিল, এক মাস পর হোয়াইট ডেতে তারা আরও দামি উপহার ফিরিয়ে দেয়। আর যারা কোনো চকলেট বা উপহার পায়নি, তারা ১৪ এপ্রিল ব্ল্যাক ডে পালন করে। সেদিন খাওয়া হয় কালো বিন দিয়ে তৈরি চীনা নুডলস জাজাংমিয়ন।
ফিলিপাইনের যৌথ বিবাহ প্রথা
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ফিলিপাইনে ১৪ ফেব্রুয়ারি একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। দেশটিতে এই দিনে প্রায়শই সরকার কর্তৃক পৃষ্ঠপোষকতায় বিপুলসংখ্যক দম্পতির যৌথ বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় সরকারি প্রশাসন এই আয়োজন করে থাকে, যাতে দরিদ্র বা স্বল্প আয়ের দম্পতিরা খুব কম খরচে আইনসম্মতভাবে বিয়ে করতে পারে। এটি একটি সামাজিক উদ্যোগ, যা ভালোবাসা দিবসকে আরও অর্থবহ করে তোলে।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রাচীন রীতি
দক্ষিণ আফ্রিকায় ভালোবাসা দিবস উদ্যাপনের একটি রীতি রয়েছে, যা প্রাচীন রোমান উৎসব লুপারকালিয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়। সেখানে মেয়েরা তাদের প্রেমিকের নাম কাগজে লিখে জামার হাতার সঙ্গে পিন করে রাখে। এই রীতি সরাসরি ভালোবাসার প্রস্তাব দেওয়ার একটি প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি অনেকটা ভ্যালেন্টাইন দিবসের কার্ড পাঠানোর একটি উন্মুক্ত এবং প্রত্যক্ষ রূপ।
ডেনমার্কের লুকানো প্রেমপত্র
উত্তর ইউরোপের দেশ ডেনমার্কে ভালোবাসা দিবস উদ্যাপনে রয়েছে এক মজার ঐতিহ্য। এখানে ছেলেরা তাদের প্রেমিকা বা ভালোবাসার মানুষকে গ্যাকেব্রেভ নামে একধরনের ছন্দময় প্রেমপত্র পাঠায়। এই চিঠির বিশেষত্ব হলো, প্রেরক তার নামের বদলে শুধু বিন্দু (ডট) দিয়ে রাখে। যদি প্রাপক সঠিকভাবে অনুমান করতে পারে কে এই চিঠি পাঠিয়েছে, তাহলে চিঠি পাঠানো ব্যক্তিকে ইস্টার ডিমের বিনিময়ে সেই চিঠির স্বীকৃতি দিতে হয়।
ফিনল্যান্ডের বন্ধুত্ব দিবস
ফিনল্যান্ডে ১৪ ফেব্রুয়ারি দিনটি ইস্তাভানপাইভ্যা বা বন্ধুত্ব দিবস হিসেবে পালিত হয়। দেশটিতে রোমান্টিক ভালোবাসার চেয়ে বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভালোবাসা বিনিময়ের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। এই দিনে মানুষ তাদের বন্ধুদের ছোট ছোট উপহার, কার্ড বা মিষ্টি দিয়ে স্নেহ ও ভালোবাসা প্রকাশ করে।
জার্মানির শূকরের প্রতীক
জার্মানিতে ভালোবাসা দিবসের সঙ্গে একটি মজার ঐতিহ্য জড়িত। এখানে শূকর বা পিগ ভালোবাসা ও কামনার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই এই দিনে দম্পতিরা একে অপরকে শূকরের প্রতিকৃতি বা ভাস্কর্যসংবলিত উপহার দিয়ে থাকেন। এ ছাড়া আদা দিয়ে তৈরি বিভিন্ন রকমের কুকি বা বিস্কুটও এই দিনে জনপ্রিয় উপহার।
তাইওয়ানের ১০৮টি গোলাপ
তাইওয়ানে ভালোবাসা দিবসে পুরুষেরা তাঁদের প্রেমিকাকে ফুলের বিশাল তোড়া উপহার দিয়ে থাকেন। কেউ যদি তাঁর প্রেমিকাকে ১০৮টি গোলাপ উপহার দেন, তার অর্থ তিনি তাঁর প্রেমিকাকে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছেন।
ইতালির রোমিও-জুলিয়েটের শহর
ইতালিতে ভালোবাসা দিবস লা ফেস্টা ডেগলি ইননামোরাতি বা প্রেমিক-প্রেমিকার উৎসব নামে উদ্যাপিত হয়; বিশেষ করে শেক্সপিয়ারের বিখ্যাত প্রেমিক-প্রেমিকা রোমিও ও জুলিয়েটের শহর ভেরোনায় দিনটি অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে উদ্যাপিত হয়। এখানে চার দিন ধরে উৎসব, কনসার্ট এবং সবচেয়ে সুন্দর প্রেমপত্র লেখার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। জুলিয়েটের বাড়ির বারান্দাটি দর্শনার্থীদের প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠে।
ভালোবাসার এসব বৈচিত্র্যময় রূপ প্রমাণ করে, ভালোবাসা প্রকাশের ভাষা ও ধরন যতই ভিন্ন হোক না কেন, অন্তর্নিহিত তাৎপর্য একটাই—সম্পর্ক উদ্যাপন।
সূত্র: ব্রিটানিকা, বিবিসি, দ্য জাপান টাইমস, ফরমার মিডিয়া, সিএনএন ট্রাভেল, দ্য লোকাল ডেনমার্ক

লং ডিসটেন্স রিলেশনশিপ বা দীর্ঘ দূরত্বের প্রেমের সম্পর্ক নতুন কিছু নয়। চাকরি বা পড়াশোনাসহ বিভিন্ন কারণে মানুষ দীর্ঘ দূরত্বের প্রেমের জীবন অনিচ্ছা সত্ত্বেও কখনো কখনো বেছে নেয়। যদিও এখানে সম্পর্ক ক্রমেই সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছে, তবু এ ধরনের সম্পর্কে সহজে সবাই জড়াতে চায় না।
৯ ঘণ্টা আগে
আজ ফাল্গুনের ১ তারিখ। মানে বসন্তের প্রথম দিন। এই দিন বাসন্তী রঙের পোশাক পরে তো ঘুরে বেড়াবেনই, নিশ্চয় খাবার টেবিলেও থাকবে রকমারি আয়োজন। আজকের রাতের ভোজে সাধারণ পোলাও না রেঁধে রান্না করতে পারেন বাসন্তী পোলাও। রেসিপি ও ছবি পাঠিয়েছেন রন্ধনশিল্পী আফরোজা খানম মুক্তা।
১০ ঘণ্টা আগে
ভালোবাসার অনুভূতি সবার হৃদয়ে এক হলেও তা প্রকাশের ধরন আলাদা। কেউ হয়তো দিনভর ভালোবাসার কথা শুনতে পছন্দ করেন, আবার কেউ চান, সঙ্গী তাঁর কাজে একটু সাহায্য করুক। ঠিক এখানেই জন্ম নেয় ‘লাভ ল্যাঙ্গুয়েজ’ বা ভালোবাসার ভাষা। ১৯৯২ সালে ড. গ্যারি চ্যাপম্যান প্রথম এই ধারণা সামনে আনেন।
১১ ঘণ্টা আগে
ফাগুনের মোহনায় আজ যখন দখিনা বাতাস বইছে, যখন চারদিকে কৃষ্ণচূড়া আর শিমুলের লাল আভা, তখন হয়তো শহরের অলিগলিতে জোড়ায় জোড়ায় কপোত-কপোতীর ভিড় দেখে আপনার মন কিছুটা ভারাক্রান্ত। মনে হতে পারে, এই রঙিন উৎসব বুঝি শুধু তাঁদেরই জন্য, যাঁদের হাত ধরার মতো কেউ আছে।
১৩ ঘণ্টা আগে