Ajker Patrika

ডার্ক ট্যুরিজম: জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সমাধিক্ষেত্রে ভ্রমণ

ফিচার ডেস্ক
আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭: ৩৩
ডার্ক ট্যুরিজম: জনপ্রিয় হয়ে উঠছে সমাধিক্ষেত্রে ভ্রমণ
জনপ্রিয় সব ট্যুরিস্ট স্পটের ভিড় এড়িয়ে তরুণ ও ইতিহাসপ্রেমী পর্যটকেরা এখন পা বাড়াচ্ছেন শান্ত, সবুজ ও নীরব কবরস্থানগুলোতে। ছবি: সংগৃহীত

প্যারিসের আইফেল টাওয়ার, রোমের কোলোসিয়াম কিংবা চোখধাঁধানো কোনো ক্যাফে। ভ্রমণ মানে ‘ছবির মতো সুন্দর’ এসব জায়গায় ঘুরে বেড়ানো। সেখানে থাকবে হাজারো পর্যটকের ভিড়। কিন্তু কোলাহলময় শহরের ঠিক পেছনেই যদি লুকিয়ে থাকে শত শত বছরের নীরব গল্প, ইতিহাস ও শিল্প?

সম্প্রতি পর্যটন জগতে এসেছে এক নতুন ও চমকপ্রদ পরিবর্তন। জনপ্রিয় সব ট্যুরিস্ট স্পটের ভিড় এড়িয়ে তরুণ ও ইতিহাসপ্রেমী পর্যটকেরা এখন পা বাড়াচ্ছেন শান্ত, সবুজ ও নীরব কবরস্থানগুলোতে। একসময় যে জায়গাগুলোকে শুধু ভয় বা শোকের প্রতীক বলে মনে করা হতো, তা আজ পর্যটকদের কাছে হয়ে উঠেছে একেকটি উন্মুক্ত জাদুঘর। মনস্তত্ত্ব ও পর্যটনের ভাষায় এই বিশেষ ট্রেন্ডকে বলা হয় টুম্বস্টোন ট্যুরিজম করা সমাধিক্ষেত্র-পর্যটন। আর এই কবরপ্রেমী পর্যটকদের বলা হয় ট্যাফোফাইল। কিন্তু কেন মানুষ জীবন থেকে একটু ছুটি নিয়ে মৃত্যুর ঠিকানায় ঘুরতে যাচ্ছে?

নীরবতার মধ্যে ইতিহাস ও শিল্পের খোঁজ

প্যারিসের বিখ্যাত পেঁ ল্যাশেস কবরস্থানে প্রতিবছর প্রায় ৩৫ লাখ পর্যটকের সমাগম ঘটে। এটি বিশ্ববিখ্যাত মুসি দ্য অর্সে শিল্প জাদুঘরের দর্শনার্থীদের সংখ্যার প্রায় সমান। ভ্রমণ গবেষকদের মতে, ওভার ট্যুরিজম বা অতিরিক্ত পর্যটকের চাপে যখন ইউরোপের বড় বড় শহর হাঁসফাঁস করছে, তখন কবরস্থানগুলো অফার করে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ও নির্জনতা। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট্রাল ল্যাঙ্কাশায়ারের ইনস্টিটিউট অব ডার্ক ট্যুরিজম রিসার্চের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ফিলিপ স্টোন ডার্ক ট্যুরিজম ও টুম্বস্টোন ট্যুরিজমকে ‘মৃতদের প্রাসাদ ঘুরে দেখা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। আবার জর্জিয়ার জজ মেসন ইউনিভার্সিটির হসপিটালিটি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সু স্লোকমের মতে, ডার্ক ট্যুরিজম বা মৃত্যুভিত্তিক জায়গা পরিদর্শনের মূল কারণ হলো, মানুষের মৃত্যু ও পরকালের প্রতি কৌতূহল। এটি শুধু অতীত জানা নয়, বরং একটি সমাজ ও তার সংস্কৃতিকে গভীরে গিয়ে বোঝার উপায়।

ইতিহাস ও স্থাপত্যের এক অনন্য মিলনমেলা

স্থাপত্য ও স্মৃতিচিহ্ন: ১৯ শতকের সমাধিফলকগুলোতে ধর্মীয় প্রতীক, নির্দিষ্ট ক্লাবের চিহ্ন বা শৈল্পিক ভাস্কর্য খোদাই করা থাকত। এগুলো তখনকার সামাজিক অবস্থান ও শিল্পকলার পরিচয় বহন করে।

বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতি: প্যারিসের বিখ্যাত পেঁ ল্যাশেস কবরস্থানে শায়িত আছেন অস্কার ওয়াইল্ড, জিম মরিসন ও এডিথ পিয়াফের মতো কিংবদন্তি। লন্ডনের ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেনে ঘুমিয়ে আছেন কার্ল মার্ক্স। এসব বরেণ্য মানুষের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রতিবছর লাখো পর্যটক ঘুরতে যান সেগুলোতে।

পার্কের মতো উদ্‌যাপিত জীবন

বিশ্বের অনেক দেশে এখন কবরস্থানকে শুধু শোকের জায়গা হিসেবে না দেখে সামাজিক স্পেস হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। যেমন স্কটল্যান্ডের এডিনবরার গ্রেফ্রায়ার্স কির্কইয়ার্ড কবরস্থানটি ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। স্থানীয় মানুষ ও পর্যটকেরা এখানে বসে বই পড়েন, দুপুরের খাবার খান বা হেঁটে বেড়ান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার ওকল্যান্ড সিমেট্রি কিংবা লস অ্যাঞ্জেলেসের বিখ্যাত হলিউড ফরেভার সিমেট্রিতে নিয়মিত গাইডেড ট্যুর ও কালচারাল ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হয়। ছবি তোলার প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠার চেয়ে ধীরেসুস্থে কোনো শহরের নিজস্ব সংস্কৃতিকে জানার এই নতুন জোয়ারকে ট্যুরিজম স্ট্র্যাটেজি বিশেষজ্ঞ ক্যাথরিন ওয়ারিলো বলছেন, ‘টিক-বক্স ট্রাভেলের বিরুদ্ধে এক নীরব বিদ্রোহ।’

কবরস্থান ভ্রমণের সঠিক ও নৈতিক নিয়ম

প্রশ্ন হলো, যেখানে পরম শান্তিতে শুয়ে আছেন লাখো মানুষ, সেখানে একজন সচেতন পর্যটক হিসেবে আমাদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত? ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক গুরুত্ব বজায় রেখেও নৈতিকভাবে টুম্বস্টোন ট্যুরিজম সম্পন্ন করা যায়।

সচল কবরস্থানে উপাসনালয়ের মতো শ্রদ্ধা বজায় রাখতে হবে। কারণ অনেক বিখ্যাত কবরস্থান এখনো ওয়ার্কিং সিমেট্রি বা সক্রিয় সমাধিক্ষেত্র। অর্থাৎ সেখানে প্রতিদিন নতুন করে মৃতদেহের দাফন বা সমাধি দেওয়া হয়। অনেক সময় সেখানে সদ্য স্বজনহারা মানুষদের উপস্থিতি থাকে। তাই যেকোনো ধর্মনিকেতন বা উপাসনালয়ে আমরা যেভাবে মার্জিত পোশাক পরি এবং শান্তশিষ্ট আচরণ বজায় রাখি, কবরস্থানেও ঠিক তেমনটাই করা উচিত। অন্যদের সেলফি তোলা বা হইচই করা দেখে বিভ্রান্ত না হয়ে শান্ত ও শ্রদ্ধাশীল থাকা টুম্বস্টোন ট্যুরিজমের অন্যতম প্রধান শর্ত।

যুদ্ধ ও গণকবরের ক্ষেত্রে সেলফি সংস্কৃতি পরিহার করতে হবে। কম্বোডিয়ার কিলিং ফিল্ডস কিংবা সামরিক রক্তক্ষয়ের স্মারক কেন্দ্রগুলোতে যাওয়ার উদ্দেশ্য কখনোই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘আমি এখানে এসেছিলাম’ তা জাহির করা হওয়া উচিত নয়। মনস্তত্ত্ব ও ভ্রমণবিষয়ক লেখক ড্যাগনি ম্যাককিনি বলেন, ‘কিলিং ফিল্ডসের মতো সংবেদনশীল জায়গায় স্পষ্টভাবে সেলফি তুলতে নিষেধ করা থাকে। এ ধরনের জায়গায় পরিবারের স্মারক কিংবা ইনস্টাগ্রাম গ্রিডের জন্য সেলফি তোলা ভিকটিমদের প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের শামিল।’

ছবি তোলার সময় গোপনীয়তার প্রতি খেয়াল রাখা উচিত। অ্যাঙ্গার স্ট্যাচু বা শতবর্ষী পাথরের ছবি তোলার তাগিদ থাকা স্বাভাবিক। তবে গবেষণামূলক সাইট ডার্ক-ট্যুরিজম ডট কমের প্রতিষ্ঠাতা ড. পিটার হোয়েনহাউসের মতে, ছবি তোলার সময় ফ্রেমে যেন স্থানীয় কোনো শোকাতুর দর্শনার্থী চলে না আসেন, সেদিকে নজর রাখা জরুরি। এমনকি সমাধিফলকে খোদাই করা নাম জনসম্মুখে প্রকাশের আগে ক্ষেত্রবিশেষে ঝাপসা বা ব্লার করে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

প্রিয় তারকা বা পূর্বসূরির সমাধিসৌধে সঠিকভাবে শ্রদ্ধা প্রকাশ করুন। এখন বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ তাদের প্রিয় তারকা বা বংশলতিকার কবর খুঁজে বের করছেন। মেটাল ব্যান্ড ‘প্যানটেরা’র সদস্য ডাইমব্যাগ অ্যাবট বা অস্কার ওয়াইল্ডের কবরে ভক্তদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। কিন্তু শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে মদ ঢেলে দেওয়া, লিপস্টিকের দাগ ফেলে পাথর ক্ষয় করা বা জোরে গান বাজানো মোটেও কাম্য নয়।

প্যারিসের বিখ্যাত পেঁ ল্যাশেস কবরস্থানে প্রতিবছর প্রায় ৩৫ লাখ পর্যটকের সমাগম ঘটে। ছবি: উইকিপিডিয়া
প্যারিসের বিখ্যাত পেঁ ল্যাশেস কবরস্থানে প্রতিবছর প্রায় ৩৫ লাখ পর্যটকের সমাগম ঘটে। ছবি: উইকিপিডিয়া

কবরস্থান ভ্রমণের ৫ নিয়ম

ভ্রমণের আগে সেখানকার স্থানীয় প্রথা ও ইতিহাস সম্পর্কে জেনে নিন।

কোনো ঐতিহাসিক ভাস্কর্য বা প্রাচীন ফলক স্পর্শ করে তার সৌন্দর্য নষ্ট করবেন না।

গোরস্তানে শিস বাজানো বা চিৎকার করা থেকে বিরত থেকে পরিবেশের শান্ত ভাব বজায় রাখুন।

সঙ্গে কোনো চঞ্চল শিশু বা কিশোর কিংবা সেলফিপ্রেমী বন্ধু থাকলে ভ্রমণের শুরুতে তাদের নিয়মগুলো বুঝিয়ে বলুন।

নির্জন ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের কবরস্থানগুলোতে বেআইনি কর্মকাণ্ড ঘটার আশঙ্কা থাকে। তাই নিজের নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখুন।

বর্তমানের দ্রুতগতির জীবন ও স্ক্রিনের কোলাহল থেকে বাঁচতে তরুণদের কাছে এটি এক ভিন্নধারার আত্ম অন্বেষণ। কবরস্থানগুলোতে ইতিহাস আছে, শান্ত পরিবেশ আছে এবং সবচেয়ে বড় কথা—মানুষের তৈরি কোনো কৃত্রিমতা নেই। টুম্বস্টোন ট্যুরিজম জনপ্রিয়তা পেলেও ঐতিহাসিকেরা সব সময় কড়া নিরাপত্তার কথা মনে করিয়ে দেন। চলচ্চিত্র গবেষক ও বিখ্যাত গাইড কারি বাইবেল এবং গবেষক ড্যান ও’ব্রায়েন মনে করেন, যেকোনো কবরস্থানে প্রবেশের সময় নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলা উচিত।

সূত্র: ইউরো নিউজ, লোনলি প্ল্যানেট

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত