Ajker Patrika

অফিসের কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান 
অফিসের কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

সকালে অফিসে বসলেই হাতে আসে একগাদা তথ্য। কোনোটি ছবিতে, কোনোটি পিডিএফে, কোনোটি আবার পুরোনো এক্সেল ফাইলে। কোথাও হাতে লেখা তথ্য, কোথাও শত শত সারি। এগুলোর মধ্যে নির্দিষ্ট তথ্য খুঁজে বের করা, ভুল শনাক্ত করা, সারাংশ তৈরি করা কিংবা কর্তৃপক্ষকে পাঠানোর জন্য একটি বার্তা লিখতে বেশ সময় লাগে। এখন এসব কাজের অনেকটাই করা সম্ভব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে। এর জন্য সব সময় প্রযুক্তিবিদ হওয়ারও প্রয়োজন নেই। কী কাজ করতে চান এবং ফলাফলটি কেমন চান, সেটি পরিষ্কার করে বলতে পারলেই অনেক কাজ সহজ হয়ে যায়।

অফিসের কাজ করতে গিয়ে এমন বেশ কিছু ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা হয়েছে। সেখান থেকে মনে হয়েছে, দৈনন্দিন অফিসের কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তার কিছু বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরা যেতে পারে।

ছবি বা পিডিএফ থেকেও তথ্য বের করা যায়

ধরুন, একটি ছবিতে অনেক তথ্য রয়েছে। সেখানে ধারাবাহিক নম্বরসহ বেশ কিছু তথ্য লেখা আছে। পুরো ফাইলটি নিজে পড়ে তথ্য খোঁজার বদলে ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে দিয়ে নির্দিষ্ট তথ্য চাওয়া যায়। প্রয়োজন হলে সেই তথ্যের সারাংশও তৈরি করা সম্ভব। পিডিএফের ক্ষেত্রেও একইভাবে কাজ করা যায়। একসঙ্গে একাধিক ছবি বা পিডিএফ দিয়েও নির্দিষ্ট তথ্য খুঁজে বের করা বা বিভিন্ন ফাইলের তথ্য মিলিয়ে দেখা সম্ভব। হাতে লেখা নথির ক্ষেত্রেও কিছুটা সহায়তা পাওয়া যায়। হাতে লেখা কাগজের ছবি বা পিডিএফ দিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য খোঁজার চেষ্টা করা যায়। তবে লেখা অস্পষ্ট হলে ফলাফল অবশ্যই মূল নথির সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে।

চিঠি ও বার্তা তৈরির কাজ সহজ

অফিসে চিঠি ও ই-মেইল লেখার কাজ কম নয়। কী বলতে হবে, কোন ভাষায় বলতে হবে এবং বিষয়টি কীভাবে উপস্থাপন করা হবে, তা ঠিক করতেই সময় লাগে। প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে নির্দেশনা দিলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিঠির খসড়া তৈরি করে দিতে পারে। বাণিজ্যিক চিঠি, দাপ্তরিক ই-মেইল কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে পাঠানোর বার্তাও তৈরি করা যায়। একই চিঠি যদি ১০০ জন ব্যবসায়ীর নামে তৈরি করতে হয়, সে ক্ষেত্রে নাম ও প্রয়োজনীয় তথ্যের তালিকা দিয়েও আলাদা চিঠি তৈরির কাজ সহজ করা যায়।

হিসাব ও এক্সেল ফাইলেও সহায়তা

অফিসের অনেক কাজই তথ্যনির্ভর। হিসাব, বিক্রয়, মজুত, কর্মদক্ষতা কিংবা বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য সাধারণত এক্সেল ফাইলে রাখা হয়। কোনো এক্সেল ফাইলে ভুল আছে কি না বা নির্দিষ্ট শর্ত অনুযায়ী তথ্য ঠিক আছে কি না, তা পরীক্ষা করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নেওয়া যায়। কোনো সূত্র বুঝতে সমস্যা হলে সেটি কীভাবে কাজ করে, তার যুক্তি ও ব্যবহারও জানতে চাওয়া যায়। একটি এক্সেল ফাইলে যদি ২০টি পাতা থাকে, সেখান থেকে নির্দিষ্ট তথ্য নিয়ে সারাংশ তৈরির নির্দেশও দেওয়া যায়। কোন পাতা থেকে কোন তথ্য নিতে হবে, তা স্পষ্ট করে দিলে কাজটি সহজ হয়। পুরোনো ধাঁচের এক্সেল ফাইলকে আরও গোছানো ও সহজবোধ্য করার ধারণাও পাওয়া যায়। তথ্যকে ব্যবহারবান্ধব করে সাজানোর ক্ষেত্রেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগানো সম্ভব।

কাঁচা তথ্য থেকে সারাংশ

অনেক অফিসে তথ্যের অভাব নেই। সমস্যা হয় সেই তথ্য থেকে প্রয়োজনীয় বক্তব্য তৈরি করতে। ধরুন, কয়েক শ সারির কাঁচা তথ্য রয়েছে। সেগুলো পরিষ্কার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বলা হলো, এই তথ্য থেকে ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সংক্ষিপ্ত সারাংশ তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে তথ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ব্যতিক্রম, সমস্যা বা কোনো প্রবণতা খুঁজে বের করতে এটি সহায়তা করতে পারে। তবে ফলাফল যাচাই করা জরুরি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে তথ্য দেবে, তা মূল তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা উচিত।

দুই হিসাব মিলছে না? অমিল খুঁজে দেখুন

ধরুন, দুটি হিসাবের খাতা একই হওয়ার কথা, কিন্তু মিলছে না। দুই নথিই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে দিলে কোথায় অমিল রয়েছে, তা শনাক্ত করার চেষ্টা করা যায়। শুধু অমিলের জায়গা নয়, সম্ভাব্য কারণ এবং কীভাবে বিষয়টি সমাধান করা যায়, সে সম্পর্কেও পরামর্শ চাওয়া যায়। তবে চূড়ান্ত হিসাবের ক্ষেত্রে মানুষের যাচাই জরুরি। কারণ, ভুল তথ্য দিলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও ভুল ফল দিতে পারে।

কঠিন মেইল সহজ করে বুঝুন

অফিসে অনেক সময় এমন মেইল আসে, যার বক্তব্য একবার পড়ে পুরোপুরি বোঝা যায় না। তখন মেইলটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে দিয়ে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা চাওয়া যায়। প্রয়োজনে জানতে চাওয়া যায়, মূল বক্তব্য কী, কী করতে বলা হয়েছে, কোন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ এবং পরবর্তী করণীয় কী। নিজের করা কোনো কাজও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে পর্যালোচনা করা যায়। কোথায় সমস্যা রয়েছে, কোথায় উন্নতির সুযোগ আছে এবং কাজটি কীভাবে আরও ভালো করা যায়, সে বিষয়ে মতামত নেওয়া সম্ভব।

বিক্রয় প্রতিবেদন ও উপস্থাপনায় ব্যবহার

বিক্রয় বিভাগের কাজে তথ্য শুধু টেবিলে রাখলেই হয় না। ব্যবস্থাপনার কাছে সেই তথ্য সহজভাবে তুলে ধরাও প্রয়োজন। বিক্রয়ের তথ্য দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বিভিন্ন ধরনের চিত্রভিত্তিক প্রতিবেদন, বিক্রয় পর্যবেক্ষণ বোর্ড ও উপস্থাপনার কাঠামো তৈরি করা যায়। কোন তথ্য আগে দেখানো উচিত, কোন তথ্য তুলনা করা দরকার এবং

কোথায় সমস্যা রয়েছে, সেসব বিষয়ও বিশ্লেষণ করে নেওয়া যায়। প্রয়োজনীয় তথ্য দিলে উপস্থাপনার খসড়াও তৈরি করা সম্ভব। এতে তথ্য সংগ্রহের পর সেটিকে ব্যবস্থাপনার উপযোগী করে সাজাতে সময় কম লাগে।

প্রযুক্তির চেয়ে ব্যবহার জানা জরুরি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অফিসের মানুষের কাজ কেড়ে নেবে—এমন আশঙ্কা অনেকের আছে। তবে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে এটি কাজকে দ্রুত ও গোছানো করতে সহায়তা করতে পারে।

তবে সব কাজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর ছেড়ে দেওয়া ঠিক নয়। তথ্যের গোপনীয়তা, হিসাবের নির্ভুলতা এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মানুষের দায়িত্ব থেকেই যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শুধু প্রশ্ন করার মাধ্যম হিসেবে না দেখে কাজের সহকারী হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

অফিসের প্রতিদিনের কাজ একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, একই প্রযুক্তিকে আরও নানা কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। প্রযুক্তির পাশাপাশি নিজের কাজকে নতুনভাবে দেখার মানসিকতাও প্রয়োজন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত