Ajker Patrika

জননিরাপত্তায় আদর্শ শাসকের করণীয়

কাউসার লাবীব
জননিরাপত্তায় আদর্শ শাসকের করণীয়

নিরাপত্তা মানুষের জীবনের অন্যতম মৌলিক অধিকার। মানুষ যখন নিজের জীবন, পরিবার, সম্পদ ও সম্মান নিয়ে নিরাপদ বোধ করে, তখনই একটি সমাজে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নতির পরিবেশ তৈরি হয়। অন্যদিকে নিরাপত্তাহীনতা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে, সমাজে ভয় ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে। ইসলাম তাই মানুষের নিরাপত্তাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে এবং শাসকের ওপর জনগণের জানমাল ও সম্মান রক্ষার গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছে।

কোরআন কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে আল্লাহ, সার্বভৌম শক্তির মালিক, আপনি যাকে চান ক্ষমতা দান করেন এবং যার থেকে চান ক্ষমতা কেড়ে নেন। যাকে চান সম্মান দান করেন এবং যাকে চান লাঞ্ছিত করেন। সমস্ত কল্যাণ আপনারই হাতে।’ (সুরা আলে ইমরান: ২৬)

এই আয়াত শাসকের জন্য একটি মৌলিক শিক্ষা বহন করে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কোনো ব্যক্তির চিরস্থায়ী সম্পদ নয়; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত একটি দায়িত্ব। তাই ক্ষমতাসীন ব্যক্তির প্রথম কর্তব্য হলো ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত প্রতিপত্তি বা স্বার্থের মাধ্যম হিসেবে না দেখে জনগণের কল্যাণ ও নিরাপত্তার আমানত হিসেবে গ্রহণ করা।

কোরআনে আল্লাহ তাআলা ক্ষমতাপ্রাপ্ত সৎ ব্যক্তিদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেন, ‘আমি যদি তাদের পৃথিবীতে ক্ষমতা দান করি—তবে তারা নামাজ কায়েম করবে, জাকাত দেবে, সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অসৎ কাজে বাধা দেবে।’ (সুরা হজ: ৪১)। অর্থাৎ আদর্শ শাসনের অন্যতম ভিত্তি হলো সমাজে ন্যায়, শৃঙ্খলা ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়-অপরাধ প্রতিরোধ করা।

ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা শাসকের প্রধান দায়িত্ব

জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো ন্যায়বিচার। কোনো সমাজে আইন যদি দুর্বলের জন্য এক রকম এবং শক্তিশালীর জন্য অন্য রকম হয়, তাহলে সেখানে প্রকৃত নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। ইসলাম শাসককে এমন বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছে, যেখানে অপরাধী তার পরিচয় বা ক্ষমতা দিয়ে বিচার থেকে রেহাই পাবে না এবং নিরপরাধ ব্যক্তি অন্যায়ের শিকার হবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ইনসাফের সঙ্গে বিচার করবে।’ (সুরা নিসা: ৫৮)

আরও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন কাউকে ইনসাফ থেকে বিচ্যুত না করে। (সুরা মায়িদা: ৮)। অর্থাৎ ব্যক্তিগত ক্ষোভ, রাজনৈতিক বিরোধ কিংবা অতীতের অন্যায়—কোনোটিই বিচারকে অন্যায় করার অনুমতি দেয় না। একজন আদর্শ শাসকের কাছে ন্যায়বিচার হতে হবে সবার জন্য সমান।

জুলুম বন্ধ করাও নিরাপত্তার অংশ

ইসলামে শুধু মজলুমকে রক্ষা করাই নয়, জালিমকেও জুলুম থেকে বিরত রাখা দায়িত্বের অংশ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমার ভাই জালিম হোক বা মজলুম—তাকে সাহায্য করো।’ সাহাবিরা জানতে চাইলেন, জালিমকে কীভাবে সাহায্য করা হবে? তিনি বললেন, ‘তাকে জুলুম থেকে বিরত রাখবে।’ (সহিহ বুখারি: ৬৯৫২)

এই শিক্ষা রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অপরাধীকে প্রশ্রয় না দেওয়া, দুর্বলের ওপর শক্তিশালীর নিপীড়ন বন্ধ করা এবং মানুষের অধিকার রক্ষা করা—এসবই জননিরাপত্তার অপরিহার্য অংশ।

মানুষের জীবন অত্যন্ত পবিত্র

ইসলাম মানবজীবনের নিরাপত্তাকে এত গুরুত্ব দিয়েছে যে অন্যায়ভাবে একজন মানুষকে হত্যা করাকে সমগ্র মানবজাতিকে হত্যার সঙ্গে তুলনা করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে কোনো প্রাণকে হত্যা করল—প্রাণের বিনিময় বা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া—সে যেন সব মানুষকে হত্যা করল। আর যে একজনের প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন সব মানুষের প্রাণ রক্ষা করল।’ (সুরা মায়িদা: ৩২)

এ কারণে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো মানুষের জীবন রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। অপরাধ প্রতিরোধ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, নিরপরাধ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, হত্যাসহ সব ধরনের সহিংসতা দমন করা শাসকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

ইসলামের নিরাপত্তার ধারণা শুধু জীবন রক্ষায় সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের দ্বীন, জীবন, বংশধারা, সম্পদ ও বিবেক-বুদ্ধির নিরাপত্তাকেও শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিবার, সামাজিক মর্যাদা ও ব্যক্তিগত সম্মানের নিরাপত্তাও এর অন্তর্ভুক্ত।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার হাত ও মুখ থেকে মানুষ নিরাপদ থাকে। আর মুমিন সেই ব্যক্তি, যার কাছ থেকে মানুষ তাদের জীবন ও সম্পদকে নিরাপদ মনে করে।’ (সুনানে নাসায়ি: ৪৯৯৫)। এ শিক্ষা রাষ্ট্র ও নাগরিক—উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য। রাষ্ট্র যেমন নাগরিককে নিরাপত্তা দেবে, নাগরিকও অন্যের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের জন্য নিরাপদ হয়ে উঠবে।

নিরাপদ রাষ্ট্রই কল্যাণের ভিত্তি

কোরআনে কুরাইশদের প্রতি আল্লাহর নিয়ামত হিসেবে ক্ষুধা থেকে মুক্তি ও নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে—‘যিনি তাদের ক্ষুধা থেকে খাদ্য দিয়েছেন এবং ভয় থেকে নিরাপত্তা দিয়েছেন।’ (সুরা কুরাইশ: ৪)। রাসুলুল্লাহ (সা.)-ও বলেছেন, যে ব্যক্তি সকালে নিজের পরিবারসহ নিরাপদে, সুস্থ শরীরে এবং এক দিনের খাবার নিয়ে ঘুম থেকে ওঠে, তাকে যেন পুরো পৃথিবী দেওয়া হয়েছে। (সুনানে তিরমিজি: ২৩৪৬)

তাই জননিরাপত্তা একটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। যে শাসক ক্ষমতাকে আমানত মনে করেন, তিনি মানুষের জানমাল রক্ষা করেন, জুলুম প্রতিরোধ করেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেন এবং নাগরিকদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করেন। আর যে রাষ্ট্রে ইনসাফ, দায়িত্বশীলতা ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়, সেখানেই শান্তি ও স্থিতিশীলতার ভিত শক্ত হয়।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত