Ajker Patrika

ট্রাম্পের হুমকিতে ঘনীভূত হচ্ছে আরেক সংকট, রাশিয়ার দ্বারস্থ হতে পারে কিউবা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২৬, ২০: ০৯
বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন—নতুন করে আরেকটি কিউবা সংকটের সূত্রপাত হতে পারে ট্রাম্প কিউবায় হামলা চালালে। ছবি: সংগৃহীত
বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন—নতুন করে আরেকটি কিউবা সংকটের সূত্রপাত হতে পারে ট্রাম্প কিউবায় হামলা চালালে। ছবি: সংগৃহীত

ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক তুলে আনার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট একই ধরনের হুমকি দিয়েছেন প্রতিবেশী দেশ কিউবাকেও। কিউবাকে ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ আখ্যা দিয়ে তিনি দেশটির জনগণকে ‘সাহায্য’ করা দরকার বলে মন্তব্য করেছেন। আর বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্পের এই হুমকির পর হাভানা (কিউবার রাজধানী) রাশিয়ার সাহায্য চাইতে পারে আরও একবার।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের বরাতে জানা গেছে, ভেনেজুয়েলা অভিযানকে কিউবার কীভাবে দেখা উচিত—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমার মনে হয়, কিউবা এমন একটি বিষয় হতে যাচ্ছে, যা নিয়ে শেষপর্যন্ত আমাদের কথা বলতে হবে। কারণ, কিউবা এখন একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র।’

ট্রাম্প কিউবার মানুষকে ‘সাহায্য’ করার ইচ্ছাও ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা মানুষকে সাহায্য করতে চাই। বিষয়টি অনেকটা একই রকম যে, আমরা কিউবার মানুষকে সাহায্য করতে চাই, আবার যারা কিউবা থেকে বিতাড়িত হয়ে এই দেশে বসবাস করছে, তাদেরও সাহায্য করতে চাই।’

এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আভাস দিয়েছেন—ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে কিউবা। ভেনেজুয়েলা ও কিউবা—উভয় দেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মাথাব্যথা প্রসঙ্গে রুবিও বলেন, ‘আমি যদি হাভানায় থাকতাম এবং সরকারের অংশ হতাম, তাহলে অন্তত কিছুটা হলেও চিন্তিত হতাম।’

লাতিন আমেরিকায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ১৯৬১ সালে ফিদেল কাস্ত্রোকে উৎখাত করার লক্ষ্যে কিউবান নির্বাসিত ব্যক্তিদের নিয়ে চালানো ব্যর্থ ‘বে অব পিগস’ অভিযানেও যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছিল।

ভেনেজুয়েলার পর কিউবাকে নিজের তালিকায় যুক্ত করা নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যকে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক থিংকট্যাংক ভালদাই ডিসকাশন ক্লাবের সদস্য আন্দ্রে কর্তুনভ। তিনি বলেন, ‘অবশ্যই কিউবা ভেনেজুয়েলা থেকে একেবারেই আলাদা। লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রথাগত বিরোধী শক্তি হিসেবে কিউবা ৬০ বছরের বেশি সময় ধরে টিকে রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র কিউবার কিছুই করতে পারেনি। তাই আমি মনে করি, ভেনেজুয়েলার তুলনায় কিউবার শাসনব্যবস্থা অনেক বেশি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল।’

আন্দ্রে কর্তুনভ আরও যোগ করেন, ‘তবে নিশ্চিতভাবেই কিউবা আরও প্রযুক্তিগত ও সামরিক সহায়তার জন্য মস্কোর দ্বারস্থ হতে পারে। আমার মনে হয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে মস্কোও কিউবাকে আরও সামরিক সরঞ্জাম ও রাজনৈতিক সমর্থন জোগাতে উৎসাহিত হবে।’

লাতিন আমেরিকার রাজনীতির ইতিহাসে ১৯৬২ সালের কিউবা সংকটের ১৩টি দিন ছিল চরম উত্তেজনার। স্নায়ুযুদ্ধের সেই দিনগুলোতে কিউবাকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমানে রাশিয়া যার উত্তরাধিকার বহন করছে) কার্যত মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। পৃথিবী তখন পরমাণু যুদ্ধের একেবারে কিনারায় ছিল।

সংকটের সূত্রপাত ১৯৫৯ সালে। ফিদেল কাস্ত্রো যখন কিউবায় বিপ্লব ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করলেন, তখন থেকেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে হাভানার সম্পর্কের অবনতি হতে শুরু করে। এরপর ১৯৬১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মদদে চালানো ‘বে অব পিগস’ আক্রমণ ব্যর্থ হলে কাস্ত্রো নিরাপত্তার খাতিরে সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে হাত বাড়ান। তৎকালীন সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ সুযোগটি লুফে নেন। তিনি গোপনে কিউবায় পরমাণু অস্ত্রবাহী ব্যালিস্টিক মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত নেন।

১৯৬২ সালের ১৪ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের একটি গোয়েন্দা বিমান কিউবার ওপর দিয়ে ওড়ার সময় সেই ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির ছবি তুলে ফেলে। প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি খবরটি পাওয়ার পর স্তব্ধ হয়ে যান। যুক্তরাষ্ট্রের দোরগোড়ায় সোভিয়েত পরমাণু অস্ত্রের উপস্থিতি ছিল এক বিরাট হুমকি। কেনেডি দ্রুত কিউবাকে চারপাশ থেকে নৌবাহিনী দিয়ে অবরুদ্ধ বা ‘কোয়ারেন্টাইন’ করার নির্দেশ দেন, যাতে কোনো সোভিয়েত জাহাজ সেখানে পৌঁছাতে না পারে।

সোভিয়েত জাহাজগুলো যখন মার্কিন নৌবাহিনীর ব্যারিকেডের দিকে এগিয়ে আসছিল, তখন সারা বিশ্ব আতঙ্কে প্রহর গুনছিল—এই বুঝি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলো। কিন্তু শেষপর্যন্ত শুভবুদ্ধির উদয় হয়। পর্দার আড়ালে চলে গোপন কূটনৈতিক তৎপরতা। অবশেষে সে বছরের ২৮ অক্টোবর একটি সমঝোতা হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবা থেকে তাদের সব ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে নিতে রাজি হয়। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি দেয় যে, তারা কোনো দিন কিউবা আক্রমণ করবে না। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র গোপনে তুরস্ক থেকে তাদের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র সরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারেও রাজি হয়েছিল।

এই সংকট কাটলেও এর রেশ ছিল দীর্ঘস্থায়ী। এর পর থেকে ওয়াশিংটন ও মস্কোর মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের জন্য ‘হটলাইন’ব্যবস্থা চালু করা হয়। তবে কিউবার ওপর মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও বৈরী সম্পর্ক আজও সেই ইতিহাসের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে। এই ইতিহাসের আলোকেই ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র যদি আবারও কিউবার দিকে হাত বাড়ায়, তাহলে হয়তো হাভানা ফের ঐতিহাসিক মিত্র মস্কোর দ্বারস্থ হতে পারে এবং এমনটা হলে—যদিও ৬৩ বছর আগের আর বর্তমান প্রেক্ষাপট এক নয়—হয়তো আবারও একটি কিউবা সংকটের সূচনা হতে পারে।

তথ্যসূত্র: লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস, আল–জাজিরা ও ইকোনমিক টাইমস

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত