প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আহত সৈন্যদের বাঁচাতে গিয়ে নিহত যাজককে সন্ত ঘোষণার উদ্যোগ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আহত ও মৃত্যুপথযাত্রী সৈন্যদের সহায়তা করতে গিয়ে প্রাণ হারানো আইরিশ ক্যাথলিক যাজক ফাদার উইলি ডয়েলকে সন্ত ঘোষণার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে যাচ্ছে ক্যাথলিক চার্চ। এ লক্ষ্যে রোববার (১৮ অক্টোবর) আয়ারল্যান্ডের মুলিঙ্গার ক্যাথেড্রালে বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানের পর তাঁর জীবন, কর্ম ও ধর্মীয় অবদানসংক্রান্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার পৃষ্ঠার নথি ভ্যাটিকানে পাঠানো হবে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ জানায়, ফাদার ডয়েল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ১৬ তম আইরিশ ডিভিশনের সামরিক যাজক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সোম, মেসিনেস ও পাসশেনডেলের মতো ভয়াবহ যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈন্যদের সহায়তায় তিনি অসাধারণ সাহসিকতার পরিচয় দেন। শত্রুপক্ষের গোলাবর্ষণের মধ্যেও তিনি বারবার দুই বাহিনীর মধ্যবর্তী বিপজ্জনক এলাকায় গিয়ে আহত সৈন্যদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনতেন এবং মৃত্যুপথযাত্রীদের সান্ত্বনা দিতেন।
১৯১৭ সালের ১৬ আগস্ট পাসশেনডেলের যুদ্ধে আহত দুই প্রোটেস্ট্যান্ট সৈন্যকে সাহায্য করতে গিয়ে গোলার আঘাতে নিহত হন ফাদার উইলি ডয়েল। ভিন্ন খ্রিষ্টীয় সম্প্রদায়ের সৈন্যদের সেবা করতে গিয়ে প্রাণ দেওয়ায় আয়ারল্যান্ডের ক্যাথলিক চার্চ তাঁকে ‘খ্রিষ্টীয় ঐক্যের জন্য দাতব্য সেবায় আত্মোৎসর্গকারী শহীদ’ হিসেবে বিবেচনা করে।
সাহসিকতার জন্য সামরিক পদক
১৮৭৩ সালে ডাবলিনের ডালকিতে জন্ম নেওয়া উইলি ডয়েলের পুরো নাম উইলিয়াম জোসেফ গ্যাব্রিয়েল ডয়েল। ১৮ বছর বয়সে তিনি জেসুইট যাজক হওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেন। চল্লিশের কোঠায় পৌঁছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রণাঙ্গনে দায়িত্ব পান। সোমের যুদ্ধে সাহসিকতার জন্য তিনি মিলিটারি ক্রস পদক লাভ করেন এবং একাধিকবার সামরিক প্রতিবেদনে তাঁর বীরত্বের উল্লেখ করা হয়।
১৬ তম আইরিশ ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল স্যার উইলিয়াম বার্নার্ড হিকি তাঁকে নিজের দেখা সবচেয়ে সাহসী মানুষ বলে অভিহিত করেছিলেন। আহত জার্মান যুদ্ধবন্দিদের প্রতিও তাঁর সহমর্মিতা ও দয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ফাদার ডয়েলের জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণাকারী ‘ফাদার উইলি ডয়েল অ্যাসোসিয়েশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা প্যাট্রিক কেনি বিবিসি নিউজ এনআইকে বলেন, ডয়েলের জীবন ছিল বীরত্ব ও পবিত্রতায় পরিপূর্ণ। ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত সংগঠনটি তাঁর সন্ত ঘোষণার উদ্যোগে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
ডয়েলের লেখা অসংখ্য চিঠিও ইতিহাসবিদদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এসব চিঠির মাধ্যমে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আইরিশ সৈন্যদের অভিজ্ঞতা, দুর্ভোগ ও জীবনযাপনের নানা দিক জানা যায়।
সন্ত ঘোষণার প্রক্রিয়া
ক্যাথলিক চার্চে কাউকে সন্ত ঘোষণা করার প্রক্রিয়ায় একাধিক ধাপ রয়েছে, যা সম্পন্ন হতে বহু বছর লাগতে পারে। ফাদার ডয়েলের ক্ষেত্রে ২০২২ সালে মিটের ডায়োসিস পর্যায়ে তদন্ত শুরু হয়। তাঁর লেখার ধর্মতাত্ত্বিক মূল্য, জীবন ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং তাঁর দ্বারা অনুপ্রাণিত মানুষের ধর্মীয় অভিজ্ঞতা নিয়ে বিস্তৃত অনুসন্ধান চালানো হয়েছে।
মিটের বিশপ টম ডিনিহান বলেন, জাতীয়তা ও ধর্মীয় সম্প্রদায় যখন বিভাজনের কারণ হয়ে উঠতে পারে, তখন ফাদার ডয়েলের জীবন ও আদর্শ বর্তমান সময়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। তাঁর আধ্যাত্মিকতা তরুণ প্রজন্মের কাছেও বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
রোববারের অনুষ্ঠানটি মূলত এই প্রক্রিয়ায় সংঘটিত তদন্তের চূড়ান্ত প্রকাশ্য অধিবেশন। এরপর নথিপত্র সিলমোহর করে রোমে পাঠানো হবে। তবে ভ্যাটিকানে নথি জমা দেওয়া মানেই সন্ত ঘোষণা নয়; এটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপের সূচনা। মিটের বিশপ আশা প্রকাশ করেছেন, ফাদার ডয়েলকে সন্ত ঘোষণার আবেদন সফল হবে।









