Ajker Patrika

শরিয়া তহবিলের অর্থ গেছে গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যায় সহায়তাকারী ৫ প্রতিষ্ঠানে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
শরিয়া তহবিলের অর্থ গেছে গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যায় সহায়তাকারী ৫ প্রতিষ্ঠানে
গাজায় গণহত্যায় ইসরায়েলকে সহায়তাকারী ৫ প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছে এইচএসবিসি ব্যাংকের শরিয়া তহবিল। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাজ্যের ইসলামি শরিয়াসম্মত সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ তহবিল ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্কিত একাধিক কোম্পানির শেয়ার কিনতে ১৩ কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ ব্যয় করেছে। এই বিষয়টি এমন এক সময়ে সামনে এল যখন, ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংস হামলা ও নিপীড়ন চালাচ্ছে এবং দক্ষিণ লেবানন দখল করে রেখেছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে প্যালান্টির, আরটিএক্স, অ্যানালগ ডিভাইসেস, হানিওয়েল ও রোলস-রয়েসের শেয়ার কিনেছে ব্যাংকটির ইসলামিক গ্লোবাল ইকুইটি ইনডেক্স ফান্ডের ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্কিত এই কোম্পানিগুলোর শেয়ার কিনতে ১৩ কোটি ৩৫ লাখ ডলার বিনিয়োগের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্যালান্টির যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য বিশ্লেষণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি কোম্পানি, আরটিএক্স প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাতা কোম্পানি, অ্যানালগ ডিভাইসেস সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানি, হানিওয়েল বহুজাতিক প্রযুক্তি ও প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান এবং রোলস-রয়েস ব্রিটিশ ইঞ্জিন নির্মাতা কোম্পানি। এসব কোম্পানির পণ্য, প্রযুক্তি বা সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে ইসরায়েলি সামরিক কার্যক্রমের সম্পর্ক রয়েছে বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মিডল ইস্ট আই ও হাইফেন নামক সংবাদমাধ্যম প্রথম এই বিনিয়োগের তথ্য প্রকাশ করে। বিনিয়োগের অঙ্ক, কোম্পানিগুলোর সামরিক সংশ্লিষ্টতা এবং শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের প্রচলিত যাচাইপদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে ইসলামি অর্থব্যবস্থার বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কোনো কোম্পানির প্রধান ব্যবসার ধরন যাচাই করাই যথেষ্ট নয়; তার পণ্য কোথায় এবং কী উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

৮০০ কোটি ডলারের বেশি সম্পদের তহবিল

এইচএসবিসির ইসলামিক গ্লোবাল ইকুইটি ইনডেক্স ফান্ডের সম্পদের পরিমাণ ৮০০ কোটি ডলারের বেশি। তহবিলটি বিনিয়োগকারীদের সঞ্চিত অর্থ বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে। ধারণা করা হয়, এর বিনিয়োগকারীদের অধিকাংশই মুসলিম। ব্যাংকটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, তহবিলটি বিনিয়োগ থেকে মুনাফা অর্জনের পাশাপাশি সামগ্রিক সমাজের জন্য ভালো ফলাফল বয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত হয়। এইচএসবিসি তার ইসলামি বিনিয়োগ দর্শনকে ‘সমাজের উন্নতিসাধনকারী নৈতিক বিনিয়োগ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

তহবিলটির নিয়ম অনুযায়ী, ইসলামি নীতিমালায় নিষিদ্ধ বলে বিবেচিত ব্যবসা ও আর্থিক কার্যক্রম এড়িয়ে চলার কথা। বিনিয়োগের শরিয়াহসম্মততা তদারকির জন্য ব্যাংকটির একটি স্বাধীন ইসলামি কমিটি রয়েছে, যাতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দুজন মুসলিম আলেম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এইচএসবিসির নিজস্ব বিনিয়োগনীতি অনুযায়ী, কোনো কোম্পানির আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ যেন ইসলামি নীতিতে নিষিদ্ধ উৎস থেকে না আসে, তা নিশ্চিত করার কথা। এসব নিষিদ্ধ উৎসের মধ্যে অস্ত্র-সংশ্লিষ্ট পণ্য ও সেবা বিক্রিও রয়েছে। তবে তহবিলটির বিনিয়োগের তথ্য প্রকাশিত হওয়ার পর প্রশ্ন উঠেছে, অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত কোম্পানিগুলো কীভাবে এই যাচাইপ্রক্রিয়ায় উত্তীর্ণ হয়েছে।

কোন কোম্পানিতে কত বিনিয়োগ

প্যালান্টির: ৩ কোটি ৮৩ লাখ ডলার

প্যালান্টিরের শেয়ার কিনতে এইচএসবিসির তহবিল ৩ কোটি ৮৩ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেছে বলে হাইফেন জানিয়েছে। প্যালান্টিরের সফটওয়্যার বিপুল পরিমাণ তথ্য একত্র করে বিশ্লেষণ করতে পারে। সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তথ্য বিশ্লেষণ এবং অভিযানসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্যালান্টির ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একটি কৌশলগত অংশীদারত্বের ঘোষণা দেয়। এর উদ্দেশ্য ছিল ‘যুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট মিশনে’ সহায়তা করা। একই সময়ে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ ইসরায়েলের প্রতি সংহতি জানিয়ে তেল আবিবে বৈঠক করে। ২০২৫ সালের জুনে প্রকাশিত জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্যালান্টির ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর প্রতি সহায়তা বাড়িয়েছে। প্রতিবেদনটিতে এমন বিশ্বাস করার ‘যৌক্তিক ভিত্তি’র কথা বলা হয় যে কোম্পানিটি স্বয়ংক্রিয় পূর্বাভাসভিত্তিক পুলিশিং প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে, যা যুদ্ধক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, তথ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং লক্ষ্যবস্তুর তালিকা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে ‘ল্যাভেন্ডার’, ‘গসপেল’ ও ‘হোয়ারস ড্যাডি?’ নামে পরিচিত এআই ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করা হয়।

এ ছাড়া বিভিন্ন প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী প্যালান্টিরের প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইরানের মিনাব শহরের একটি স্কুলকে ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। ২৮ ফেব্রুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধের প্রথম দিনে ওই হামলায় ১৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন, যাঁদের অধিকাংশই শিশু। জাতিসংঘের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও বলেছেন, প্যালান্টিরের মতো প্রযুক্তি ইসরায়েলি সেনাবাহিনী কত দ্রুত এবং কত ব্যাপকভাবে মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারবে, তা নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।

আরটিএক্স: ৩ কোটি ৫৭ লাখ ডলার

মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এইচএসবিসির তহবিল আরটিএক্স করপোরেশনের ৩ কোটি ৫৭ লাখ ডলারের শেয়ার কিনেছে। আরটিএক্স যুক্তরাষ্ট্রের একটি বৃহৎ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। এর ব্যবসার মধ্যে রয়েছে রেথিয়ন, যা ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সামরিক প্রযুক্তি তৈরি করে।

রেথিয়নের মাধ্যমে আরটিএক্স ইসরায়েল সরকারের মালিকানাধীন রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমসের সঙ্গে অংশীদারত্বে কাজ করে। এই সহযোগিতার আওতায় ইসরায়েলের আয়রন ডোম আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন যন্ত্রাংশ এবং ‘তামির’ প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা হয়। দুই কোম্পানি যৌথভাবে ডেভিডস স্লিং নামের আরেকটি ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও তৈরি করেছে।

রেথিয়ন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর জন্য টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং এমআইএম-১০৪ প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা তৈরি করে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এসব অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। কোম্পানিটি এফ-সিরিজের যুদ্ধবিমানেও ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে, যেসব বিমানের কিছু অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মোতায়েন রয়েছে।

অ্যানালগ ডিভাইসেস: ২ কোটি ৩০ লাখ ডলার

এইচএসবিসি যুক্তরাষ্ট্রের সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানি অ্যানালগ ডিভাইসেসের শেয়ার কিনতে ২ কোটি ৩০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেছে। কোম্পানিটির তৈরি ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ নজরদারি ব্যবস্থা, উড়োজাহাজ এবং নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম অস্ত্রে ব্যবহৃত হয়। গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার সময় অ্যানালগ ডিভাইসেস ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় বেসরকারি অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এলবিট সিস্টেমসের কাছে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সরবরাহ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে আয়ারল্যান্ডের অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম দ্য ডিচ জানায়, অ্যানালগ ডিভাইসেস ইন্টারন্যাশনাল নামে কোম্পানিটির আয়ারল্যান্ডে নিবন্ধিত সহযোগী প্রতিষ্ঠান ২০২৪ সালের আগস্ট, অক্টোবর ও নভেম্বরে ফিলিপাইনে অবস্থিত কারখানা থেকে এলবিট সিস্টেমসের কাছে যন্ত্রাংশ পাঠিয়েছিল।

হানিওয়েল: ১ কোটি ৮৯ লাখ ডলার

এইচএসবিসির তহবিল যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান হানিওয়েল ইন্টারন্যাশনালের ১ কোটি ৮৯ লাখ ডলারের শেয়ার কিনেছে। হানিওয়েল বিভিন্ন ধরনের সামরিক অস্ত্রে ব্যবহৃত সেন্সর, পরিমাপক যন্ত্র এবং লক্ষ্যনির্দেশক প্রযুক্তির নকশা ও সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত।

আল জাজিরার ২০২৪ সালের একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুনে মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে জাতিসংঘ পরিচালিত আল-সারদি স্কুলে ইসরায়েলি হামলায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের একটি পরিমাপক ইউনিট হানিওয়েল তৈরি করেছিল। ওই হামলায় প্রায় ৪০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হন, যাঁদের মধ্যে অন্তত ১৪ জন শিশু এবং ৯ জন নারী ছিলেন। ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্য নির্ধারণে নির্ভুলতা বাড়াতে এ ধরনের ইউনিট ব্যবহৃত হয়।

রোলস-রয়েস: ১ কোটি ৭৬ লাখ ডলার

এইচএসবিসি রোলস-রয়েস হোল্ডিংসে ১ কোটি ৭৬ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেছে। প্রতিবেদনে চিহ্নিত পাঁচটি কোম্পানির মধ্যে এটিই একমাত্র ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান। রোলস-রয়েস সামরিক উড়োজাহাজ ও সাঁজোয়া যানের জন্য ইঞ্জিন এবং চালিকাশক্তি সরবরাহকারী ব্যবস্থা তৈরি করে। এর জার্মান সহযোগী প্রতিষ্ঠান এমটিইউ অ্যারো ইঞ্জিন ইসরায়েলি সামরিক যানবাহনের জন্য শক্তি সরবরাহকারী ব্যবস্থা দিয়েছে। এসব যানবাহনের মধ্যে রয়েছে মারকাভা ট্যাংক, নামের সাঁজোয়া কর্মীবাহী যান এবং এইতান সাঁজোয়া যান।

২০২৩ সালে রোলস-রয়েস সলিউশন্স আমেরিকা ইসরায়েলের এইতান সাঁজোয়া যানের জন্য শক্তি সরবরাহকারী প্যাকেজ দেওয়ার একটি মার্কিন সামরিক চুক্তি পায়। পরে এই চুক্তির জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করা হয়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র এইতান যানের জন্য আরও ইঞ্জিন বিক্রির সম্ভাব্য ১৮ কোটি ডলারের চুক্তিতে অনুমোদন দেয়।

পাঁচটি কোম্পানিতে এইচএসবিসির বিনিয়োগের অঙ্ক যোগ করলে মোট দাঁড়ায় ১৩ কোটি ৩৫ লাখ ডলার।

শরিয়াহ যাচাইপদ্ধতি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন

ইসলামি অর্থব্যবস্থার বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো তহবিল শরিয়াহসম্মত কি না, তা নির্ধারণের জন্য বিভিন্ন মানদণ্ড ব্যবহৃত হয়। এসব মানদণ্ডের মধ্যে পার্থক্য থাকায় একই কোম্পানি এক সূচকে গ্রহণযোগ্য হলেও অন্য সূচকে অগ্রহণযোগ্য হতে পারে। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাউদাম্পটন বিজনেস স্কুলের ইসলামি অর্থব্যবস্থা-বিষয়ক প্রভাষক ওয়াহিউ জাতমিকো আল জাজিরাকে বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ইসলামি নীতিমালাকে বাস্তব প্রয়োগের উপযোগী নিয়মে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে আলেমদের ভূমিকা রয়েছে। তবে তাঁদের সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধিবিধান ও বাণিজ্যিক চাপের মধ্যেও প্রভাবিত হতে পারে।

জাতমিকো বলেন, এসঅ্যান্ডপির সাধারণ ইসলামি সূচকগুলোতে প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোকে সরাসরি বাদ দেওয়া হয় না। অন্যদিকে, ডাও জোন্স ইসলামিক মার্কেট সূচকগুলো তাদের যাচাইপদ্ধতি অনুযায়ী প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোকে বাদ দেয়।

এই পার্থক্য থেকেই বোঝা যায়, ইসলামি বিনিয়োগের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে একক ও সর্বজনস্বীকৃত পদ্ধতি নেই।

ডারহাম ইউনিভার্সিটির বিজনেস স্কুলের অর্থায়ন বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ ইব্রাহিম এই যাচাইপদ্ধতির একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ ফাঁক’ চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, সাধারণত কোম্পানির ঘোষিত প্রধান ব্যবসার ধরন যাচাই করা হয়; কিন্তু পণ্যের চূড়ান্ত ব্যবহার কিংবা ক্রেতার পরিচয় যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।

ইব্রাহিম বলেন, কোনো কোম্পানিকে প্রযুক্তি বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হলে সেটি প্রাথমিক যাচাইয়ে উত্তীর্ণ হতে পারে, এমনকি তার পণ্য শেষ পর্যন্ত অস্ত্রব্যবস্থায় ব্যবহৃত হলেও। তাঁর ভাষায়, এইচএসবিসির ঘটনাটি ঠিক এই সমস্যাকেই তুলে ধরে। তিনি আরও বলেন, প্রচলিত যাচাইপদ্ধতিতে কোম্পানির সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করে দেখা হয় না, যাতে বোঝা যায় তাদের যন্ত্রাংশ বেসামরিক মানুষের ক্ষতিসাধনে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না।

ইব্রাহিমের মতে, কোনো বিনিয়োগ কারিগরিভাবে ইসলামি অর্থব্যবস্থার নিয়ম মেনে চলতে পারে, কিন্তু নৈতিকভাবে ইসলামি নীতির সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ হতে পারে। এইচএসবিসির ঘটনা সেই ব্যবধানকে স্পষ্ট করেছে।

‘মাকাসিদুশ শরিয়াহ’ ও মানুষের জীবন রক্ষার প্রশ্ন

ইব্রাহিম বলেন, ইসলামি আইনের উচ্চতর উদ্দেশ্য বা ‘মাকাসিদুশ শরিয়াহ’র মধ্যে মানুষের জীবন রক্ষা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা অন্তর্ভুক্ত। যথাক্রমে ‘হিফজুন নাফস’ ও ‘আদল’ নামে পরিচিত এই নীতিগুলোকে কেবল কোনো ব্যবসায়িক খাতকে অনুমোদিত বা নিষিদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত করার যান্ত্রিক পদ্ধতির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যায় না।

তাঁর মতে, বিনিয়োগ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে অস্ত্র উৎপাদন বা সামরিক চুক্তির সঙ্গে যেকোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা থাকলে তা পর্যালোচনার জন্য নির্দিষ্ট সীমা থাকা উচিত। একই সঙ্গে কোম্পানির পরোক্ষ সামরিক সংশ্লিষ্টতা যাচাই এবং পণ্যের চূড়ান্ত ব্যবহার অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।

ইব্রাহিম বলেন, বর্তমান ব্যবস্থা নিয়মতান্ত্রিকভাবে এসব কাজ করে না। বরং এটি কোম্পানির খাতভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস ও আর্থিক অনুপাতের ওপর নির্ভর করে; সরবরাহব্যবস্থা এবং পণ্যের চূড়ান্ত ব্যবহার যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।

তাঁর মতে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্কিত কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগ করে এইচএসবিসি মুসলিম গ্রাহকদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, তহবিলটি মুসলিম সঞ্চয়কারীদের কাছে শরিয়াহসম্মত হিসেবে বাজারজাত করা হয় এবং তাঁদের অনেকেই হালাল পেনশন প্রকল্পের মাধ্যমে এতে বিনিয়োগ করেন।

ইব্রাহিমের ভাষায়, এসব বিনিয়োগকারীর যুক্তিসংগত প্রত্যাশা হলো, তাঁদের অর্থ এমন কোম্পানিকে সহায়তা করবে না, যেগুলো বেসামরিক মানুষের ক্ষতিসাধনের সঙ্গে জড়িত।

এইচএসবিসির প্রতিক্রিয়া

আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এইচএসবিসির একজন মুখপাত্র বলেন, এ ধরনের তহবিল যেন বিনিয়োগকারীদের মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটায়, তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, ব্যাংকটি তা বোঝে। তিনি বলেন, গ্রাহকদের উদ্বেগকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। স্বাধীন বিশেষজ্ঞ উপদেষ্টাদের সঙ্গে নিয়ে ব্যাংকটি বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করবে, যাতে বোঝা যায় বর্তমান পদ্ধতি বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণ করছে কি না।

মুখপাত্র আরও বলেন, ব্যাংকটি দ্রুত পর্যালোচনা সম্পন্ন করার এবং প্রয়োজনীয় কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে গ্রাহকদের তা জানানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।

তবে প্রকাশিত বিবৃতিতে পর্যালোচনার ফলাফল, সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ার বিক্রি করা হবে কি না কিংবা ভবিষ্যতে বিনিয়োগ যাচাইপদ্ধতিতে কী পরিবর্তন আনা হবে, সে বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।

বিনিয়োগ ও সরাসরি সামরিক অর্থায়নের পার্থক্য

উল্লিখিত বিনিয়োগের তথ্য থেকে সরাসরি বলা যায় না যে এইচএসবিসি নির্দিষ্ট কোনো সামরিক অভিযানকে সরাসরি অর্থ দিয়েছে। শেয়ার কেনার মাধ্যমে কোনো কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা এবং নির্দিষ্ট সামরিক অভিযানকে সরাসরি অর্থায়ন করা এক বিষয় নয়। একইভাবে, পাঁচটি কোম্পানির সব পণ্য বা ব্যবসায়িক কার্যক্রম ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে ব্যবহৃত হয়, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না।

তবে এসব কোম্পানির সামরিক সংশ্লিষ্টতা এবং তাদের পণ্য ও প্রযুক্তির সম্ভাব্য ব্যবহার বিনিয়োগের নৈতিকতা যাচাইয়ের প্রশ্নকে সামনে এনেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কোম্পানির প্রধান ব্যবসার ধরন কিংবা আর্থিক অনুপাতের ভিত্তিতে বিনিয়োগের শরিয়াহসম্মততা নির্ধারণ করলে পরোক্ষ সামরিক সংশ্লিষ্টতা উপেক্ষিত থেকে যেতে পারে।

এইচএসবিসির ঘটনাটি তাই শুধু একটি ব্যাংকের বিনিয়োগ নিয়ে বিতর্ক নয়; এটি শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের মানদণ্ড, সরবরাহব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীদের নৈতিক প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন তৈরি করেছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত