Ajker Patrika

ফের বিক্ষোভের প্রস্তুতি ফ্রান্সে, মাখোঁর পদত্যাগ দাবি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৫: ০৫
ফের বিক্ষোভের প্রস্তুতি ফ্রান্সে, মাখোঁর পদত্যাগ দাবি
রোববার সন্ধ্যায় প্যারিসের কেন্দ্রস্থলে বিক্ষোভকারীরা আগুন ধরিয়ে দেয়। ছবি: দ্য টেলিগ্রাফ

ফ্রান্সে শনিবার দেশজুড়ে নতুন করে বিক্ষোভের প্রস্তুতি চলছে। এক সপ্তাহ আগে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতার মুখে পড়েছিল দেশটি। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে ফরাসি কর্তৃপক্ষ।

দেশজুড়ে বিক্ষোভের ওপর ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও দ্বিতীয় দফার বিক্ষোভে প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে লাখ লাখ মানুষ জড়ো হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। শিক্ষার্থী, শ্রমিক ইউনিয়ন ও সরকারবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠী এ কর্মসূচির আয়োজন করেছে।

১৭ অক্টোবরের সহিংসতার ব্যাপকতা আগে থেকে আঁচ করতে না পারার অভিযোগে বিরোধী দলগুলোর সমালোচনার মুখে পড়েছিল সরকার। এর পরিপ্রেক্ষিতে শনিবার নিরাপত্তা জোরদার করতে ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেন, ‘আমরা কোনো কিছুই বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেব না।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভাঙচুরকারীদের, লুটেরাদের এবং সহিংসতায় জড়িত সবাইকে কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে।’ তাঁর ভাষ্য, নির্ধারিত বিক্ষোভের বাইরেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বামপন্থী ও কট্টর বামপন্থী’ গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে সহিংসতার বহু আহ্বান দেখা গেছে।

গত কয়েক দিনে দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়ায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় শত শত মানুষকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

গত শুক্রবার উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। শিক্ষার্থীরা জানান, তাঁদের প্রতি মাখোঁ স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে একই সঙ্গে তাঁরা বলেন, শিক্ষার্থীদের ‘সংগঠিত হওয়া ও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া উচিত’।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে মাখোঁ নির্দেশ দিয়েছিলেন, শনিবার শুধু স্বীকৃত শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর আয়োজিত বিক্ষোভই অনুষ্ঠিত হতে পারবে। লিয়ঁ, নিস, মন্টপেলিয়েরসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহর আরও কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে সব ধরনের জমায়েতের ওপর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে।

তবে সরকারি ঘোষণায় আন্দোলনকারীদের তেমন দমে যেতে দেখা যাচ্ছে না। ফ্রান্সজুড়ে ছোট-বড় শত শত বিক্ষোভের কর্মসূচি পরিকল্পনা করা হয়েছে। গত এক সপ্তাহে রাজধানীর কিছু এলাকাসহ কয়েকটি শহরে আংশিক কারফিউ জারি ছিল। এখন কোন শহরে কতটা বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হবে, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষের অবস্থানে ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে।

কিছু শহরের মেয়র ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখলেও অন্যরা কর্তৃপক্ষের কাছে নিবন্ধিত বিক্ষোভের অনুমতি দিয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে মার্সেইয়ের কথা বলা যায়। সেখানে সব ধরনের বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করে আগের জারি করা আদেশ দ্রুত প্রত্যাহার করা হয়, যাতে শ্রমিক ইউনিয়নের আয়োজিত মিছিলটি অনুষ্ঠিত হতে পারে।

প্যারিসে শিক্ষার্থীদের শ্রমিক ইউনিয়নের আয়োজিত একটি মিছিলকে শ্রমিক সংগঠনগুলো সমর্থন দিয়েছে। তবে মিছিলটি শহরের কেন্দ্রস্থল দিয়ে যেতে পারবে না বলে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও রাজধানীর পরিচিত কয়েকটি এলাকায় নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলন কীভাবে বৃহত্তর সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রূপ নিয়েছে, তার একটি ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ বা হলুদ জ্যাকেট আন্দোলনের পুনরুত্থানে। শনিবার ফ্রান্সজুড়ে এই আন্দোলনের সমর্থকদেরও ব্যাপকভাবে রাস্তায় নামতে দেখা যেতে পারে। বাম ও ডান—উভয় রাজনৈতিক ধারার মানুষের সমর্থন পাওয়া এই আন্দোলন মাখোঁর প্রথম মেয়াদে বড় ধরনের অচলাবস্থা ও বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল।

আন্দোলনটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ওয়েবসাইটে শনিবারের জন্য ৫০০টির বেশি বিক্ষোভ এবং আরও প্রায় ২০০টি কর্মসূচির তালিকা দেওয়া হয়েছে। ওয়েবসাইটে মাখোঁর পদত্যাগও দাবি করা হয়েছে। অনলাইনে দেওয়া কর্মসূচির আহ্বানে গোষ্ঠীটি বলেছে, ১৭ অক্টোবরের সহিংসতা নিয়ে ‘ক্ষোভ প্রকাশের সম্মিলিত কণ্ঠে আমরা আমাদের কণ্ঠ যোগ করতে অস্বীকার করছি’। একই সঙ্গে পুলিশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলার অভিযোগ তুলেছে তারা।

গত সপ্তাহের সহিংসতার ধকল এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি ফ্রান্স। ওই সময় বিক্ষোভকারী ও দাঙ্গাকারীদের তুলনায় পুলিশ সদস্যের সংখ্যা অনেক কম ছিল। দোকানপাট লুট করা হয় এবং বিভিন্ন ভবনে আগুন দেওয়া হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রতীকী ঘটনা ছিল লিমোজ শহরের উনিশ শতকে নির্মিত অলংকৃত নগর ভবনে অগ্নিসংযোগ।

শুক্রবার বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানাঁ জানান, ১৭ অক্টোবরের দাঙ্গায় জড়িত থাকার অভিযোগে ২৩২ জনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে এবং ১ হাজার ১০০ জনের বেশি মানুষ আদালতে হাজির হয়েছেন। এসব মামলার মধ্যে প্রায় ২৬০টিতে ‘সংগঠিত অপরাধী চক্রের কার্যক্রমে’ জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।

লুটপাট বা পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার দায়ে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে কৌঁসুলিদের নির্দেশ দিয়েছেন দারমানাঁ। এসব ব্যবস্থার মধ্যে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা, ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বাধা দেওয়ার বিষয়ও রয়েছে।

ফ্রান্সের সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ক্রমেই বাড়ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে চলেছে। একই সঙ্গে ঋণের ক্রমবর্ধমান বোঝা সামাল দিতে ভবিষ্যতের যেকোনো সরকারকে সরকারি ব্যয়ে বড় ধরনের কাটছাঁট করতে হতে পারে বলে সতর্ক করা হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশটির গভীর রাজনৈতিক মেরুকরণ। এক প্রজন্মের মধ্যে সবচেয়ে বিভাজনমূলক ও অনিশ্চিত নির্বাচনী সময়ের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ফ্রান্স।

আগামী বসন্তে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ছাড়বেন মাখোঁ। জনমত জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, তাঁর মধ্যপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলনের কোনো প্রার্থী মে মাসে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের দ্বিতীয় পর্বে উঠতে ব্যর্থ হতে পারেন। ওই পর্বে সাধারণত শীর্ষ দুই প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

এমন পরিস্থিতিতে ফরাসি ভোটারদের সামনে কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র‍্যালি এবং কট্টর বামপন্থী লা ফ্রঁস ইনসুমিজের (অবনত নয়, অর্থাৎ আপসহীন ফ্রান্স) মধ্যে একজনকে বেছে নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

দুই দলের শীর্ষ নেতারাই বিশৃঙ্খলার জন্য মাখোঁ ও তাঁর মন্ত্রীদের দায়ী করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে মাখোঁর মধ্যপন্থী দল কার্যকর সরকার গঠন ও আইন পাস করতে হিমশিম খাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারের প্রতি অসন্তোষকে কাজে লাগানোর সুযোগ দেখছেন তাঁরা।

লা ফ্রঁস ইনসুমিজের নেতা ও প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জঁ-লুক মেলঁশোঁ বিক্ষোভ দমনে পুলিশের কঠোর পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। বিধিনিষেধ আরোপের মাধ্যমে মাখোঁ ‘প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে ধ্বংস করছেন’ বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।

আগের সপ্তাহের মতো শনিবারও সমর্থকদের বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মেলঁশোঁ। তবে আগের সপ্তাহে বিক্ষোভের পর যে দাঙ্গা হয়েছিল, পরে তিনি তার নিন্দা জানিয়েছিলেন।

শনিবার প্যারিসের প্রায় ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণে ওর্লেয়াঁ শহরে ন্যাশনাল র‍্যালির দুই দিনের সম্মেলনকে কেন্দ্র করে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

কট্টর ডানপন্থী দলটির হাজার হাজার সদস্য সেখানে জড়ো হয়ে নেত্রী মেরিন লো পেনের বক্তব্য শোনার কথা। একই সময়ে বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোরও শহরটিতে সমবেত হওয়ার কথা রয়েছে।

চলতি সপ্তাহে ওর্লেয়াঁর মেয়র বলেছেন, সেখানে প্রত্যাশিত জনসমাগম ‘নজিরবিহীন’। সম্ভাব্য সংঘর্ষ সামাল দিতে হাজার হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে বলেও জানান তিনি। এ ছাড়া শহরের গণপরিবহন চলাচল বন্ধ রাখা হবে।

জনমত জরিপের ইঙ্গিত, এবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার সবচেয়ে ভালো সুযোগ পেতে পারেন মেরিন লো পেন। চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তিনি। তবে চলতি বছরের শুরুতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের তহবিল আত্মসাতের দায়ে একটি আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন। লো পেন অবশ্য কোনো অপরাধ করার কথা অস্বীকার করেছেন এবং ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত