Ajker Patrika

ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ অব্যাহত, গ্রেপ্তার ২৪০০

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ অব্যাহত, গ্রেপ্তার ২৪০০
প্যারিসের প্লাস দ্য লা রিপাবলিক চত্বরে জ্বলছে আগুন। তারই পাশে দাঁড়িয়ে ফরাসি পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। ছবি: এএফপি

ফ্রান্সজুড়ে নজিরবিহীন সহিংসতা, ভাঙচুর–লুটপাটে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দেশটির বিভিন্ন শহরে সরকারি ভবনে আগুন, দোকানপাটে হামলা, সড়কে ব্যারিকেড ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ১ হাজার ৫০০ টিরও বেশি দোকান–ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। শনিবারের সহিংসতায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন প্রায় ১ হাজার পুলিশ সদস্য ও জঁদার্মেরি বাহিনীর সদস্য। তাঁদের মধ্যে সাতজনের অবস্থা গুরুতর।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, এ পরিস্থিতিতে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে তিনি একে ‘বেপরোয়া সহিংসতা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। মাখোঁ বলেন, ‘এই ছবিগুলো দেখে আমরা সবাই নিজেদের প্রশ্ন করেছি, ফরাসিরা কীভাবে ফ্রান্সের সঙ্গে এমনটা করতে পারে?’ তিনি আরও বলেন, সহিংসতার পক্ষে কোনো যুক্তিই গ্রহণযোগ্য নয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজন হলে স্থানীয় প্রশাসন নির্দিষ্ট কিছু জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করতে পারবে।

শনিবারের সহিংসতার ব্যাপকতা সম্পর্কে সরকার আগে থেকে ধারণা করতে পারেনি বলে মনে হওয়ায় বাম ও ডানপন্থী রাজনীতিকেরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের পদত্যাগ দাবি করেছেন। ওই দিন বিভিন্ন শহরে সরকারি ভবনে হামলা ও অগ্নিসংযোগ, বাসস্টপ ভাঙচুর, সড়কে ব্যারিকেড এবং দোকানপাটে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। ফ্রান্সের পাশাপাশি স্পেন, ইতালি ও পর্তুগালেও বিক্ষোভ হয়েছে।

গতকাল রোববারও রাজধানী প্যারিসে সহিংসতা অব্যাহত ছিল। বিকেলে শহরের কেন্দ্রস্থলের প্লাস দ্য লা রিপাবলিক চত্বরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। বিভিন্ন সড়কে বৈদ্যুতিক সাইকেল স্তূপ করে আগুন দেওয়া হয়। পুলিশের দিকে বোতল ও পাথর ছোড়া হয়। জ্বলন্ত ময়লার পাত্র থেকে ঘন ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ব্যবহার করে।

প্যারিসে পুলিশ জানিয়েছে, সেখানে রেকর্ড ৮৫৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রোববার শহরের বিভিন্ন রাস্তায় সাইকেল, ময়লার পাত্র ও অন্যান্য সামগ্রী দিয়ে তৈরি ব্যারিকেডের পুড়ে যাওয়া অংশ পড়ে থাকতে দেখা যায়। বেশ কয়েকটি সড়কে দোকানের ভাঙা কাচ ও আগুনে পুড়ে যাওয়া গাড়ির ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে ছিল। শহরটির ডেপুটি মেয়র ও সমাজতন্ত্রী রাজনীতিক লামিয়া এল আরাজে বলেন, তাঁর বিশ্বাস, প্যারিস আগে কখনো এমন মাত্রার সহিংসতার মুখোমুখি হয়নি।

তবে শনিবারের সব বিক্ষোভ সহিংস ছিল না। প্যারিসসহ বড় বড় শহরে হাজার হাজার মানুষ শান্তিপূর্ণ মিছিলে অংশ নেন। স্কুলে আরও শিক্ষক নিয়োগ, জরাজীর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংস্কার এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দাবিতে এসব কর্মসূচি পালিত হয়। এর আগে টানা চার সপ্তাহ ধরে সড়কে মিছিল ও স্কুলে ব্যারিকেড দিয়ে প্রতিবাদ চলছিল। শনিবারের মিছিলে শিক্ষার্থী, কর্মী, অভিভাবক, শিক্ষক এবং প্রবীণরাও অংশ নেন। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, সরকার তাঁদের কথা শুনছে না। তাঁরা সরকারি পরিষেবায় আরও অর্থ বরাদ্দেরও দাবি জানান।

অন্যদিকে, এসব শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির বাইরে বিভিন্ন গোষ্ঠী হঠাৎ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে জড়ো হয়ে আগুন দেওয়া, সড়ক অবরোধ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। প্যারিস, বোর্দো, নিস ও মার্সেইসহ বিভিন্ন শহরে এসব ঘটনা ঘটে। পরে মুখোশধারী লুটেরারা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দোকানের কাচ ভেঙে পণ্য লুট করে। প্যারিসে মুখোশধারী প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের দোকানের কাচ ভাঙার পর কয়েকজনকে পোশাক ও জুতার বাক্স নিয়ে দৌড়ে পালাতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে শিশু বলে মনে হয়েছে।

মধ্য ফ্রান্সের লিমোজ শহরে উনিশ শতকে নির্মিত টাউন হলে আগুন দেওয়া হয়েছে। শহরটির মেয়র গিয়োম গেরাঁ বলেন, ভবনে হামলাকারীরা কোনো দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলনকারী ছিল না; বরং তারা ছিল ‘যুদ্ধের জন্য সংগঠিত মানুষ।’ তাঁর অভিযোগ, হামলাকারীরা ভবনের এক তত্ত্বাবধায়ককে হত্যার হুমকি দেয় এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদেরও পুড়িয়ে দেওয়ার কথা বলে। গেরাঁ জানান, শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে পর্যাপ্তসংখ্যক সদস্য থাকা সত্ত্বেও পৌর পুলিশ দাঙ্গাকারীদের সহিংসতা মোকাবিলা করতে পারেনি। কারণ, তাদের গোলাবারুদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। তিনি এ ঘটনাকে ‘রাষ্ট্রের চরম ব্যর্থতা’ বলে উল্লেখ করেন।

মার্সেইয়েও মুখোশধারী কয়েকটি দল সিটি হল ও একটি থানায় হামলা চালায়। শহরটির সমাজতন্ত্রী মেয়র বেনোয়া পায়াঁ বলেন, ‘আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। জীবনে কখনো এমন কিছু দেখতে হবে, তা ভাবিনি।’ তাঁর অভিযোগ, দাঙ্গাকারী ও লুটেরাদের দল সরকারি ভবনগুলোতে হামলা চালিয়েছে। তাদের কোনো বাস্তব দাবি ছিল না; বরং বৈধভাবে বিক্ষোভ করা মানুষের দাবিগুলোকে নস্যাৎ করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। পায়াঁ পুলিশের কৌশল নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। লিলসহ অন্যান্য শহরের টাউন হল ভবনেও হামলা হয়েছে বলে তিনি জানান।

লিওঁ শহরের গ্রিন পার্টির মেয়র গ্রেগরি দুসে বলেন, তাঁর শহরে এর আগে কখনো এমন সহিংসতা দেখেননি। সেখানে ঐতিহাসিক পর্যটন কার্যালয়েও আগুন দেওয়া হয়েছে। লে মঁদ পত্রিকাকে তিনি বলেন, সরকারি ও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির ওপর এমন সহিংসতা দেখে তিনি স্তম্ভিত। তাঁর ভাষায়, মানুষকে ভীত ও ক্ষুব্ধ হতে দেখেছেন তিনি; দোকানমালিকদের মনে হয়েছে, তাঁদের অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে।

দুসে বলেন, কী ঘটেছে তা যথাযথভাবে খতিয়ে দেখতে সরকারকে সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিতে হবে এবং গতানুগতিক ধারণার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া এড়াতে হবে। তাঁর মতে, একদিকে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের দীর্ঘদিনের সামাজিক দাবির রাজনৈতিক জবাব দিতে হবে, অন্যদিকে সহিংসতার মূল কারণও অনুসন্ধান করতে হবে।

ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো জানিয়েছে, ১ হাজার ৫০০ টিরও বেশি দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। এতে কয়েক কোটি ইউরোর ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্যারিসের একটি জুতার দোকানের মালিক বলেন, এসব ঘটনার সঙ্গে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। তাঁর ভাষায়, সংগঠিত দলগুলো ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়েছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।

এদিকে, বিরোধী দলের রাজনীতিকেরা সরকারের পুলিশি কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের অভিযোগ, সহিংসতার বিষয়ে আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে ঘাটতি ছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শনিবারের ঘটনায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং প্রায় ১ হাজার পুলিশ সদস্য ও জঁদার্মেরি বাহিনীর সদস্য আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সাতজন গুরুতর আহত।

দেশটির মধ্য-পূর্বাঞ্চলীয় শহর সাঁত-এতিয়েনে জনতা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত একটি গ্রেনেডের বিস্ফোরণে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরের ডান হাত উড়ে গেছে। ম্যুলুজ শহরে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরী একটি চোখ হারিয়েছে। ওই ঘটনার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে পুলিশি তদন্ত শুরু হয়েছে।

সহিংসতার জন্য মাখোঁর মধ্যপন্থী সরকার এবং প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে উগ্র ডানপন্থীদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মেরিন লো পেন উভয়েই ‘উগ্র বামপন্থী’ গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেছেন। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু বলেছেন, সহিংসতার কাছে সরকার মাথা নত করবে না। তিনি অস্থিরতার জন্য উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠী ও অপরাধীদের দায়ী করেন।

অন্যদিকে, উগ্র বামপন্থী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ, যিনি শনিবার প্যারিসের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন, অভিযোগ করেন যে—সরকারের সাংগঠনিক ব্যর্থতা ‘নৈরাজ্যের দরজা খুলে দিয়েছে।’ এর জবাবে লেকর্নু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘সহিংসতার দায় পুলিশের কর্মকর্তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া দায়িত্ব এড়ানোর একটি বিপজ্জনক ও কপট প্রচেষ্টা।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত