Ajker Patrika

যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য দেশ থেকে ভারতের তেল কেনা নতুন কিছু নয়: রাশিয়া

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য দেশ থেকে ভারতের তেল কেনা নতুন কিছু নয়: রাশিয়া
প্রতীকী ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির মধ্যে চলতি সপ্তাহে সই হওয়া বাণিজ্য চুক্তির অংশ হিসেবে ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করতে রাজি হয়েছে। এই দাবির পর রাশিয়া বলেছে, ভারত যেকোনো দেশ থেকে তেল কেনার ক্ষেত্রে স্বাধীন। ক্রেমলিনের বক্তব্য, নয়াদিল্লির জন্য মস্কো একমাত্র অপরিশোধিত তেলের জোগানদাতা নয়। তেলের উৎস বৈচিত্র্য করার বিষয়ে ভারতের সিদ্ধান্তে নতুন কিছু নেই।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের পরও ভারত প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল রুশ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে আসছে। রাশিয়ার তেল কেনার ক্ষেত্রে ভারত দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রেতা। ভারতের মোট তেল আমদানির এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসে রাশিয়া থেকে।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবির জবাবে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ‘আমরা যেমন জানি, তেমনি সব আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশেষজ্ঞরাও জানেন—রাশিয়া ভারতের তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের একমাত্র সরবরাহকারী নয়। ভারত সব সময়ই অন্য দেশ থেকেও এসব পণ্য কিনে এসেছে। তাই এখানে আমরা নতুন কিছু দেখছি না।’ তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাশিয়ার বদলে যুক্তরাষ্ট্র এবং সম্ভবত ভেনেজুয়েলা থেকে তেল কেনার বিষয়ে সম্মত হয়েছেন—এমন কোনো নতুন বিষয় তারা দেখছেন না।

এর আগের দিন পেসকভ বলেছিলেন, রাশিয়া ভারতের কাছ থেকে রুশ তেল কেনা বন্ধ করার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পায়নি। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বলেছে, হাইড্রোকার্বন বাণিজ্য নয়াদিল্লি ও মস্কো—উভয়ের জন্যই লাভজনক।

রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা এক ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ভারতের রুশ হাইড্রোকার্বন কেনা দুই দেশের জন্যই উপকারী এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। ভারতের অংশীদারদের সঙ্গে এ খাতে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা চালিয়ে যেতে আমরা প্রস্তুত।’

রাশিয়ার বেসরকারি ব্যবসাভিত্তিক রেডিও স্টেশন কোমেরসান্ত এফএম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতো করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাশিয়ার তেল আমদানি বন্ধের কোনো চুক্তির কথা উল্লেখ করেননি।

বিভিন্ন তথ্য–উপাত্ত থেকে জানা গেছে, ২০২১ সাল পর্যন্ত ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানিতে রাশিয়ার অংশ ছিল মাত্র ০ দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর পশ্চিমা দেশগুলো মস্কোকে এড়িয়ে চলতে শুরু করে। এরপর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক ভারত ছাড়মূল্যের রুশ তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতায় পরিণত হয়।

ভারত যে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে, তার প্রায় ৮৮ শতাংশই আসে বিদেশ থেকে। এই তেল পরিশোধন করে পেট্রোল ও ডিজেলের মতো জ্বালানি তৈরি করা হয়। এর মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তেল আসে রাশিয়া থেকে। একসময় প্রতিদিন ২০ লাখ ব্যারেলেরও বেশি রুশ তেল আমদানি করত ভারত। পরে এই পরিমাণ কমে ডিসেম্বর মাসে প্রায় ১৩ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে। চলতি মাসেও এই মাত্রা মোটামুটি স্থিতিশীল থাকার কথা।

তবে গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে, যা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি শুল্কহারগুলোর একটি। এর মধ্যে রুশ জ্বালানি কেনার কারণে বাড়তি ২৫ শতাংশ শুল্কও ছিল। এর পর জানুয়ারির প্রথম তিন সপ্তাহে ভারতের রুশ অপরিশোধিত তেল আমদানি কমে দাঁড়ায় প্রতিদিন প্রায় ১১ লাখ ব্যারেলে। আগের মাসে এই হার ছিল গড়ে ১২ লাখ ১০ হাজার ব্যারেল। আর ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে এই আমদানি ছিল দিনে ২০ লাখ ব্যারেলেরও বেশি।

ন্যাশনাল এনার্জি সিকিউরিটি ফান্ডের শীর্ষ বিশেষজ্ঞ ইগর ইউশকভ মনে করেন, ভারতীয় পরিশোধনাগারগুলো পুরোপুরি রুশ তেল আমদানি বন্ধ করতে পারবে না। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যে শেল তেল রপ্তানি করে, তা হালকা মানের। অনেকটা গ্যাস কনডেনসেটের মতো। অন্যদিকে রাশিয়া তুলনামূলকভাবে ভারী ও সালফারসমৃদ্ধ উরালস তেল সরবরাহ করে। ফলে ভারতকে মার্কিন তেল অন্য গ্রেডের তেলের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করতে হবে। এতে অতিরিক্ত খরচ হবে। তাই সহজভাবে একটির জায়গায় আরেকটি বসানো সম্ভব নয়।’

ইউশকভ আরও বলেন, ‘রাশিয়া সাধারণত প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ লাখ ব্যারেল তেল ভারতে রপ্তানি করে। যুক্তরাষ্ট্র সেই পরিমাণ সরবরাহ করতে পারবে না। তাই মনে হয়, ট্রাম্প শুধু দেখাতে চাইছেন যে তিনি এই বাণিজ্য আলোচনায় জয়ী হয়েছেন এবং চুক্তিটি পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের শর্তেই হয়েছে।’

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০২২ সালে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ছেড়ে রাশিয়া যখন ভারতের বাজারে বেশি মনোযোগ দেয়, তখন তারা দৈনিক উৎপাদন ১০ লাখ ব্যারেল কমিয়েছিল। এর ফলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারে উঠে যায়। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিন ও ডিজেলের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত