Ajker Patrika

চার বছরে বদলে গেছে ইউক্রেন যুদ্ধ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
চার বছরে বদলে গেছে ইউক্রেন যুদ্ধ
গত ২২ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার ড্রোন হামলায় ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে জ্বলছে বসবাসের একটি এলাকা। ছবি: সিএনএন

চার বছর আগে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুধু পূর্ব ইউরোপের মানচিত্রই বদলায়নি, বদলে দিয়েছে যুদ্ধের চরিত্র, কূটনীতির নিয়মকানুন এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য। ইউক্রেনের জন্য এই যুদ্ধ টিকে থাকার লড়াই—একদিকে রাশিয়ার আগ্রাসন ঠেকিয়ে ইউরোপের সীমানা রক্ষা করা এবং অন্যদিকে পশ্চিমা মিত্রদের সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত রাখার এক নির্মম দায়িত্ব।

বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে কিয়েভের এক সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের অনেকেই এখনো ইতিবাচক থাকার চেষ্টা করি, কারণ আর কোনো বিকল্প নেই।’ ইউক্রেনীয়দের জন্য যুদ্ধের অবসানই সবচেয়ে বড় চাওয়া। নিজেদের প্রতিরক্ষা বাজেট ও জ্বালানি ব্যয়ের চাপে এই যুদ্ধ থামাতে চায় পশ্চিমা বিশ্বও। তবু সমালোচকদের মতে, পশ্চিমাদের সীমিত সহায়তাই ইউক্রেনকে দীর্ঘ লড়াইয়ে ঠেলে দিয়েছে।

কূটনৈতিক অস্থিরতা

এই যুদ্ধ থামানোর প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার প্রচলিত কাঠামো ভেঙে সরাসরি ও ফলকেন্দ্রিক কৌশল গ্রহণের কথা বলেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত ফলাফল সীমিত। যুদ্ধবিরতির ক্ষণস্থায়ী উদ্যোগ, রুশ তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা—এসবের মাঝেও স্থায়ী শান্তির অগ্রগতি নেই। মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্বীকার করেন, রাশিয়া আদৌ শান্তি চায় কি না, তা স্পষ্ট নয়।

ড্রোন বিপ্লব

এই যুদ্ধে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে ড্রোন প্রযুক্তির দ্রুত বিবর্তন। ২০২৩ সালের শেষ দিকে ইউক্রেনীয় বাহিনী আক্রমণাত্মক ড্রোন দিয়ে তাদের পদাতিক ঘাটতি পূরণ করেছিল। বর্তমানে রাশিয়া মোশন সেন্সরযুক্ত ড্রোন ব্যবহার করছে, যা শত্রু সেনা কাছে এলে বিস্ফোরিত হয়। এই স্বয়ংক্রিয় হত্যাযন্ত্র পশ্চিমা সামরিক কৌশলকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।

ইউরোপের পুনঃ সংজ্ঞা

দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের নিরাপত্তা নির্ভর করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির ওপর। কিন্তু এখন ইউরোপ নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে ধীর গতি দেখাচ্ছে। ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির নেতারা বাজেটচাপে বড় সিদ্ধান্তে দ্বিধান্বিত। রুশ ড্রোন ইউরোপীয় আকাশসীমায় ঢুকে পড়া বা নাশকতার অভিযোগ সত্ত্বেও অনেকেই মনে করছেন, রাশিয়া অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়বে। তবে এটি কৌশল নয়, বরং এক ধরনের আশা।

বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য

যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক নেতৃত্বের দায় কমাচ্ছে—এমন ধারণা জোরালো হচ্ছে। চীন রাশিয়াকে সরাসরি সামরিক সহায়তা না দিলেও তেল কেনা ও দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য সরঞ্জাম সরবরাহের মাধ্যমে মস্কোকে টিকিয়ে রাখছে। ভারতও সস্তা রুশ তেল কিনে অর্থ জুগিয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য নতুনভাবে বিন্যস্ত হচ্ছে।

ইউক্রেনের মানুষের জীবন

এই পরিবর্তনগুলো ইউক্রেনীয়দের কাছে তাত্ত্বিক নয়—এগুলো তাদের প্রতিদিনের শোক, উদ্বেগ ও টিকে থাকার গল্প। সামরিক কর্মকর্তা কাটিয়া বলেন, ‘যুদ্ধ যেন এক খেলা, কিন্তু আরেকটি কয়েন ঢুকিয়ে এই যুদ্ধ আমাদের খেলেই যেতে হয়।’ জনবল ঘাটতি ও অনভিজ্ঞ কমান্ডারদের কারণে অপ্রয়োজনীয় হতাহতের অভিযোগও বাড়ছে।

ক্রামাতোরস্কের বাসিন্দা ইউলিয়া ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত শহর ছেড়ে খারকিভে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘সবকিছু খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে।’ দক্ষিণাঞ্চলের ওডেসায় ড্রোন ইউনিটের কমান্ডার তিমুর সামোসুদভ জানান, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সত্ত্বেও ফ্রন্টলাইনে ইউক্রেনীয় সেনারা সংখ্যায় অনেক কম। তবু তাঁর বিশ্বাস—ইউক্রেন অপরাজেয়, কারণ তারা জয়ের জন্য সবকিছু করবেন, কেউ সহায়তা করুক বা না করুক।

চার বছরে এই যুদ্ধ ইউক্রেনের এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তবু সীমিত সহায়তা নিয়েও দেশটি ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়ানোর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে—এক অনিশ্চিত, দীর্ঘ ভবিষ্যতের দিকে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত