Ajker Patrika

যুক্তরাষ্ট্রকে অপদস্থ করেছে ইরান: জার্মান চ্যান্সেলর

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
যুক্তরাষ্ট্রকে অপদস্থ করেছে ইরান: জার্মান চ্যান্সেলর
জার্মানির নির্বাচনজয়ী নেতা ফ্রেডেরিখ মের্ৎস। ছবি: এএফপি

ইরানের নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অপদস্থ’ করছে বলে মন্তব্য করেছেন জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডেরিখ ম্যার্ৎজ। তাঁর দাবি, আলোচনার টেবিলে কৌশলের দিক থেকে তেহরান ট্রাম্প প্রশাসনকে টেক্কা দিয়েই যাচ্ছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

মার্সবার্গে শিক্ষার্থীদের সামনে বক্তব্য দিতে গিয়ে ম্যার্ৎজ বলেন, আসলে ট্রাম্পের দলই পিছিয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, ‘ইরানিরা স্পষ্টতই আলোচনায় খুব দক্ষ—অথবা বলা ভালো, আলোচনা না করতেই তারা দক্ষ। তারা আমেরিকানদের ইসলামাবাদে আসতে দেয়, তারপর কোনো ফল ছাড়াই ফিরে যেতে বাধ্য করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘একটি পুরো জাতিকে ইরানের নেতৃত্ব অপদস্থ করছে, বিশেষ করে রেভল্যুশনারি গার্ডস। তাই আমি আশা করি, এই পরিস্থিতির দ্রুত অবসান হবে।’

দুই দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসলামাবাদে ইরানি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনার জন্য মার্কিন প্রতিনিধি দলের সফর বাতিল করেন। এর আগের দফায়, দুই সপ্তাহ আগে পাকিস্তানের রাজধানীতে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। সে সময় মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার এই অচলাবস্থা নিয়ে ম্যার্ৎজের কঠোর মন্তব্য ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কে বিদ্যমান গভীর বিভাজনকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তাঁর এই বক্তব্য ট্রাম্পের সেই প্রচেষ্টার সরাসরি বিরোধিতা করে, যেখানে তিনি পরিস্থিতিকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। এর একদিন আগে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘সব কার্ড আমাদের হাতে আছে।’ তিনি যোগ করেন, তেহরান যদি আলোচনা করতে চায়, ‘তারা আমাদের কাছে আসতে পারে, অথবা আমাদের ফোন করতে পারে।’

এদিকে, গতকাল সোমবার ইরান একটি নতুন যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে, যার মূল লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া। পারমাণবিক অস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র, নিষেধাজ্ঞা ও অন্যান্য বিষয়গুলো পরে আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়। ইরানের পার্লামেন্টে প্রস্তুত হওয়া একটি বিলে বলা হয়েছে, প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে ‘সেবা’ বাবদ তেহরানকে অর্থ দিতে হবে, যা যুদ্ধের আগে বিনামূল্যে ছিল।

ইরানি কর্মকর্তারা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার হওয়ার পরই কেবল তারা পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনা করতে রাজি হবে। তবে আলোচনায় জড়িত মধ্যস্থতাকারীরা মনে করছেন, এই প্রস্তাব কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ, এতে ওয়াশিংটনের ঘোষিত যুদ্ধের কোনো লক্ষ্যই পূরণ হবে না—যার মধ্যে ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির স্থায়ী অবসান। আলোচনার সঙ্গে পরিচিত এক কূটনীতিক বলেন, ‘হরমুজ তো যুদ্ধের একটি উপজাত। তাহলে এটিই কীভাবে প্রথমে সমাধান করা যায়?’

তবে ‘আগে হরমুজ’ প্রস্তাবটি তেহরানের অবস্থানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। আগে ইরান তাদের তেল, গ্যাস ও উপসাগরীয় রপ্তানিতে অবরোধকে ব্যবহার করত বিস্তৃত নিরাপত্তা নিশ্চয়তা আদায়ের কৌশল হিসেবে। কিন্তু ইসলামাবাদ আলোচনায় ভাঙনের পর ট্রাম্প ইরানি বন্দর ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর ওপর পাল্টা অবরোধ আরোপ করেন, যা ইরানের অর্থনৈতিক সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে বলেছে ধারণা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল–আইএমএফ পূর্বাভাস দিয়েছে, চলতি বছরে ইরানের জিডিপি ৬.১ শতাংশ সংকুচিত হবে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছেছে, যেখানে খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবার দাম আরও দ্রুত বেড়েছে।

অপরদিকে, গতকাল সোমবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি মস্কোয় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন। লক্ষ্য ছিল আংশিকভাবে অবরোধের প্রভাব কমানোর উপায় খোঁজা। রুশ সরকারি গণমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, পুতিন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—রাশিয়া ‘ইরানের স্বার্থে এবং পুরো অঞ্চলের মানুষের স্বার্থে যা প্রয়োজন, তা করবে, যাতে দ্রুত শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায়।’ আরাগচি বলেন, ‘বিশ্ব এখন ইরানের প্রকৃত শক্তি বুঝতে পেরেছে। স্পষ্ট হয়েছে যে ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান একটি স্থিতিশীল, দৃঢ় এবং শক্তিশালী ব্যবস্থা।’

রাশিয়া-ইরান সম্পর্ক বিশ্লেষক নিকিতা স্মাঘিন জানান, আলোচনায় রাশিয়ার সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা, বিশেষ করে বাণিজ্যিক ট্রানজিট রুট নিয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি লেখেন, ‘যদি মার্কিন অবরোধ অব্যাহত থাকে, তাহলে কাস্পিয়ান সাগর ও রাশিয়ার সঙ্গে স্থলপথই ইরানের বিশ্ববাজারে সংযোগের অন্যতম শেষ ভরসা হয়ে উঠবে।’

ইরান বিশেষজ্ঞ আলী ভায়েজ বলেন, ট্রাম্প ও তাঁর দল ভুলভাবে ধারণা করেছিল যে অর্থনৈতিক চাপ ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচিতে ছাড় দিতে বাধ্য করবে। তিনি বলেন, ‘অবশ্যই অবরোধ ইরানের অর্থনৈতিক কষ্ট বাড়াচ্ছে। কিন্তু ইরানের স্থিতিস্থাপকতা অর্থনৈতিক কষ্টের ওপর নির্ভর করে না। তারা এটিকে অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখছে এবং অনেক বেশি মূল্য দিতে প্রস্তুত। আর ইরানি সরকার জনগণের ওপর সেই চাপ চাপিয়ে দিতে দ্বিধা করে না।’

তাঁর মতে, ট্রাম্প নিজেও একাধিক রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন—দেশে জ্বালানির দাম ও মূল্যস্ফীতি, মে মাসের মাঝামাঝি বেইজিংয়ে সি চিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের আগে সংকট সমাধানের তাড়না এবং জুন-জুলাইয়ে উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপের আগে বৈশ্বিক জেট ফুয়েলের সংকটের আশঙ্কা।

যদি ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার প্রস্তাব মেনে নেন, তাহলে তিনি ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক সক্ষমতার ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার ক্ষতি দেখিয়ে নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করতে পারেন। তবে এতে ইরানের কাছে ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম থেকে যাবে, যা তাত্ত্বিকভাবে এক ডজন পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরির জন্য যথেষ্ট।

শিকাগো কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের গবেষণা, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট আরিয়েন তাবাতাবায়ি বলেন, ইরান দ্রুত তাদের সামরিক সক্ষমতার অন্তত কিছু অংশ পুনর্গঠন করতে পারে। তাঁর মতে, ‘তাদের সামরিক নীতি এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে তারা কম খরচে সক্ষমতা তৈরি, ধরে রাখা ও ব্যবহার করতে পারে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত