Ajker Patrika

আইআরজিসির হয়ে বিলিয়ন ডলারের শ্যাডো ব্যাংকিং চালাচ্ছে দুই ব্রিটিশ কোম্পানি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৬, ১৩: ১৫
আইআরজিসির হয়ে বিলিয়ন ডলারের শ্যাডো ব্যাংকিং চালাচ্ছে দুই ব্রিটিশ কোম্পানি
প্রতীকী ছবি

যুক্তরাজ্যে নিবন্ধিত দুটি কোম্পানি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) বৈশ্বিক ছায়া ব্যাংকিং কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এমনটি উঠে এসেছে এক অনুসন্ধানে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই কোম্পানিগুলো এমন এক ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জের ঢাল হিসেবে কাজ করেছে, যা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট লেনদেন প্রক্রিয়াকরণ করেছে।

দুটি কোম্পানির সঙ্গেই সম্পর্ক রয়েছে ইরানের বিলিয়নিয়ার ব্যবসায়ী বাকাক জানজানির। ইরানে ‘গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িতদের’ জন্য অর্থ সংগ্রহে ভূমিকার সন্দেহে তাঁকে আগে থেকেই যুক্তরাজ্য সরকার নিষেধাজ্ঞার আওতায় এনেছে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের ওপর বারবার চাপ দেওয়া হয়েছে আইআরজিসিকে নিষিদ্ধ সংগঠন ঘোষণার জন্য। এই বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা ইরানের ভেতরে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী হত্যায় সহায়তা করেছে। একই সঙ্গে সংগঠনটি এমন এক নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, যাকে ইরানি কর্মকর্তারা ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ প্রতিরোধ অক্ষ বলে উল্লেখ করেন। এটি মূলত বিভিন্ন সশস্ত্র প্রক্সি গোষ্ঠীর একটি জাল, যার মাধ্যমে ইরান নিজের সীমান্তের বহু দূর পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করতে চায়।

যুক্তরাজ্যের ছায়া জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী অ্যালিসিয়া কেয়ার্নস কিয়ার স্টারমারকে অভিযুক্ত করে বলেন, ব্রিটেনকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর একটির আর্থিক লাইফলাইন হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ‘দৃঢ়তার অভাবের’ ফল ছিল ‘ধ্বংসাত্মক’ এবং তিনি সরকারকে দ্রুত এই দুই কোম্পানি ও আইআরজিসির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানান। কেয়ার্নস বলেন, ‘টেলিগ্রাফের অনুসন্ধানে এখন প্রকাশ পেয়েছে যে যুক্তরাজ্যে নিবন্ধিত দুটি কোম্পানি বিলিয়ন ডলার পাচার করেছে, যার মধ্যে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার গেছে আইআরজিসির জন্য। এই সংগঠন সন্ত্রাসে অর্থ জোগায়, ব্রিটিশ সড়কে হত্যাচেষ্টা চালায় এবং ইরানের জনগণকে দমন ও হত্যা করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইরানের হত্যাকারী শাসনের ক্ষেত্রে লেবার পার্টি বারবার দৃঢ়তার বদলে নতিস্বীকার করেছে। এর ফলে ব্রিটিশ ভূমি ও ব্রিটিশ আইন ব্যবহার করে আমাদের মিত্রদের এবং আমাদের জাতীয় নিরাপত্তাকে হুমকি দেওয়া ব্যক্তিদের হাতে অর্থ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সরকার প্রতিদিন যত দেরি করছে, তত দিন ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানগুলো সন্ত্রাসে অর্থায়নের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।’

এই কোম্পানি দুটি হলো—জেডচেক্স এক্সচেঞ্জ লিমিটেড এবং জেডজিওন এক্সচেঞ্জ লিমিটেড। দুটি কোম্পানিই লন্ডনের কোভেন্ট গার্ডেন এলাকার একটি অভিজাত ভবনকে তাদের নিবন্ধিত অফিস হিসেবে উল্লেখ করেছে। কোম্পানি প্রতিষ্ঠার পর থেকে তারা কোনো হিসাব জমা দেয়নি এবং যুক্তরাজ্যের কোম্পানি রেজিস্ট্রি বিভাগ কোম্পানিজ হাউসে এগুলোকে ‘ডরম্যান্ট’ বা নিষ্ক্রিয় হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

কিন্তু মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের নিষেধাজ্ঞা সংস্থা অফিস অব দ্য ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (ওএফএসি) বলছে, এই কোম্পানিগুলো আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে বিপুল অর্থের লেনদেন করেছে। এ বছরের শুরুতে ওএফএসি এই দুই প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, জেডচেক্স একাই ৯৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্রক্রিয়া করেছে। ওএফএসি জানায়, কোম্পানিগুলো ‘আইআরজিসিএ জন্য আর্থিক, প্রযুক্তিগত বা অন্যান্য সহায়তা প্রদান করেছে।’

গ্লোবাল ক্রিপ্টোকারেন্সি লন্ডারিং ডেটাবেসের প্রতিষ্ঠাতা আলেকজান্ডার ব্রাউডার বলেন, ইরান তার কার্যক্রম চালাতে বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করে এবং যুক্তরাজ্যে নিবন্ধিত এই দুই কোম্পানি সেই নেটওয়ার্কের অংশ। তিনি বলেন, ‘এই কোম্পানিগুলো আইআরজিসির জন্য লাখ লাখ পাউন্ড মূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি মাইন করেছে। এত দিন ধরে যুক্তরাজ্যে নিবন্ধিত থেকে তারা কার্যক্রম চালাতে পেরেছে, এটা সত্যিই বিস্ময়কর।’

শত্রুতাপূর্ণ রাষ্ট্রগুলো কীভাবে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহ করছে সে বিষয়ে তাঁর একটি প্রতিবেদন এ মাসের শুরুতে প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ রক্ষণশীল থিংকট্যাংক হেনরি জ্যাকসন সোসাইটি। সেখানে বলা হয়েছে, ‘ইরান নিষেধাজ্ঞা এড়াতে নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও অংশীদারদের ব্যবহার করে। এ ধরনের ইরানি শ্যাডো ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থাকে অপব্যবহার করে এবং বিদেশি ফ্রন্ট কোম্পানি ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ পাচার করে।’

সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং ‘ইরানস শ্যাডো ওয়েপনস: ইন্টেলিজেন্স অপারেশনস, কভার্ট অ্যাকশন অ্যান্ড আনকনভেনশনাল ওয়ারফেয়ার’ বইয়ের লেখন বইয়ের লেখক জোনাথন হ্যাকেট বলেন, ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ এখন ধীরে ধীরে ‘হাওয়ালা’ বা এক ধরনের হুন্ডি পদ্ধতির জায়গা দখল করছে। হাওয়ালা হলো একটি অনানুষ্ঠানিক বিশ্বাসভিত্তিক অর্থ স্থানান্তর ব্যবস্থা, যেখানে প্রচলিত ব্যাংক বা নগদ অর্থ সরাসরি পরিবহন ছাড়াই টাকা পাঠানো যায়। মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক অঞ্চলে এটি প্রচলিত এবং অতীতে অর্থ পাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়ন ও অন্যান্য অবৈধ কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়।

হ্যাকেট বলেন, ‘ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে অর্থ অনেক সহজে এবং প্রায় অজ্ঞাত পরিচয়ে সরানো যায়। ২০১৮ সালে যখন আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং বার্তা আদান-প্রদান ব্যবস্থা সুইফট (SWIFT) থেকে ইরানকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করা হয়, তখন থেকেই এই প্রবণতা শুরু হয়। তখনই ইরান নিয়মিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে শ্যাডো ব্যাংকিং ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়ে।’

ব্লকচেইন ও ক্রিপ্টোকারেন্সি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস এই দুই কোম্পানির কার্যক্রম বিশ্লেষণ করেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠান দুটি শত শত মিলিয়ন ডলারের স্টেবলকয়েন লেনদেন প্রক্রিয়া করেছে এবং একই সঙ্গে আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট অফশোর আর্থিক অবকাঠামোর অংশ হিসেবে কাজ করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাইরে থেকে এগুলো সাধারণ ক্রিপ্টো ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করলেও অন্য নথি থেকে বোঝা যায়, তারা আসলে একই এক্সচেঞ্জ নেটওয়ার্কের অংশ ছিল এবং বৃহত্তর নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর একটি ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করছিল। টিআরএম ল্যাবসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে জেডচেক্স প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট লেনদেন প্রক্রিয়া করেছে। এই অর্থ আইআরজিসি নিয়ন্ত্রিত ওয়ালেট, বিদেশি মধ্যস্থতাকারী এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জগুলোর মধ্যে স্থানান্তর করা হয়েছে, যার ফলে নিষিদ্ধ অর্থপ্রবাহ ইরানের বৃহত্তর ক্রিপ্টো অর্থনীতির সঙ্গে মিশে গেছে।

জেডজিওন প্রতিষ্ঠিত হয় ২০২১ সালের মে মাসে এবং জেডচেক্স প্রতিষ্ঠিত হয় ২০২২ সালের আগস্টে। দুটি কোম্পানিই তাদের ব্যবসার ধরন হিসেবে ‘ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট’ উল্লেখ করে এবং প্রাথমিক নিবন্ধিত অফিস হিসেবে কোভেন্ট গার্ডেনের একটি ঠিকানা ব্যবহার করে। টেলিগ্রাফ ওই ঠিকানায় গিয়ে জানতে পারে, ভবনটি পরিচালনা করে বিএসকিউ গ্রুপ, যা কোম্পানিগুলোকে কেবল নিবন্ধিত অফিসের ঠিকানা ব্যবহারের সেবা দেয়। অর্থাৎ কোম্পানিগুলো সেখানে বাস্তবে কাজ করে না। ব্রিটিশ সরকারের কোম্পানিজ হাউসে জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, দুই কোম্পানির একমাত্র বর্তমান পরিচালক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এলিজাবেথ নিউম্যান নামের একজনকে, যার ঠিকানা হিসেবে দেওয়া হয়েছে ডোমিনিকান রিপাবলিকের শেরাটন হোটেল। টেলিগ্রাফ হোটেলটির সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানানো হয়, ওই নামে কোনো অতিথির থাকার রেকর্ড নেই।

বিএসকিউর পরিচালক এডওয়ার্ড স্লাইডিং বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান যুক্তরাজ্যের সব অর্থপাচারবিরোধী বিধি মেনে চলে এবং গ্রাহকদের বিষয়ে যথাযথ যাচাই–বাছাই করে। তিনি বলেন, ‘যখন আমরা জানতে পারি কোনো গ্রাহক নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েছে, তখনই আমরা তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক শেষ করি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করি।’ তার দাবি, ওএফএসি যখন জেডচেক্স ও জেডজিওনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তখনই তারা ওই কোম্পানিগুলোর জন্য দেওয়া সব সেবা বাতিল করে এবং ভবিষ্যতে যেন তারা আর এই সেবা ব্যবহার করতে না পারে সে জন্য তাদের কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। তিনি আরও বলেন, তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে কোম্পানিস হাউসকে জানিয়েছিলেন, এই কোম্পানিগুলো তাদের ঠিকানাকে নিবন্ধিত অফিস বা কোনো ব্যক্তির সার্ভিস অ্যাড্রেস হিসেবে ব্যবহারের অনুমতি পায়নি।

কোম্পানিস হাউসের মুখপাত্র বলেন, তারা পৃথক কোম্পানি নিয়ে মন্তব্য করতে পারে না। তবে বর্তমানে যারা কোম্পানি প্রতিষ্ঠা, পরিচালনা বা নিয়ন্ত্রণ করছে তাদের জন্য কঠোর পরিচয় যাচাই প্রক্রিয়া চালু করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, নিষিদ্ধ বা অযোগ্য ঘোষিত কোনো ব্যক্তি যদি যুক্তরাজ্যের কোনো কোম্পানির পরিচালক হন বা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা, গঠন বা প্রচারে অংশ নেন, তবে সেটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর এই বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আগাম মন্তব্য করা ব্রিটেনের দীর্ঘদিনের নীতির বিরুদ্ধে, কারণ এতে নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত