Ajker Patrika

বর্ষার আগেই সীমান্ত দখলের অভিযান, ভারতের আসিয়ান মহাসড়ক চালুর স্বপ্ন মিয়ানমারের

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৯ জুন ২০২৬, ১১: ৪৩
বর্ষার আগেই সীমান্ত দখলের অভিযান, ভারতের আসিয়ান মহাসড়ক চালুর স্বপ্ন মিয়ানমারের
বিহারে লালগালিচা বিছিয়ে মিন অং হ্লাইংকে স্বাগত জানানো হয়। ছবি: এক্স

ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড মহাসড়কের কালে-তামু অংশের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার এবং ভারত-মিয়ানমার সীমান্তে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই সামরিক অভিযান জোরদার করবে মিয়ানমারের জান্তা সরকার। ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচারমাধ্যম দূরদর্শনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানের নেতা ও দেশটির প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং।

থাইল্যান্ড থেকে প্রকাশিত মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম দ্য ইরাবতীর খবরে বলা হয়েছে, বর্তমানে ভারতের সীমান্তঘেঁষা এলাকাসহ চিন রাজ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চল চিন প্রতিরোধ বাহিনীগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে দীর্ঘ কয়েক মাসের তীব্র সংঘর্ষের পর সম্প্রতি মিয়ানমারের সেনাবাহিনী উত্তর চিন রাজ্যের দুটি কৌশলগত শহর ফালাম ও তেদিম পুনর্দখল করেছে।

এখন মিয়ানমারের সেনাবাহিনী উত্তরাঞ্চলে আরও হারানো এলাকা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ দিকে সেনা মোতায়েন করে মিনদাত, কানপেতলেত ও মাতুপি শহর পুনর্দখলের উদ্যোগ নিয়েছে।

সাক্ষাৎকারে মিন অং হ্লাইং স্বীকার করেন, ভারতকে আসিয়ানের দেশগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে নির্মিত ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড মহাসড়ক প্রকল্পটি নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে ২০২১ সাল থেকে কার্যত স্থবির হয়ে আছে। তিনি বলেন, ‘আমরা কালে-তামু সড়ক পুনরায় চালুর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। এটি সম্ভব হলে সীমান্ত গেটগুলোও আবার খুলে দেওয়া যাবে। কিন্তু ভারত-মিয়ানমার সীমান্তে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা আরও গুরুত্বপূর্ণ, আর সেটিই আমার অগ্রাধিকার।’

১ হাজার ২০০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ এই মহাসড়ক ভারতের সীমান্ত থেকে শুরু হয়ে মিয়ানমারের সাগাইন, মান্দালয়, নেপিদো ও তাউংগু অতিক্রম করে কারেন রাজ্যের মধ্য দিয়ে থাইল্যান্ডের মায়ে সোত পর্যন্ত পৌঁছেছে। তবে মিন অং হ্লাইংয়ের এই পরিকল্পনাকে বাস্তবসম্মত মনে করছেন না একজন প্রবীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তাঁর মতে, শুধু কালে ও তামুর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলেই হবে না। মহাসড়ক সচল রাখতে হলে সাগাইং, মান্দালয় এবং কারেন রাজ্যেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘শুধু কালে ও তামু দখলে রাখাই যথেষ্ট নয়। তাঁকে সাগাইং, মান্দালয় এবং কারেন রাজ্যও নিরাপদ করতে হবে। ভারতকে থাইল্যান্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করার যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা তিনি দেখাচ্ছেন, তা বর্তমান সামরিক বাহিনীর সক্ষমতার বাইরে।’

ভারত-মিয়ানমার সীমান্তে দীর্ঘদিন ধরেই নানা নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এই অঞ্চলে ভারতের বিরুদ্ধে সক্রিয় নাগা ও মেইতেই বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতি রয়েছে বলে অভিযোগ দিল্লির। পাশাপাশি সীমান্তপারের মাদক পাচার এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। মিন অং হ্লাইং বলেন, ভারতের বিরুদ্ধে লড়াই করা কিছু গোষ্ঠী মিয়ানমারের প্রতিরোধ বাহিনীগুলোর সঙ্গেও সমন্বয় করে কাজ করছে। ফলে সীমান্তে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য দুই দেশকেই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

যদিও উত্তর শান রাজ্যে সংঘর্ষ কিছুটা কমেছে, তবুও সরকারপন্থী বাহিনী বর্তমানে চিন প্রতিরোধ যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা ও স্থল অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। এসব প্রতিরোধ গোষ্ঠী মধ্য মিয়ানমার থেকে ভারতের সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত মহাসড়কের বিভিন্ন অংশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।

বর্ষার আগেই অভিযান জোরদারের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মিন অং হ্লাইং বলেন, সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো অত্যন্ত দুর্গম ও পাহাড়ি। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে সেখানে যাতায়াত করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, ‘এই সীমান্ত অঞ্চলগুলো পাহাড়ি এবং সেখানে পৌঁছানো কঠিন, বিশেষ করে বর্ষাকালে। আমি এলাকাগুলো ভালো করেই চিনি। একসময় সেখানে একটি রেজিমেন্টের কমান্ডার ছিলাম।’

জুনের শেষ দিকে পূর্ণমাত্রায় বর্ষা শুরু হলে পাহাড়ি সড়কগুলো প্রায়ই কয়েক মাসের জন্য অচল হয়ে পড়ে। তাই এর আগেই সামরিক লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করছে জান্তা সরকার। তবে সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও সামরিক বাহিনী থেকে বিচ্যুত ক্যাপ্টেন জিন ইয়াও মনে করেন, বর্তমানে সরকারি বাহিনী অত্যন্ত চাপের মধ্যে রয়েছে এবং বিভিন্ন ফ্রন্টে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘মিন অং হ্লাইং খুব বেশি ফ্রন্ট খুলে ফেলেছেন। চিন, মাগওয়ে, বাগো, উপকূলীয় অঞ্চল, তানিনথারি এবং কাচিনে একসঙ্গে যুদ্ধ চলছে। বর্ষার আগে অন্য কিছু এলাকা নিরাপদ করতে পারলেও সীমান্তের জন্য পর্যাপ্ত বাহিনী জড়ো করতে পারবেন বলে আমি মনে করি না।’

সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত এলাকায় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ভারত ও মিয়ানমার উভয় দেশই অভিযান পরিচালনা করেছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী মিয়ানমারের নাগা অধ্যুষিত অঞ্চলে অবস্থানরত আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায়।

এ বছরের মে মাসে মিয়ানমারের সামরিক প্রধান ইয়ে উইন ও নেপিদোতে ভারতের নৌবাহিনী প্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেন। সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নির্মূলে সম্ভাব্য যৌথ সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে সেখানে আলোচনা হয়।

গত সপ্তাহে নয়াদিল্লি সফরকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গেও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন মিন অং হ্লাইং। প্রেসিডেন্ট হিসেবে এটি ছিল তাঁর প্রথম বিদেশ সফর। সেখানে তিনি মোদিকে আশ্বস্ত করেন যে, ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডে মিয়ানমারের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। তবে বৈঠকের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু জান্তা সরকারের প্রতিশ্রুতিতে ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড মহাসড়ক পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে না। ক্যাপ্টেন জিন ইয়াও বলেন, ‘এটি শুধু মিন অং হ্লাইং ও সামরিক বাহিনীর সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। প্রতিরোধ বাহিনী এবং জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলোকেও এই সমীকরণের অংশ হতে হবে। ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ সব সময় পরিবর্তিত হচ্ছে, আর প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো যেকোনো সময় এই রুটে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে।’

৩০ মে থেকে ৩ জুন পর্যন্ত মিন অং হ্লাইংয়ের ভারত সফরের মূল লক্ষ্য ছিল ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড মহাসড়ক প্রকল্পকে এগিয়ে নেওয়া, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করা এবং সীমান্তে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত